Image description

কোরবানির ঈদ ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পদ্মা নদী দিয়ে অনেকটা স্রোতের মতো ঢুকছে ভারতীয় গরু। রাত যত গভীর হয় সীমান্তে বাড়ে চোরাকারবারিদের দৌরাত্ম্য। লাভজনক হওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেকে ভারতের ভেতরও ঢুকেন। তাদের কেউ সীমান্তরক্ষীদের হাতে আটক হচ্ছেন, কেউ বিএসএফের গুলিতে নিহত বা পঙ্গু হচ্ছেন, তবে বন্ধ হচ্ছে না গরু চোরাচালান।

অবাধে ভারতীয় গরু আসায় আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন দেশের খামারিরা। ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার শীর্ষ ব্যবসায়ীরাও। তবে বিজিবি বলছে- চোরাচালান রোধে সীমান্তে জিরো টলারেন্স তাদের।

ভারতীয় গরুর চালান আসার তথ্য পেয়ে সম্প্রতি সীমান্তের কাছাকাছি দুর্গম চরে অবস্থান নিয়ে দেখা যায়, রাত দেড়টার পরপরই আনাগোনা বাড়ে চোরাচালান চক্রের নিয়োগ করা লাইনম্যানদের। তাদের গ্রিন সিগন্যাল পেয়ে রাখালরা একে একে গরু নিয়ে আসতে থাকে। তবে এ সময় চোখে পড়েনি সীমান্ত সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একজন বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদস্যকেও।

চোরাচালানে যুক্ত রাখালদের বক্তব্য নেওয়ারও চেষ্টা করা হয়। তবে অস্ত্র দেখিয়ে হত্যার হুমকি দেয় তারা।

এদিকে, সীমান্ত পথে দেদারসে গরু আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় খামারিরা। তারা বলছেন-ঈদুল আজহায় বিক্রির জন্য ধারদেনা, এমনকি ব্যাংক লোন নিয়েও গরু লালন-পালন করছেন তারা। গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় এমনিতে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এখন ভারত থেকে চোরাই পথে গরু আসায় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন তারা।

চোরাই গরু নিয়ে রাখাল। স্ট্রিম ছবিচোরাই গরু নিয়ে রাখাল। স্ট্রিম ছবি

তাদের অভিযোগ, চোরাই পথে আসা গরু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেই হাটে বিক্রি হচ্ছে। তবে ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন। গরু চোরাচালান বন্ধ না হলে পথে বসতে হবে তাদের।

শিবগঞ্জ উপজেলার আট রশিয়া গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি পলাশ উদ্দিন জানান, সব পুঁজি খাটিয়ে তিনি গরুর খামার গড়ে তুলেছেন। ভারত থেকে গরু আসার খবরে তিনি চরম আতঙ্কে রয়েছেন। ইতোমধ্যে চাহিদার চেয়ে প্রায় এক লাখ টাকা কমে পাঁচটি গরু বিক্রি করেছেন। আরও ছয়টি গরু রয়ে গেছে।

পলাশ বলেন, ভারতীয় গরুর কারণে তার লালনপালন করা সবচেয়ে বড় গরুটি ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক কমে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।

একই উপজেলার কালুপুর গ্রামের জাহিদ হাসান জানান, তিনটি গরু হাটে নিয়েও তিনি আশানুরূপ দাম পাননি। পরিচর্যা ও গোখাদ্যের দাম বাড়লেও ক্রেতারা যে দাম বলছেন, তাতে তিনটি গরুতে তার ৩০ হাজার টাকা লোকসান হবে। এই পরিস্থিতির জন্য তিনি চোরাই পথে আসা ভারতীয় গরুকে দায়ী করেন।

কালুপুরের রশিদ ফার্মের এক শ্রমিক বলেন, গত বছর খামারের ১২টি গরুর সবগুলো বিক্রি হয়েছিল। এবার একটিও বিক্রি হয়নি। খাদ্যের দাম বেশি, তার ওপর রোগবালাই ও তাপমাত্রা বেড়েছে। এতে পরিচর্যা খরচ বাড়লেও ভারতীয় গরুর কারণে উল্টো দাম কমে গেছে।

 

সীমান্ত দিয়ে রাতে গরু ঢুকলেও চোখে পড়ে না বিজিবি সদস্যদের। স্ট্রিম ছবিসীমান্ত দিয়ে রাতে গরু ঢুকলেও চোখে পড়ে না বিজিবি সদস্যদের। স্ট্রিম ছবি

 

জেলার অন্যতম বৃহৎ খামারের মালিক আশরাফুল আলম রশিদ বলেন, তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গরুর জন্য সার্বক্ষণিক ফ্যান ও পানির ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। তীব্র তাপদাহে গত মাসে আমার পাঁচটি গাভির বাচ্চাও মারা গেছে। এর ওপর রয়েছে টিকা সংকট। এই অবস্থায় বাইরে থেকে গরু আসলে খামারিরা বড় লোকসানে পড়বেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ডেইরি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুনজের আলম মানিক বলেন, করোনার পর থেকেই লোকসান করে খামার টিকিয়ে রেখেছেন জেলার খামারিরা। তবে ভারতীয় গরুতে খামারির স্বপ্ন ফিকে হতে বসেছে। তিনি খামারিদের বাঁচাতে সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।

দি চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, সীমান্তে গরু আনতে গিয়ে নিয়মিতই হতাহতের খবর আসছে। অথচ বিজিবি এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গরু রাতের অন্ধকারে আসলেও সেগুলো জব্দ করা হচ্ছে। নাইট ভিশন ক্যামেরাসহ কঠোর নজরদারির মাধ্যমে জিরো টলারেন্স নীতিতে চোরাচালান ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে।

তবে ভারতীয় গরু চোরাচালান বাড়ায় সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। চোরাই গরু থেকে চাঁদা আদায়কারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে বলেন তিনি।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে এবার দুই লাখ ২৬ হাজার ৫০টি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এর বিপরীতে জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা এক লাখ ৬৭ হাজার ২০২টি। ফলে স্থানীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বা ৫৮ হাজার ৮৪৮টি পশু উদ্বৃত্ত রয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।