Image description

সহিদুল আলম স্বপন

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে আবারও আঁধার ঘনিয়ে আসছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর পাল্টা হুঁশিয়ারি মিলিয়ে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তা নিছক বাগযুদ্ধ নয় এটি একটি সুগভীর কৌশলগত সংকটের দৃশ্যমান অংশ মাত্র। যখন দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র প্রকাশ্যে পরস্পরকে 'ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়ার' ভাষায় কথা বলে, তখন সেই উচ্চারণ কেবল কূটনৈতিক অসংযমের নিদর্শন নয়, বরং তা গোটা উপমহাদেশের প্রায় দুই শত কোটি মানুষের অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। এই প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার নিরিখে একটি গভীর, নিরপেক্ষ ও গঠনমূলক বিশ্লেষণ আজ কেবল সময়ের দাবি নয়, এটি ঐতিহাসিক দায়িত্বও বটে।

 

প্রথমেই বুঝতে হবে, এই সংকটের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের রক্তাক্ত স্মৃতি থেকে শুরু করে কাশ্মীর প্রশ্ন, তিনটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ, কার্গিল সংঘাত এবং একাধিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা সব মিলিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্ক এমন একটি জটিল গ্রন্থিতে আবদ্ধ যা সহজে খোলার নয়। পেহেলগাম হামলা এবং তার পরবর্তী সামরিক উত্তেজনা সেই পুরনো ক্ষতে নতুন করে নুন ছিটিয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই ক্ষতকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা না করে বরং ঘরোয়া রাজনীতির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে দশকের পর দশক ধরে। খাজা আসিফ যখন 'সুনির্দিষ্ট বিজয়' দাবি করেন এবং দ্বিবেদী যখন পাকিস্তানকে 'ভূগোল থেকে মুছে দেওয়ার' হুমকি দেন, তখন উভয় বক্তব্যের পেছনেই কাজ করে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। জাতীয়তাবাদের আবেগকে উসকে দিয়ে ক্ষমতার ভিত মজবুত করার এই পুরনো কৌশল দুই দেশেই সমান কার্যকর এবং সমান বিপজ্জনক।

বিশ্বের ইতিহাসে পারমাণবিক শক্তিধর দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ কখনো হয়নি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সত্য। স্নায়ুযুদ্ধের চার দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কোরিয়া থেকে ভিয়েতনাম, কিউবা থেকে আফগানিস্তান সর্বত্র প্রক্সি যুদ্ধ লড়েছে, কিন্তু সরাসরি মুখোমুখি হয়নি। ১৯৬২ সালের কিউবান মিসাইল সংকটে পৃথিবী পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেনেডি ও ক্রুশ্চেভ উভয়েই পিছু হটেছিলেন কারণ উভয়ই জানতেন, পারমাণবিক যুদ্ধে কোনো বিজয়ী থাকে না, থাকে শুধু ধ্বংসস্তূপ। ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বকে এই পাঠ আজ নতুন করে আত্মস্থ করতে হবে। কারণ উপমহাদেশের ভৌগোলিক ঘনত্ব, জনসংখ্যার বিশালতা এবং পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ বিবেচনায় এখানে যেকোনো পারমাণবিক সংঘাতের পরিণতি হবে মানব সভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব বিপর্যয়।

সিন্ধু পানিচুক্তির প্রশ্নটি এ প্রসঙ্গে বহুমাত্রিক তাৎপর্য বহন করে। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই চুক্তি তিনটি যুদ্ধ, অগণিত সংঘাত এবং দীর্ঘ কূটনৈতিক শৈত্যের মধ্যেও টিকে ছিল যা প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা রাখলে সংকট মোকাবেলা সম্ভব। পার্মানেন্ট কোর্ট অব আরবিট্রেশনের সাম্প্রতিক রায় পাকিস্তানের পক্ষে গেছে এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু একই সঙ্গে এই বিষয়টিও স্মরণ রাখা জরুরি যে পানিসম্পদ ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, সিন্ধু অববাহিকার পানিপ্রবাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় যৌথ বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও সহযোগিতা গড়ে তোলা উভয় দেশের জন্যই অস্তিত্বের প্রশ্ন।

