Image description

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্রদের জন্য একটি ‘এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড’ গঠনে নিজ প্রশাসনের সঙ্গে যে চুক্তি করেছেন, তা তার দ্বিতীয় মেয়াদের একটি বড় প্রবণতাকে সামনে এনেছে। তাহলো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর থাকা নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা এবং ভবিষ্যৎ তদন্ত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।
এই চুক্তি এটাই দেখাচ্ছে যে, ট্রাম্প এমন নতুন কিছু বাধা তৈরি করছেন যা কংগ্রেসে ডেমোক্রেটদের তদন্ত, ভবিষ্যৎ প্রশাসনের অনুসন্ধান এবং এমনকি ফেডারেল সরকারের বাইরের কর্তৃপক্ষের তদন্তকেও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প ওয়াটারগেট-পরবর্তী স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতাগুলো ভেঙে দিচ্ছেন, কংগ্রেসের অর্থ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার ওপর আঘাত হানছেন, নিজের উদ্দেশ্যে আইন ভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত অনুগতদের পুরস্কৃত করছেন এবং স্বাধীন সংস্থা ও নির্বাহী বিভাগের তদারকি ব্যবস্থাকে দুর্বল করছেন।

 

সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সাবেক সরকারি আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিচ্ছেন এবং এমন রাজনৈতিক রীতিনীতিও ভেঙে দিচ্ছেন, যা আগে অন্য প্রেসিডেন্টদের সীমার মধ্যে রাখত। 

 

১৯৭০-এর দশকে রিচার্ড নিক্সন প্রশাসনের কেলেঙ্কারির পর কংগ্রেস যখন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, তখন আদালত সেসব আইনকে সমর্থন করেছিল। এডাম জিমারম্যান বলেন, এখন আমরা এমন এক নাটকীয় পরিবর্তন দেখছি যেখানে নির্বাহী ক্ষমতা ক্রমেই প্রেসিডেন্টের হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আর তা আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে নেই। দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গুল্ড স্কুল অব ল’র এই অধ্যাপক আরও বলেন, আমরা এমন একজনকেও দেখছি, যিনি এই ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দিতে প্রস্তুত।

 

‘এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড’ নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্প আইআরএসের বিরুদ্ধে যে আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ মামলা করেছিলেন, সেখান থেকেই এই নতুন চুক্তির জন্ম। শুরুতে যা ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে এটি তার চেয়েও বেশি সুরক্ষা দিচ্ছে প্রেসিডেন্টকে। চুক্তির ভাষা শুধু করসংক্রান্ত তদন্ত নয়, আরও বিস্তৃত ধরনের অনুসন্ধান থেকেও ট্রাম্পকে রক্ষা করতে পারে। এমনকি প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের এই তহবিলের সুবিধাভোগী হওয়ার বিস্তৃত মানদণ্ড ভবিষ্যতে কংগ্রেসীয় তদন্তে অংশ না নেয়ার প্রণোদনাও তৈরি করতে পারে। গ্রেগ নানজিয়াতা বলেন, এই তহবিল ঘোষণাটি ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের বহু প্রবণতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। তাহলো রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে শত্রুদের শাস্তি দেয়া এবং বন্ধুদের পুরস্কৃত করা, এমনকি যারা তার হয়ে আইন ভাঙে তাদেরও। তিনি ‘সোসাইটি ফর দ্য রুল অব ল’ নামের একটি রক্ষণশীল সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক। এই সংগঠনটি ট্রাম্পের বিরোধিতা করে।
তবে বিচার বিভাগ এক বিবৃতিতে এই তহবিলকে সমর্থন জানিয়ে বলেছে, এটি ‘লফেয়ার’ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানির অভিযোগ শুনতে এবং অন্যায্যভাবে টার্গেট হওয়া মার্কিন নাগরিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে’ তৈরি করা হয়েছে।

কর তদন্তের বাইরে সুরক্ষা
চুক্তির একটি সংযোজনী অংশে ট্রাম্প, তার পরিবার ও ব্যবসার জন্য দেয়া কর-সংক্রান্ত দায়মুক্তির বিষয়টি প্রকাশ করা হয়। অন্তর্বর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ বলেন, প্রত্যেক সমঝোতায় উভয় পক্ষই কিছু না কিছু ছাড় দেয়। টড ব্লাঞ্চ আগে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী ছিলেন এবং বাইডেন আমলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হওয়া ফৌজদারি মামলাগুলোতে তাকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। চুক্তির ভাষা শুধু আইআরএস বা ট্রেজারি বিভাগের সম্ভাব্য দাবির ক্ষেত্রেই নয়, যেকোনো সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হতে পারে। যদিও বিচার বিভাগ বলেছে, এটি মূলত দেওয়ানি বিষয় নিয়ে, ফৌজদারি মামলা নয়। 

 

তবে সমালোচকদের মতে, ‘লফেয়ার’ বা ‘ওয়েপনাইজেশন’ শব্দগুলোর কোনো নির্দিষ্ট আইনি সংজ্ঞা নেই এবং সেগুলো অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ট্রাম্প, তার পরিবার বা ব্যবসার বিরুদ্ধে যেকোনো তদন্ত ঠেকানোর হাতিয়ার হতে পারে।

 

তদন্তে অংশ নিলে শাস্তি, অনুগতদের পুরস্কার
সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প ও তার বিচার বিভাগ ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতা করা ব্যক্তিদের শাস্তি দিয়েছে এবং তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো বাতিল করেছে। গ্রেগ নুনজিয়াটা বলেন, তিনি প্রতিদিন আরও জোরালোভাবে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, তার হয়ে অপরাধ করলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং আপনাকে সেলিব্রেট করা হবে এবং হয়তো আর্থিক পুরস্কারও দেয়া হবে। ক্যাপিটল হামলার তদন্তে জড়িত প্রসিকিউটর এবং সাবেক বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথের তদন্তে অংশ নেয়া বিচার বিভাগের কর্মীদের বরখাস্ত করা হয়েছে। সাবেক ট্রাম্প উপদেষ্টা স্টিভ ব্যাননের বিরুদ্ধে কংগ্রেস অবমাননার মামলাও বাতিল করা হয়। এছাড়া সাবেক এফবিআই পরিচালক জেমস কমি এবং নিউইয়র্ক অ্যাটর্নি জেনারেল লেতিতিয়া জেমস- যারা ট্রাম্পবিরোধী তদন্তের মুখ্য মুখ ছিলেন, তাদেরও ফৌজদারি অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে। ট্রাম্প ক্যাপিটল হামলায় অভিযুক্ত বা দণ্ডিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। এখন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন তহবিল থেকে এসব ব্যক্তিকেও অর্থ দেয়া হতে পারে। 

ভবিষ্যৎ তদন্তের সামনে নতুন বাধা
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে ফেরার সময় ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের ২০২৩ সালের এক বিস্তৃত প্রেসিডেন্ট দায়মুক্তি রায়ের সুবিধা পান, যা তার প্রথম মেয়াদে ছিল না। বিচার বিভাগ এখন ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হামলা-সংক্রান্ত দেওয়ানি মামলাগুলোর বিরুদ্ধেও অবস্থান নিচ্ছে। এদিকে বিভাগটি এমন নিয়ম তৈরির কাজ করছে, যা অঙ্গরাজ্যভিত্তিক বার অ্যাসোসিয়েশনগুলোর পক্ষে বিচার বিভাগের আইনজীবীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক তদন্ত চালানো কঠিন করে তুলবে। 

নির্বাহী বিভাগের অভ্যন্তরীণ তদারকি দুর্বল করা
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই ট্রাম্প কয়েকজন ইন্সপেক্টর জেনারেলকে বরখাস্ত করেন, যাদের কাজ ছিল সরকারি সংস্থার ভেতরে দুর্নীতি, অপচয় ও ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্ত করা। এই অফিসগুলোই প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক তদন্ত চালিয়েছিল, যা পরে কংগ্রেসীয় তদন্ত ও ২০১৯ সালের অভিশংসন প্রক্রিয়ায় গড়ায়। এ বছর বিচার বিভাগের একটি অফিস প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছে যে, তিনি আর ‘প্রেসিডেনশিয়াল রেকর্ডস অ্যাক্ট’ মানতে বাধ্য নন। এই আইনে হোয়াইট হাউসের নথি সংরক্ষণ এবং পরে ন্যাশনাল আর্কাইভসে জমা দেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসনের এসব পদক্ষেপ এমন সময়ে হচ্ছে, যখন সুপ্রিম কোর্ট ‘ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ’ তত্ত্বের পক্ষে আরও ঝুঁকছে- যেখানে প্রেসিডেন্টের হাতে অধিক কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ধারণা সমর্থন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ- যার তিনজন বিচারপতিকে ট্রাম্প নিয়োগ দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্টের হাতে স্বাধীন সংস্থার প্রধানদের সহজে অপসারণের ক্ষমতা দিয়েছে, যা কংগ্রেস আরোপিত সীমাবদ্ধতাকে দুর্বল করেছে। জ্যাচারি প্রাইস বলেন, নতুন ‘এন্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড’ এমন এক ধারার অংশ, যেখানে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে অর্থ ব্যয়ের পথ খোঁজা হচ্ছে এবং ফেডারেল ব্যয়ের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো হচ্ছে।

সাবেক বিচার বিভাগীয় আইনজীবী ডগ লেটার বলেন, আমাদের সরকার কার্যকরভাবে চলতে হলে একটি ন্যূনতম সম্মানজনক আচরণ প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ট্রাম্পের আচরণ সংবিধান প্রণেতারা যা কল্পনা করেছিলেন, তার অনেক বাইরে চলে গেছে। অভিশংসন ছাড়া কার্যকর নিয়ন্ত্রণ কী হতে পারে, আমি নিশ্চিত নই।