দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রেক্ষাপটে বিচারহীনতার অভিযোগটি ফের সামনে এসেছে। নিম্ন ও উচ্চ আদালতে লাখ লাখ মামলার স্তূপ, দীর্ঘসূত্রতা ও উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে হতাশা ক্রমেই ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। দ্রুত বিচার দাবিতে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠছে। চরম এ বাস্তবতায় উচ্চ ও নিম্ন আদালতের বিচারক সংকটকে মামলা কার্যক্রমে স্থবিরতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদের সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল এবং ১৭ মে স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয় বিলুপ্ত ঘোষণা সার্বিক পরিস্থিতিকে আরো হতাশাজনক করেছে বলে অভিমত আইনজ্ঞদের।
দেশের সর্বোচ্চ আদালত হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলাজট ক্রমান্বয়ে বাড়লেও সে তুলনায় কমছে বিচারপতি। প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিচারপতি না থাকায় একটি বেঞ্চ দিয়ে মামলা নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালতে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে আরো কিছু বিচারপতি নিয়োগের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হলেও শেষ পর্যন্ত নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। তাই নতুন সরকার আসার পর বিচারপতি নিয়োগ দ্রুত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু তা না হয়ে উল্টো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের শুধু আপিল বিভাগেই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৪১ হাজারের বেশি। গত পাঁচ মাসে মামলা আরো বেড়েছে। মামলা বাড়লেও বাড়েনি বিচারপতি। বর্তমানে আপিল বিভাগে পাঁচজন বিচারপতি কর্মরত। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের অন্য চার সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এসএম এমদাদুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। এর মধ্যে আগামী ১৫ জুলাই অবসরে যাবেন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম।
অন্যদিকে হাইকোর্ট বিভাগে বর্তমানে ৬৩টি বেঞ্চে কর্মরত রয়েছেন ৯৭ জন বিচারপতি। ফলে বিচারপতির অভাবে দ্বৈত বেঞ্চ গঠন করা যাচ্ছে না। ঝুলে রয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদ্য নির্বাচিত সম্পাদক মোহাম্মদ আলী আমার দেশকে বলেন, বিচারকের অভাবে অনেক বেঞ্চ খালি পড়ে আছে। অথচ মামলার স্তূপ। আবার আপিল বিভাগে বর্তমানে বিচারক সংকটে মাত্র একটি বেঞ্চ কার্যক্রম চলমান। এক সময় আপিল বিভাগে তিনটি বেঞ্চও ছিল। তাই সব মিলিয়ে দ্রুত বিচারক সংকট কাটাতে পদক্ষেপ আশা করছি।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, মামলাজট কমানোর জন্য বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তবে নামকাওয়াস্তে বিচারক নিয়োগ দেওয়ার কোনো অর্থ নেই। দরকার যোগ্যতাসম্পন্ন বিচারক।
সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী জানান, বর্তমান প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই মামলা নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছেন। তার আন্তরিক উদ্যোগের ফলে মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়ছে। তিনি ইতোমধ্যে বহু পুরোনো ঝুলে থাকা মামলাগুলোও দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা নিয়েছেন। একইভাবে নিম্ন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদেরও এজলাসের সময় সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দ্রুত বিচারকার্য সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রেষণে প্রায় তিনশ বিচারক
তীব্র বিচারক সংকটেও প্রায় তিনশ বিচারক বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় স্থানে প্রেষণে নিয়োগ নিয়ে বসে আছেন। কিন্তু আদালতে হাজার হাজার মামলা পরিচালনায় গলদঘর্ম সাধারণ বিচারকরা। মামলাজটে কোনো কোনো সময় একই মামলার শুনানির তারিখ একটি থেকে আরেকটির বিরতি কখনো কখনো সাত/আট মাসেও পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বিভিন্ন তদবির ও রাজনৈতিক সুবিধায় নিম্ন আদালতের কয়েকশ বিচারক বিভিন্ন দপ্তরের আইন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পদে আসীন রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বিচারক কয়েক বছর ধরে প্রেষণে রয়েছেন। এর মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই সংযুক্ত রয়েছেন শতাধিক বিচারক। এদের মধ্যে অসুস্থতা, শিক্ষা ছুটিসহ নানাভাবে বিচারকাজের বাইরে আছেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিম্ন আদালতের কয়েকজন বিচারক জানান, আমরা মামলা সামাল দিতে দিনরাত অস্থির। কিন্তু অনেকেই বিভিন্ন অজুহাতে ঢাকাসহ বিভিন্ন দপ্তরে প্রেষণে থাকতেই পছন্দ করছেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক মহাসচিব মো. শাহজাহান সাজু আমার দেশকে বলেন, বিচারক সংকটের এ ক্রান্তিকালে আরো কীভাবে বিচারক বাড়ানো যায়, তা নিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। আর এ সংকট কেটে না ওঠা পর্যন্ত বিচারকদের বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় স্থানে প্রেষণে রাখা যুক্তিযুক্ত নয়।
তিনি বলেন, জনসংখ্যার অনুপাতে বাংলাদেশের বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। আমেরিকায় ১০ লাখ মানুষের জন্য ১০৭ জন, কানাডায় ৭৫ জন, ইংল্যান্ডে ৫১ জন, অস্ট্রেলিয়ায় ৪১ জন, ভারতে ১৮ জন বিচারক রয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে ১০ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ১০ জন বিচারক রয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত বিচারের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন প্রণীত হয়েছে। উক্ত আইন অনুযায়ী একটি জেলায় একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করার বিধান আছে। বর্তমানে দেশে ৫৪টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রয়েছে। কোনো কোনো জেলায় একটি আদালতেই ৬-৭ হাজারের অধিক মামলা বিচারাধীন আছে। একজন বিচারকের পক্ষে এসব মামলা পরিচালনা করা বাস্তবতার নিরিখে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় আরো অধিক সংখ্যক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা অতীব জরুরি। অন্যথায় এই আইনের উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। এ বাস্তবতায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। আশা করি, সরকার এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবে।