রাজধানীর বাংলামোটর ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলছে। স্টপ লাইনের পেছনে অপেক্ষা করছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের সারি। ঠিক একই সময়ে উল্টো দিক থেকে আসা কয়েকটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের মাথার ওপরে একটি এআই-চালিত (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ক্যামেরা ঘুরতে ঘুরতে নিঃশব্দে পুরো মোড়ের ওপর নজর রাখছে।
ঢাকার প্রধান প্রধান ট্রাফিক মোড়ে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী শনাক্ত করতে এআই-চালিত ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। লাল বাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন পার হওয়া, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো ও উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধের জন্য ইতিমধ্যে কয়েকশো মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। নিবন্ধিত মোটরযানের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকরভাবে কাজ করলেও একটি বড় অনিয়ন্ত্রিত অংশ—যেমন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নম্বর প্লেটহীন ছোট যানবাহন ও অবৈধ রিকশা—এর আওতার বাইরেই রয়ে গেছে।
এআই ক্যামেরার সীমাবদ্ধতা যেখানে
বাংলামোটরে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট রাকিব টিবিএসকে বলেন, নিবন্ধন না থাকায় এ ধরনের যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, এআই ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের ছবি ধরা পড়লেও এসব যানবাহনের বিরুদ্ধের মামলা দেওয়া যায় না, কারণ এই যানবাহনগুলো ডেটাবেজে নেই।
তিনি আরও বলেন, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনগুলোর কারণে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এসব যানবাহনের জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় প্রায় এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো স্টপ লাইন পার হচ্ছে, জেব্রা ক্রসিং দখল করছে এবং উল্টো লেনে প্রবেশ করছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে যানজট।
অন্যদিকে অনেক মোটরসাইকেল চালককে সিগন্যাল মেনে চলতে এবং হেলমেট পরতে দেখা গেছে। কয়েকজন চালক জানান, এআই-ভিত্তিক নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে জরিমানার ভয়ে নিয়ম মানার প্রবণতা বেড়েছে।
ফার্মগেটে রাইড শেয়ারিং চালক মো. রুবেল টিবিএসকে বলেন, ক্যামেরার কারণে মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়লেও অটোরিকশাগুলো প্রতিনিয়ত নিয়ম ভাঙছে। তিনি বলেন, উল্টো পথে আসা যানবাহনের কারণে নিয়ম মেনে চলা চালকেরা প্রায়ই আটকে যান।

ট্রাফিক কর্মকর্তারা বলছেন, এআই ব্যবস্থাটি মূলত নম্বর প্লেট ও যানবাহনের ডেটাবেজের ওপর নির্ভর করে কাজ করে। ফলে নিবন্ধনহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নাম না প্রকাশের অনুরোধ করে ডিএমপির একজন ট্রাফিক কর্মকর্তা জানান, কেবল গাড়ির মালিকানার তথ্য থাকলেই নোটিশ পাঠানো সম্ভব। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার কোনো নিবন্ধন না থাকায় ক্যামেরায় আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ধরা পড়লেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চালানো যায় না।
তবে অটোরিকশা চালকদের দাবি, সড়কের পরিস্থিতির কারণেই তারা এমন আচরণ করতে বাধ্য হন। বাংলামোটরের চালক শহিদ মিয়া বলেন, বড় যানবাহনের চাপের কারণে প্রায়ই সোজা পথে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া যাত্রীরাও ঘন ঘন যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানোর অনুরোধ করেন।
কাঠামোবিহীন প্রযুক্তি
বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বলেন, সড়কে যানবাহনের প্রাথমিক শৃঙ্খলা বজায় থাকলেই কেবল এআই-চালিত ক্যামেরাগুলো কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এআই-ভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আশানুরূপ ফল দিতে হিমশিম খাবে।
তিনি আরও বলেন, এআই ব্যবস্থাগুলো নিবন্ধিত যানবাহনের সুবিন্যস্ত তথ্যের ওপর নির্ভর করে। ফলে অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের উপস্থিতি আইন প্রয়োগের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে পুরো ব্যবস্থাকে বাধাগ্রস্ত করে। কেবল ক্যামেরার মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি শ্রেণিবিন্যাস-ভিত্তিক আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য কেবল এআই ক্যামেরাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ, উন্নত নিবন্ধন ব্যবস্থা, লেন মেনে চলার প্রবণতা ও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান টিবিএসকে বলেন, এআই ক্যামেরা চালুর প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৫০০-৬০০ মামলা হয়েছে। লাইসেন্সবিহীন যানবাহন, বিশেষ করে রিকশাগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য একটি পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত একটি নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, এই যানবাহনগুলোকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বর্তমানে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও নীতিগত কাঠামো চূড়ান্ত হয়ে গেলে আইনি প্রয়োগের বিষয়টি আরও জোরদার হবে।