জ্বালানির জন্য রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে কয়েক সপ্তাহ আগেও ছিল দীর্ঘ লাইন। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি, পিকআপ ভ্যান নিয়ে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হওয়া তেল সংকটের প্রভাব পড়েছিল দেশের বাজারেও।
রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও ও যাত্রাবাড়ীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও তেল নেওয়ার জন্য বাড়তি কোনো চাপ নেই। জ্বালানির জন্য গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষাও করতে হচ্ছে না। চালকরা স্বল্প সময়েই তেল নিয়ে ছুটছেন নিজ গন্তব্যে।
স্যাম অ্যাসোসিয়েট লিমিটেডের পাম্পের ক্যাশিয়ার শরিফ আহমেদ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিপো থেকে যথেষ্ট পরিমাণ তেল পাচ্ছি। মাসখানেক আগে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যেত না। জোগানের চেয়ে চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল। আগে যেখানে আমাদের সারা দিনে চাহিদা ছিল ১০ হাজার লিটার, চাহিদা বাড়ায় লাগত ২০ হাজার লিটার। অতিরিক্ত যে ১০ হাজার লিটার লাগত, চাহিদামতো সেটা পূরণ করতে পারতাম না। এমনকি আমরা ডিপো থেকেও চাহিদামতো তেল পেতাম না। এজন্য পাম্পে মোটরসাইকেলের লম্বা সিরিয়াল লেগে থাকত।
প্রাইভেটকারচালক কাজী মুবিন বলেন, তেলের দাম বাড়ার পর এখন পাম্পগুলো ফাঁকা। এখন কোনো সিরিয়াল দেওয়া লাগে না। দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ তেল ছিল কিন্তু সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও আমাদের সরকার বলেছিল দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত আছে।
মিরপুর ২ নম্বরে স্যাম অ্যাসোসিয়েট পাম্পের মিটারম্যান রিফাত বলেন, আমাদের তেল যা লাগত তার মধ্যে তিন ভাগের এক ভাগ দিত বা অর্ধেক দিত। ডিপো থেকে আমরা চাহিদামতো তেল পেতাম না। তেলের দাম যখন কম ছিল তখন কাস্টমার ফুল টাঙ্কি তেল নিত স্টক করার জন্য। তেলের দাম বাড়ার পর এখন দিনে যতটুকু লাগে ততটুকুই নেয়।
বাইকচালক পারভেজ মোশারফ বলেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যার যতটুকু দরকার ততটুকুই নিচ্ছে। সে কারণে পাম্পে সিরিয়াল কম। দুই মিনিটেই তেল নিয়ে চলে যাওয়া যায়। তেলের দাম বাড়ায় সংকট উধাও হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, তেলের সংকট তো শুধু বাংলাদেশে না, সমগ্র পৃথিবীতেই ছিল। আমাদের দেশে বাইক বেশি, তেলের চাহিদাও বেশি।
পাম্পে কথা হয় রাইড শেয়ারকারী মোটরসাইকেল চালক সোহেল রানার সঙ্গে। তিনি বলেন, আগে তেলের জন্য প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। এখন ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই তেল নিতে পারছি। তবে তেলের দাম বাড়ায় খরচ বেড়ে গেছে।
এই রাইডার বলেন, সংকটের সময় সবাই বাড়তি তেল মজুত করার চেষ্টা করেছিল। এখন দাম বাড়ায় অনেকেই অপ্রয়োজনে তেল নিচ্ছে না।
গত ১৮ এপ্রিল সরকার ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ায়। নতুন দামে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা ও পেট্রোল ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দাম সমন্বয়ের পর বাজারে সরবরাহও বাড়ানো হয়েছে। একইসঙ্গে অবৈধ মজুত ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে কৃত্রিম সংকট কমেছে।
তেজগাঁওয়ে কথা হয় বাসচালক কামালের সঙ্গে। তিনি বলেন, লাইন কমেছে ঠিকই, কিন্তু এখন আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে গেছে। তেলের দাম বাড়লে সবকিছুর খরচ বাড়ে।
তিনি বলেন, তেলের দাম বাড়ায় প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। পরিবহন খরচ বেড়েছে, নিত্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়ছে। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে।
হঠাৎ সংকট উধাওয়ের নেপথ্যে কী
দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর হঠাৎ করেই বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হয়। আগে যেখানে বিভিন্ন এলাকায় তেলের সংকট, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ লাইনের চিত্র দেখা গিয়েছিল, সেখানে দাম সমন্বয়ের পর পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। তবে এর পেছনে শুধু দাম বৃদ্ধি নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, যুদ্ধাবস্থায় শিথিলতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার মতো একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে আসা, যুদ্ধবিরতির পরিবেশ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা কিছুটা কমে যাওয়ায় সরকার নতুন করে তেল আমদানির সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে।
তার মতে, শুধু অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম বাড়িয়ে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি অত্যধিক বেড়ে যায়, তাহলে সেই অনুপাতে প্রয়োজনীয় ডলার জোগাড় করার সক্ষমতা সরকারের সবসময় থাকে না। সেক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে সরকার বাধ্য হয়ে তেল আমদানি কমিয়ে দেয়।
এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম ১০০ বা ১২০ ডলারের ওপরে চলে যায় এবং প্রতিদিন বাড়তে থাকে, তখন শুধু দেশের বাজারে দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয় না। কারণ সরকার কি সেই পরিমাণ ডলার জোগাড় করে প্রয়োজনীয় তেল আমদানি করতে পারবে? বাস্তবতা হলো, সেই সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
ড. শামসুল আলম জানান, সরকার তখন একদিকে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করেছে, অন্যদিকে সরবরাহও সীমিত করেছে। এর ফলে বাজারে সংকট আরও প্রকট হয়েছে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে কালোবাজারি এবং অনিয়মও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
তিনি বলেন, একদিকে সরকার চাহিদা মতো তেল আমদানি করতে পারেনি, অন্যদিকে কালোবাজারির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে আমরা এক ধরনের ক্রসফায়ার পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। তাছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে অনেক সময় বলা হয়েছে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বাস্তবে বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের সুযোগ কিছু ক্ষেত্রে ছিল। সরকার সেই সুযোগ ব্যবহারও করেছে, যদিও সময়মতো পর্যাপ্ত আমদানি সবসময় সম্ভব হয়নি।
দেশে সাধারণত ৪৫ দিনের জ্বালানি মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি চলাকালে মজুত প্রায় ৩০ দিনের পর্যায়ে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। তখন সরকার সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে সীমিত মজুতকে আরও বেশি সময় ধরে চালানোর চেষ্টা করেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
ড. শামসুল আলম বলেন, ৩০ দিনের মজুতকে ৪০ বা ৪৫ দিন চালাতে গিয়ে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। সেইসঙ্গে আমদানি সীমিত ছিল এবং কিছু তেল কালোবাজারেও চলে গেছে। সবমিলিয়ে তখন সংকট তৈরি হয়েছিল। এখন আন্তর্জাতিক বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হওয়ায় সংকট কমে গেছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও তেলের দাম বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আবারও ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে পড়তে হতে পারে।