পৃথিবীতে এসেছে সবে পাঁচ মাস। এর মধ্যেই শিশু সাব্বির আহমেদের শরীরে হানা দিয়েছে হাম। হাসপাতালের বিছানায় তুলতুলে হাতে ক্যানুলা। শ্বাস-প্রশ্বাস ছন্দহীন, তাই অক্সিজেন মাস্ক! আদরের ছেলের পাশে বসা আবদুর রহিম। বিড়বিড় করে মেলাচ্ছেন ধারদেনার হিসাব। কত টাকা ধার হলো আর কত লাগবে। ঘরে যা ছিল, প্রায় সবই শেষ। এখন কী হবে?
হামের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে শুধু সন্তানের জীবনই নয়, জীবিকার নিরাপত্তাও হারিয়েছে পরিবার। ছেলের পাশে থাকতে টানা ১০ দিন অফিসে যেতে পারেননি রহিমের স্ত্রী আছিয়া বেগম। শেষমেশ চাকরিটা হারিয়েছেন।
গতকাল রোববার রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে ঘুরে এমন অসংখ্য গল্প মিলছে। কারও সঞ্চয় শেষ, কেউ আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করছেন, কেউ আবার গরু-ছাগল বিক্রি করে চিকিৎসার টাকা জোগাড়ে নেমেছেন। হাম শুধু শিশুর শরীরেই আঘাত করছে না; ভেঙে দিচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্থিক ভিত্তি।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েও হামে আক্রান্ত শিশুর পেছনে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। রোগের জটিলতা বাড়লে সেই খরচ লাখ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রোগীর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিএনসিসি হাসপাতালে একজন হাম রোগীর পেছনে প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার ১১১ টাকা খরচ হচ্ছে। গড়ে ছয় দিন হাসপাতালে থাকতে হওয়ায় মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২ হাজার ৬৭০ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে ভর্তি ফি, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, শিশুখাদ্য, নেবুলাইজার মেশিন ও অক্সিজেন মাস্ক কেনার খরচ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, যেসব শিশু জটিল অবস্থায় হাসপাতালে আসছে, তাদের অধিকাংশের শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে। অনেককেই নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। গড়ে ১৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে। সেই হিসাবে এক রোগীর চিকিৎসা ব্যয় দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন– এমন এক শিশুর বাবা আতিয়ার রহমান। তিনি বলেন, দুইটা গরু-বাছুর বিক্রি করে এক লাখ টাকার মতো জোগাড় করছি। অনেক পরিবার স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে, একাধিক জায়গা ঘুরে শেষে ঢাকায় এসেছে। যাতায়াত, বাইরে থাকা, আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
যমজ কন্যা নিয়ে আতঙ্কে পরিবার
ঢাকার খিলগাঁও তালতলার নতুনবাগ এলাকার ছোট্ট একটি বাসা। আট মাস বয়সী যমজ দুই কন্যা সাবিহা-সামিহাকে ঘিরেই বোনা হচ্ছিল মা-বাবার স্বপ্ন। হঠাৎ দুজনেরই জ্বর, শরীরে র্যাশ আর খিঁচুনি। পরে জানা গেল হাম। এখন দুই শিশুকে নিয়ে রাজধানীর ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে মা-বাবার লড়াই। বাবা মোহাম্মদ শাহজাহান পোশাকের দোকানের বিক্রয়কর্মী। খিলগাঁও তালতলার একটি দোকানে কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই কোনোমতে চলে সংসার। তবে দুই মেয়ের আকস্মিক অসুস্থতায় সংসারের হিসাব-নিকাশ আর মেলাতে পারছেন না।
শাহজাহান জানান, প্রথমে বড় মেয়ে সাবিহার জ্বর আসে। পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। শুরুতে বিষয়টি স্পষ্ট না হলেও কয়েক দিনের মধ্যেই দুই শিশুর অবস্থার অবনতি হতে থাকে। প্রথমে বড় মেয়ে সাবিহাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানকার চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের কমিউনিটি হাসপাতালে পাঠান। গত শুক্রবার সাবিহাকে এখানে ভর্তি করানোর পর একই দিনে সামিহাকেও ভর্তি করতে হয়।
অসহায় বাবার আর্তি শাহজাহানের কণ্ঠে। বললেন, দুজনের একই অবস্থা। যেহেতু যমজ, তাই বাসায় রেখে চিকিৎসা করানোর সাহস পাইনি। এখন দুজনেরই হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে। এরই মধ্যে চিকিৎসায় ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে, যা আমার জন্য অনেক বড় চাপ।
দিন-রাত এখন হাসপাতালেই কাটছে শাহজাহানের। মাঝেমধ্যে দোকানে গিয়ে কাজের খোঁজখবর নিয়ে আবারও ছুটে আসেন দুই সন্তানের কাছে। দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ আর গণমাধ্যমে শিশুমৃত্যুর খবরে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, খবরে যখন শুনি হাম হয়ে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে, তখন নিজের বাচ্চাদের কথা ভেবে মন ঠিক থাকে না। এখন শুধু দোয়া করি, ওরা যেন সুস্থ হয়ে যায়।
ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালের ১২ তলায় হাম রোগীর জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট আছে। সেখানে একসঙ্গে থাকা যায় ছয়জন রোগী। বর্তমানে ছয় থেকে আড়াই বছর বয়সী শিশুরাই মূলত সেই কেবিনে ভর্তি। গতকাল এক শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও বাকিরা ক্যানুলা হাতে হামের সঙ্গে লড়ছে।
তবে আশার কথা হলো, হামের প্রাদুর্ভাব বাড়লেও কমিউনিটি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মশিউর রহমান চয়ন জানান, এখানে ন্যূনতম বেড ভাড়া ১০০ টাকা। দ্রুত চিকিৎসার সুবিধা থাকায় স্বজনরা রোগী নিয়ে এখানে ছুটে আসেন।
এদিকে, দেশজুড়ে হামের প্রকোপের খবরে সাধারণ জ্বর-সর্দিতেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অনেক অভিভাবক। গতকাল ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা বেশ কয়েকজন শিশুর অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে এমন ভীতির তথ্যই সামনে এসেছে। মূলত সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে হামের খবর দেখেই তারা বেশি চিন্তায় পড়েছেন।
হাসপাতালের বহির্বিভাগে চার বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে আসা ফাতেমা আক্তার বলেন, তিন দিন ধরে ছেলের হালকা জ্বর আর সর্দি। এমনিতে হয়তো বাসাতেই নাপা খাওয়াতাম, কিন্তু টিভিতে হামের যে অবস্থা দেখছি, ভয়ে আর বাসায় বসে থাকতে পারলাম না। ডাক্তার দেখিয়ে নিশ্চিত হতে চাচ্ছি যে, এটা সাধারণ জ্বর।
রিকশাচালক আবদুল মজিদ তাঁর দেড় বছরের মেয়েকে নিয়ে এসেছেন হাসপাতালে। তিনি বলেন, ‘আশপাশের মাইনষের মুখে শুনতেছি হামে নাকি বাচ্চা মারা যাইতেছে। মাইয়ার গা গরম দেইখা রাইতে আর ঘুমাইতে পারি নাই। সকালে উঠাই হাসপাতাল নিয়া আসছি। ডাক্তার বলছে, ভয়ের কিছু নাই, এই সময়ের জ্বর এডা। তার পরও মন তো মানে না, তাই ওষুধ নিয়া শান্তিতে বাড়ি যাইতেছি।’
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, এই দুর্মূল্যের বাজারে হামের চিকিৎসায় এক থেকে দেড় লাখ টাকা খরচ করা খুব কঠিন।
যেসব পরিবার আক্রান্ত হচ্ছে, তাদের বড় অংশই দরিদ্র। জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হাতে যদি একটি তহবিল থাকত, তাহলে ডিসপেনসারিতে ওষুধ না থাকলেও দ্রুত বাজার থেকে কিনে রোগীকে দেওয়া যেত।
আরও ৬ শিশুর মৃত্যু
হাম ও হামের উপসর্গে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এক শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর পাঁচ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ ছিল। একই সময়ে সারাদেশে আরও এক হাজার ২৭৪ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। হাম শনাক্ত হয়েছে ২৪৩ শিশুর। সব মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৫১৭ শিশু। হাম শনাক্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বরিশালে। আর হামের উপসর্গে ঢাকায় তিন, সিলেট ও ময়মনসিংহে একজন করে শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গে ৩৮৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৭৫ শিশু। সব মিলিয়ে দেশে হাম ও হামের উপসর্গে ৪৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে ৫৭ হাজার ৮৪৬ শিশুর শরীরে। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৪২ হাজার ৯২ শিশু। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৭ হাজার ৭৪৪ জন। আর ১৫ মার্চ থেকে দেশে সাত হাজার ৭৬৭ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া ও অপুষ্টিতে বাড়ছে ঝুঁকি
হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ ও জনসচেতনতার ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
গতকাল রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) আয়োজিত ‘হাম ও ডেঙ্গু রোগ নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা ও প্রতিরোধই সর্বোত্তম পন্থা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এই মন্তব্য করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অপুষ্টি, মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। আগে ধারণা ছিল, ৬ থেকে ৯ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর শরীরে মায়ের দুধের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে। কিন্তু এখন সেই বয়সী শিশুরাও হাম আক্রান্ত হচ্ছে।
তিনি জানান, হাম-পরবর্তী জটিলতায় অধিকাংশ শিশু নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হাম ভালো হওয়ার পরও সেকেন্ডারি ইনফেকশন ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালের পর দেশে নিয়মিত হামের টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। এক পর্যায়ে দেশে হামের টিকাও ছিল না। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে জরুরি ভিত্তিতে টিকা সংগ্রহ করা হয়। গত ৪ এপ্রিল আক্রান্ত ৩০ উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। পরে চার সিটি করপোরেশনসহ সারাদেশে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে।