Image description

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সীমা আক্তার। অভাব-অনটনের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। ছোট্ট একটি সুখের সংসারের স্বপ্ন নিয়েই আট মাস আগে বিয়ে হয়েছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে নির্যাতন, অপমান আর আগুনে দগ্ধ হওয়ার বিভীষিকায়।

 

যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে মারধর ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর এবার কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে একটি ছাগল দাবি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। দাবি পূরণ করতে না পারায় সীমাকে মারধর ও আগুনে দগ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে।

 

সোমবার (১৮ মে) সন্ধ্যায় রামগতি উপজেলার আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বালুরচর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে আহত সীমা কমলনগর উপজেলার পূর্ব চর ফলকন গ্রামে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১৯ মে) সকালে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পরিবারের তত্ত্বাবধানে বাড়িতে চিকিৎসা চলছে।

ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সীমার আগুনে দগ্ধ মুখের ছবি এবং ‘যৌতুকের টাকায় কোরবানির ছাগল না পেয়ে নির্যাতন’ শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওটি দেখে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

স্থানীয়রা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার সকালে কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দা সীমার খোঁজ নিতে আসেন। পরে তারা সীমাকে কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

ভুক্তভোগী সীমা আক্তার বলেন, ‘বিয়ের পর থেইকা তারা বিভিন্ন সময় টাহা চাইতো। দুই লাখ টাকা যৌতুকও চাইছে। আমরা গরিব মানুষ, এত টাকা দেওনের সামর্থ্য নাই। সোমবার দুপুরে শ্বশুর কোরবানির জন্য একটা ছাগল কিনে দিতে কইছে। আমি কইছি, বাবার অবস্থা ভালো না। এই কথা কইতেই সন্ধ্যায় আমারে মারধর করছে। একপর্যায়ে আগুনও লাগে মুখে। আমি চিৎকার দিলে আশপাশের মানুষ আইয়া আমারে বাঁচাইছে।’

 

সীমার বাবা আজাদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সীমার তিন ভাইয়ের অল্প আয়ে কোনোমতে সংসার চলে তাদের। বড় ভাই আরিফ হোসেন ও তারেক হোসেন নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। ছোট ভাই ইমন হোসেন কৃষিকাজ করেন। পরিবারের ছোট বোন স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।

 

সীমার বড় ভাই আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা খুব কষ্টে সংসার চালাই। বোনের সুখের জন্য ধার-দেনা করে বিয়ে দিছি। এরপরও তারা বারবার টাকা চাইতো। এখন আমার বোনরে মাইরা শেষ কইরা ফেলতে চাইছে। আমরা গরিব বইলা কি মানুষের জীবন এতো সস্তা।’

 

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় সীমার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে যান। পরে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে প্রাথমিক সেবা দেওয়া হয়। মুখে বরফ লাগিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

কমলনগরের স্থানীয় মসজিদের খতিব মাওলানা মোহাম্মদ ইসমাইল হোসেন বলেন, কোরবানির ঈদে যৌতুক হিসেবে ছাগল দাবি করা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম ও জঘন্য কাজ। কোরবানি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কারও ওপর চাপ সৃষ্টি বা নির্যাতনের জন্য নয়। যৌতুকের টাকায় বা জুলুম করে আদায় করা কোরবানি আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। যারা এমন কাজ করে, তারা সমাজ ও ধর্ম দুইয়েরই ক্ষতি করছে।

 

তিনি আরও বলেন, একজন গরিব বাবার ওপর কোরবানির পশুর চাপ সৃষ্টি করে মেয়েকে নির্যাতন করা অমানবিক। সমাজকে এ ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।

 

ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামী আব্দুর রহিম ও শ্বশুর মিনাজ উদ্দিন মেজু পলাতক রয়েছেন। তাই তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

কমলনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. নাহিদা আক্তার মিশু বলেন, ভুক্তভোগীর মুখে আগুনে পোড়া দাগ রয়েছে। এ ছাড়া হাতে ও পায়ে আঘাতজনিত ব্যথার কথাও জানিয়েছেন। তাকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে।

 

এ বিষয়ে কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল আলম বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।