Image description

পবিত্র ঈদুল আজহা এলেই দেশের অন্যতম আলোচিত অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে ওঠে কোরবানির পশুর চামড়া। প্রতি বছরই সরকার দাম নির্ধারণ করে, ব্যাংক ঋণ দেয়, ট্যানারি মালিকেরা বড় সংগ্রহের পরিকল্পনার কথা বলেন, আর মাঠপর্যায়ে মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করেন— এবার অন্তত চামড়ার ন্যায্য মূল্য পাওয়া যাবে কিনা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত এক দশক ধরে কাঁচা চামড়ার বাজারে একই চিত্র ঘুরেফিরে আসছে— দরপতন, অব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর গল্প। মূলত, একসময় কোরবানির পশুর চামড়া ছিল মাদ্রাসা-এতিমখানার বড় আয়ের উৎস। সেই চামড়াই এখন অনেক জায়গায় বিক্রি হচ্ছে পানির দরে। দেশে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্প আন্তর্জাতিক মানের অভাব, অব্যবস্থাপনা, সিন্ডিকেট ও নীতিগত দুর্বলতায় ধুঁকছে বছরের পর বছর। বাংলাদেশি চামড়া কম দামে কিনে চীনসহ বিভিন্ন দেশ তা প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ববাজারে বিপুল মুনাফা করছে। অথচ বিশ্বের অন্যতম বড় কাঁচা চামড়া উৎপাদনকারী দেশ হয়েও বাংলাদেশ হারাচ্ছে ন্যায্য মূল্য, রফতানি আয় এবং বৈশ্বিক বাজারের বড় অংশ। কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আবারও সামনে এসেছে সেই পুরোনো প্রশ্ন—চামড়ার প্রকৃত লাভ আসলে কার ঘরে যাচ্ছে?

ট্যানারি মালিকেরা জানিয়েছেন, তারা ৭৫ থেকে ৮০ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামছেন। ঢাকার কোরবানির চামড়ার প্রায় ৮০ শতাংশ সরাসরি কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের। রাষ্ট্রায়ত্ত তিন ব্যাংক চামড়া কেনার জন্য প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। পাশাপাশি কিছু বেসরকারি ব্যাংকও অর্থায়ন করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যোগ কি সত্যিই চামড়ার বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারবে, নাকি আগের মতোই ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে?

ঋণ আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত নয়

চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংক থেকে যে ঋণ দেওয়া হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। কারণ, বেশিরভাগ ট্যানারি আগের ঋণ খেলাপি হয়ে পড়ায় নতুন ঋণ পাচ্ছে না। ফলে বাজারে নগদ অর্থের সংকট থেকেই যাচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক এ বছর কেবল একটি প্রতিষ্ঠান— ভুলুয়া ট্যানারিকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক দিয়েছে ৭৫ কোটি টাকা— এর মধ্যে অ্যাপেক্স ট্যানারি পেয়েছে ৪৫ কোটি এবং বে ট্যানারি পেয়েছে ৩০ কোটি টাকা। জনতা ব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে ৬০ কোটি টাকা, তবে তার বড় অংশই চলতি মূলধন হিসেবে বিবেচিত। রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকেরা আবার আগের ঋণসীমা অতিক্রম করায় নতুন ঋণই পাননি।

ব্যাংকগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চামড়া খাতের ঋণের ৬৫ শতাংশ চলতি মূলধন এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ কোরবানির চামড়া কেনার জন্য ব্যবহার করা যায়। ফলে ঈদের সময় যে বিপুল নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়, তার বড় অংশই অপ্রতুল থেকে যায়।

একদশকে দাম অর্ধেকেরও কম

চামড়ার বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট এখন মূল্য পতন। ২০১৫ সালে একটি গরুর চামড়ার দাম ছিল গড়ে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ ২০২৬ সালে সেই চামড়া অনেক জায়গায় ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির হিসাব ধরলে ২০১৫ সালের ২ হাজার ২০০ টাকা এখন প্রায় ৪ হাজার ১৮০ টাকার সমান হওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যে পতন হয়েছে ৮০ শতাংশের বেশি।

সরকার এ বছর ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। পাশাপাশি সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি পিস ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সরকার ঘোষিত দাম কাগজেই থাকে, মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ হয় না। গত বছর সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি হয়েছে। কোথাও কোথাও ২০০ থেকে ৫০০ টাকায়ও গরুর চামড়া বিক্রির অভিযোগ ছিল। ফলে এবারও বাজারে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

কেন কমছে চামড়ার দাম?