আফগানিস্তান প্রসঙ্গে খাজা আসিফের উদ্বেগের মধ্যে একটি বাস্তব সত্য আছে। আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য সত্যিকারের হুমকি। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান 'ভারতের প্রক্সি' তত্ত্বে নেই। আফগানিস্তানকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান প্রতিযোগিতা কাবুলকে একটি ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে পরিণত করেছে, যার মূল্য দিচ্ছে আফগান জনগণ। ইরানের সঙ্গে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, মাদক পাচার রোধ এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি করা সম্ভব যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রমাণ করেছে যে দশকের পর দশকের শত্রুতাও কূটনৈতিক সাহস ও তৃতীয় পক্ষের সক্রিয় ভূমিকায় অতিক্রম করা যায়।

ইসরায়েল ও ইরান প্রশ্নে খাজা আসিফের বিশ্লেষণ আংশিকভাবে সঠিক হলেও এটি একটি বিপজ্জনক যুক্তিরেখাও তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে টেনে আনলে সমস্যা সমাধান হয় না, বরং জটিলতা বাড়ে। ইসরায়েল-ভারত কৌশলগত সম্পর্ককে 'পাকিস্তানবিরোধী অক্ষ' হিসেবে উপস্থাপন করা যেমন অতিসরলীকরণ, তেমনি পাকিস্তান-চীন-তুরস্ক-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে 'ইসলামিক ব্লক' হিসেবে দেখাও একইভাবে বিভ্রান্তিকর। আধুনিক ভূ-রাজনীতি এতটা সরলরৈখিক নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা তাদের নিজস্ব স্বার্থের কারণেই অপরিহার্য। এই বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে একটি বহুপাক্ষিক শান্তি উদ্যোগ গড়ে তোলা সম্ভব।

ইউরোপের অভিজ্ঞতা এখানে একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পর ফ্রান্স ও জার্মানি যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত ছিল ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায়ের মাধ্যমে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতার সূচনা করেছিল। সেই ছোট পদক্ষেপই পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশাল কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে। একইভাবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরুদ্ধার, ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো ছোট ছোট পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদী আস্থা তৈরির ভিত্তি হতে পারে। অথচ বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য প্রায় শূন্যের কোঠায়, যা উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলে ভারত-পাকিস্তান বাণিজ্য বার্ষিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারত।

দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘ বিভাজন এবং সীমিত কিন্তু অর্থবহ যোগাযোগের উদ্যোগও ভারত-পাকিস্তান প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক। কেসং শিল্প অঞ্চলের মতো যৌথ উদ্যোগ, এমনকি উত্তেজনার মধ্যেও, দুই দেশের মধ্যে একটি সেতুবন্ধনের কাজ করেছিল। ভারত-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর এ ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব অতীতে আলোচনায় এসেছিল। সেই ভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত করার সময় এসেছে।

সার্ক (SAARC) প্রশ্নটি এই আলোচনায় কেন্দ্রীয় গুরুত্ব বহন করে। ১৯৮৫ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত এই আঞ্চলিক সংস্থা আসিয়ানের মতো একটি কার্যকর সহযোগিতার মঞ্চ হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। আসিয়ান দেশগুলো যাদের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈরিতা ও আঞ্চলিক বিরোধ ছিল আজ বিশ্বের অন্যতম সফল আঞ্চলিক জোট। ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্র একসময় ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, আজ তারা কৌশলগত অংশীদার। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে 'কনফ্রন্টাসি' যুদ্ধের পরেও দুই দেশ আসিয়ানের ছাতার নিচে সহযোগিতার পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু সার্ক আজ কার্যত মৃত এবং এর প্রধান কারণ ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা। এই মৃতপ্রায় সংস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে না পারলে দক্ষিণ এশিয়া বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের ভূমিকার কথা এ প্রসঙ্গে আলাদাভাবে বলা দরকার। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ একদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভাগ করে, অন্যদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধন রয়েছে। এই অনন্য অবস্থান বাংলাদেশকে একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ জানে যুদ্ধের মূল্য কত বেশি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ঢাকা সার্কের পুনরুজ্জীবনে নেতৃত্বমূলক ভূমিকা নিতে পারে এবং ভারত-পাকিস্তান সংলাপ প্রক্রিয়ায় একটি নিরপেক্ষ মঞ্চ প্রদান করতে পারে।

নাগরিক সমাজের ভূমিকার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খাজা আসিফ নিজেই স্বীকার করেছেন যে ভারতে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক কণ্ঠস্বর রয়েছে এবং সেনাবাহিনী ও নাগরিক সমাজের অবস্থান এক নয়। একইভাবে পাকিস্তানেও শান্তিকামী নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও ব্যবসায়ীরা সংলাপের পক্ষে। দুই দেশের শান্তিকামী নাগরিক সমাজের মধ্যে সংযোগ স্থাপন, যৌথ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ এবং ট্র্যাক-টু কূটনীতি
অর্থাৎ সরকারি চ্যানেলের বাইরে অনানুষ্ঠানিক সংলাপ অনেক সময় সরকারি আলোচনার পথ সুগম করে দেয়। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটে 'জেনেভা ইনিশিয়েটিভ' এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের শান্তি প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের ভূমিকা এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পারমাণবিক ঝুঁকি হ্রাসের প্রশ্নটি এই আলোচনার সবচেয়ে জরুরি অধ্যায়। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক অস্ত্র অপ্রসার চুক্তি (NPT) স্বাক্ষর করেনি। উভয় দেশের পারমাণবিক মতবাদ, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং পারমাণবিক অস্ত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। পাকিস্তানের 'ফার্স্ট ইউজ' নীতি এবং ভারতের 'নো ফার্স্ট ইউজ' নীতির মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে, তা যেকোনো সংকটকে দ্রুত পারমাণবিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এই ঝুঁকি কমাতে হট লাইন যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, পারমাণবিক স্থাপনায় পারস্পরিক আক্রমণ না করার চুক্তি নবায়ন এবং পারমাণবিক ঝুঁকি হ্রাস কেন্দ্র স্থাপনের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধিমূলক পদক্ষেপ অবিলম্বে নেওয়া দরকার।

সামরিক ব্যয়ের অর্থনৈতিক মূল্যের দিকটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। পাকিস্তান তার জিডিপির প্রায় চার শতাংশ এবং ভারত প্রায় আড়াই শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে। এই বিশাল সম্পদ যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হতো, তাহলে উভয় দেশের কোটি কোটি দরিদ্র মানুষের জীবনমান আমূল পরিবর্তিত হতে পারত। পাকিস্তানে আজও শিশু অপুষ্টির হার বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ভারতেও দারিদ্র্য ও বৈষম্যের চিত্র উদ্বেগজনক। এই বাস্তবতায় সামরিক হুংকারের রাজনীতি কেবল নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ নয়, এটি অর্থনৈতিকভাবেও আত্মঘাতী।

জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট এই পুরো আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করে। দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। বন্যা, খরা, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহ এই সংকটগুলো কোনো রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল, পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকা এবং ভারতের গাঙ্গেয় সমভূমি সবই এই হুমকির মুখে। এই অস্তিত্বগত সংকট মোকাবেলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা কেবল কাম্য নয়, এটি অপরিহার্য। অথচ দুই দেশ যখন পরমাণু অস্ত্রের হুমকিতে মেতে থাকে, তখন জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ হাতছাড়া হয়।

পরিশেষে বলতে হয়, ইতিহাসের বিচারে নেতারা দুভাবে স্মরণীয় হন, হয় তারা যুদ্ধ জিতে ক্ষণিকের বীর হন, নয়তো শান্তি প্রতিষ্ঠা করে চিরকালের মহান হন। নেলসন ম্যান্ডেলা বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে যতটা না স্মরণীয়, তার চেয়ে বেশি স্মরণীয় ক্ষমা ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি করে নিজের জীবন দিয়েছিলেন, কিন্তু ইতিহাসে তিনি সাহসী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছেন। ভারত ও পাকিস্তানের নেতৃত্বের সামনেও সেই বিকল্প খোলা আছে। 'ইতিহাসে বিলীন' করার ভাষা নয়, 'ইতিহাস রচনার' সাহসই আজ দুই দেশের জনগণের প্রত্যাশা। দুই শত কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই সিদ্ধান্তের ওপর এবং সেই দায়িত্বের ভার কোনো সামরিক বিজয়ের দাবি বা কূটনৈতিক হুংকারে লঘু করার সুযোগ নেই।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি