কাগজে-কলমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে এটি যেন পারিবারিক পুনর্বাসন কেন্দ্র। ৭৬ জন শিক্ষকের ৭৩ জনই ভুয়া! তাদের মধ্যে কলেজ শাখায় ৬১ জনের সবাই এবং স্কুল শাখায় পড়ান ১২ জন। স্কুলে অবশ্য মোট শিক্ষক আছেন ১৫ জন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের চিত্র এটি। এমন নজিরবিহীন কাণ্ড উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্তে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তার পরিবারের ১১ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন, যাদের সবারই সনদ জাল। এর মধ্যে স্ত্রী, ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, বোন, বোনের জামাই, শ্যালকের স্ত্রী, চাচাতো ভাইবোন; বাদ পড়েননি নিজের ব্যক্তিগত গাড়িচালকও। প্রতিষ্ঠানটিকে স্রেফ পারিবারিক পুনর্বাসন কেন্দ্র বানাতে গিয়ে তিনি জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগ দিয়েছেন। যিনি এই কাণ্ড ঘটিয়েছেন, সেই অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকেরই সব সনদ জাল।
ডিআইএ তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বলছে, শিক্ষক নিয়োগে ইমদাদুল হক নিয়েছেন ঘুষ। নিয়োগ দেওয়ার পর তাদের বেতন-ভাতার একটা অংশও নিয়ে নিতেন তিনি। এসব নিয়োগে ব্যাকডেটে সব নথি তৈরি করা হতো। নিয়োগ পাওয়া এই ভুয়া ব্যক্তিদের দেওয়া বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি কোষাগারের ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ফেরত আনতে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে কলেজ শাখার ৬১ জন বেতন-ভাতা হিসেবে নিয়েছেন ৪ কোটি ২১ লাখ ৩৩ হাজার এবং স্কুল শাখার ১২ জন নিয়েছেন ১ কোটি ৩৬ লাখ ২২ হাজার টাকা। আর ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, প্রতিষ্ঠানটির সবাই এমপিওভুক্ত হিসেবে কর্মরত। কলেজ শাখার ৬১ জনের সবাই এবং স্কুল শাখার ১৫ জনের মধ্যে ১২ জন জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। যার অধিকাংশের একাডেমিক, শিক্ষক নিবন্ধন ও অভিজ্ঞতা সনদ জাল। শুধু জাল সনদে থেমে থাকেননি তারা। তাদের নিয়োগে যত ভুয়া কাগজ তৈরি করতে হয়েছে, সবই করেছেন অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীরা। ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সরকারের বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) জরিপে এসব ব্যক্তির নাম না থাকলেও ২০২২ সালে হঠাৎ করে তারা অন্তর্ভুক্ত হন।
ইমদাদুল হকের স্ত্রী ইসমেতারাকে অফিস সহায়ক, ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস ল্যাব সহকারী, ছেলের বউ সুস্মিতা আক্তার জেরিনকে ল্যাব সহকারী, মেয়ে ইসরাত জাহানকে ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এ ছাড়া বোন আসমা খাতুনকে কৃষিশিক্ষার সহকারী শিক্ষক, বোনের জামাই আজিজুল হককে বাণিজ্য বিভাগের প্রভাষক, শ্যালকের স্ত্রী শেফালি খাতুনকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ইমদাদুল। চাচাতো ভাই কামরুল ইসলামকে ব্যাংকিং বিভাগের প্রভাষক এবং চাচাতো বোন শাহনাজ পারভীনকে নিয়োগ দেন প্রভাষক হিসেবে। তার ব্যক্তিগত গাড়িচালকও এই নিয়োগ থেকে বাদ যাননি।
ইমদাদুলের সবই জাল
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইমদাদুল হক যে সনদে চাকরি নিয়েছেন, সেটিও তার নয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী, তিনি ২০০৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক করেছেন, যার রোল নম্বর-৯০৩৫৩২৭ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর-৮০৯৩৯৮৪। সনদটি যাচাইয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায় তদন্ত কমিটি। তারা জানিয়েছে, এই রোল ও রেজিস্ট্রেশনের প্রকৃত শিক্ষার্থীর বাবা-মায়ের নামের সঙ্গে ইমদাদুল হকের মা-বাবার নামের মিল নেই।
এ ছাড়া ‘আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০৫ সালে একটি মাস্টার্স সনদও নেন তিনি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) জানিয়েছে, দেশে এই নামে অনুমোদিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
ভুয়া এসব সনদ ব্যবহার করে ইমদাদুল হক নিয়েছেন পদোন্নতিও। তিনি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু নিয়ম অনুযায়ী, স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হতে গেলে কোনো স্বীকৃত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়, যা তার ছিল না। তিনি নিম্নমাধ্যমিক থেকে সরাসরি কলেজে পদোন্নতি নেন, যা বিধিবহির্ভূত এবং কলেজে যোগদানের দাবি করার পরও আগের নিম্নমাধ্যমিক পদের বেতন তুলেছেন নিয়মিত।
তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০১৪ সালে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেছেন ইমদাদুল হক। কিন্তু ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিম্নমাধ্যমিকের প্রধান শিক্ষক পদের বেতন-ভাতাও তুলেছেন।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ইমদাদুল হক আগামীর সময়কে বলেছেন, ডিআইএ আংশিক তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছে, যা সঠিক নয়। আর পরিবারের সবাই নিজস্ব যোগ্যতায় চাকরি পেয়েছেন। তাই টাকা ফেরত দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কথা হয়েছে অভিযুক্ত ইমদাদুলের স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ ও মেয়ের সঙ্গেও। তারাও এই তদন্তকে একপেশে বলে মন্তব্য করেছেন এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে তাদের নিয়োগ ও সনদ বৈধ বলে প্রমাণ হবে দাবি করেন।
তদন্তকারী সংস্থা ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক সহিদুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করে জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে, এখন আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মূল দায়িত্ব তাদের।
ডিআইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে শুধু বিভাগীয় ব্যবস্থাই নয়, বরং জালিয়াতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের দায়ে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।