বিশ্লেষকেরা বলছেন, চামড়ার দরপতনের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।

সাভারের ট্যানারি স্থানান্তরের ব্যর্থতা: ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তর করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো। কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।

বর্তমানে সিইটিপির দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার ঘনমিটার, অথচ কোরবানির মৌসুমে প্রয়োজন পড়ে ৩২ থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত। ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে। এই পরিবেশদূষণের কারণেই অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি (লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ) সনদ পাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের অভাব: দেশে প্রায় ১৫৫ থেকে ১৬০টি ট্যানারি থাকলেও আন্তর্জাতিক মানের এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত ট্যানারি মাত্র ৬ থেকে ৮টি। অথচ ভারতে এ ধরনের ট্যানারি ২৪০টির বেশি, পাকিস্তানে ৫০টির বেশি এবং ভিয়েতনামেও বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি।

এই সনদ ছাড়া ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের বড় ক্রেতারা বাংলাদেশি চামড়া কিনতে আগ্রহ দেখায় না। ফলে বাংলাদেশ বাধ্য হয়ে কম দামে আধা-প্রক্রিয়াজাত ‘ক্রাস্ট লেদার’ চীনের কাছে বিক্রি করছে। একসময় প্রতি বর্গফুট চামড়া ১ দশমিক ৫ ডলারে বিক্রি হলেও এখন অনেক ক্ষেত্রে তা ৬০-৬৫ সেন্টে নেমে এসেছে।

মাঠপর্যায়ে চামড়ার মানও খারাপ: চামড়ার মান অবনতির পেছনেও রয়েছে একাধিক কারণ— লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) আক্রান্ত গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি, অপ্রশিক্ষিত কসাই দিয়ে জবাই, রাস্তাঘাটে কোরবানি, সঠিকভাবে লবণ ব্যবহার না করা, বৃষ্টিতে চামড়া নষ্ট হওয়া, মোটাতাজাকরণে অনিয়ম ও নিম্নমানের খাদ্য ব্যবহার।

সিপিডির এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২১ শতাংশ চামড়ায় কাটাছেঁড়া বা ক্ষত তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি দাম কমিয়ে দিয়েছে। আবার ১০০ শতাংশ কোরবানিদাতা এবং ৮৩ শতাংশ মৌসুমি ব্যবসায়ী লবণ ছাড়া চামড়া বিক্রি করেছেন।

সরকার এবার কী উদ্যোগ নিয়েছে?

এবার সরকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে— কাঁচা চামড়া রফতানির সুযোগ আংশিক উন্মুক্ত, চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ, জেলা পর্যায়ে মনিটরিং, ঢাকায় সাত দিন বাইরে থেকে চামড়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, মাদ্রাসা ও এতিমখানায় লবণ সরবরাহ

কসাই প্রশিক্ষণ, চামড়া সংরক্ষণে প্রচার কার্যক্রম, কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম স্থাপন।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানিয়েছে, ১৫ হাজারের বেশি পেশাদার এবং প্রায় ২৩ হাজার অপেশাদার কসাইকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

সামনে আরও বড় চাপ

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা ২০২৯ পর্যন্ত থাকবে। এরপর আন্তর্জাতিক মান পূরণ করতে না পারলে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। তখন রফতানি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখন কী করতে হবে

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাতটিকে টিকিয়ে রাখতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন— সিইটিপির দ্রুত সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা, কাঁচা চামড়া রপ্তাফতানিতে স্বচ্ছ ও উন্মুক্ত নীতি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু, ইউনিয়নভিত্তিক সংগ্রহ কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত কসাই বৃদ্ধি, লবণ ব্যবহারের তদারকি, আধুনিক সংরক্ষণ ও কোল্ডস্টোরেজ ব্যবস্থা, চামড়াভিত্তিক বহুমুখী শিল্পে বিনিয়োগ।

সময় এখন সিদ্ধান্তের

প্রতিবছর কোরবানির আগে দাম ঘোষণা হয়, প্রতিশ্রুতি আসে, বৈঠক হয়— কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বদলায় না। অথচ চামড়াশিল্প শুধু একটি মৌসুমি বাজার নয়— এটি লাখো মানুষের জীবিকা, এতিমখানা-মাদ্রাসার অর্থায়ন এবং বাংলাদেশের একটি বড় রফতানি সম্ভাবনার খাত।

সরকার যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে সাভারের বর্জ্য শোধনাগার সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পারে, আন্তর্জাতিক সনদ নিশ্চিত করতে পারে এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে, তাহলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই চামড়ার বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

তাহলেই হয়তো আবার সেই দিন ফিরবে— যখন কোরবানির পর একটি চামড়ার মূল্য দিয়েই একটি মাদ্রাসার কয়েক মাসের খরচ চলতো।