কক্সবাজারের উখিয়ায় ফেসবুকে ‘হা হা’ রিয়্যাক্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলায় ছৈয়দা বেগম নামের এক নারী নিহত হয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, নিজের শরীর দিয়ে ছেলেকে আড়ালের চেষ্টা করেন মা, তখন হামলাকারীরা তার ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শনিবার (১৬ মে) রাত ৮টার দিকে উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের টাইপালং এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
নিহত ছৈয়দা বেগম স্থানীয় সাব্বির আহমদের স্ত্রী।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েক দিন আগে স্থানীয় টাইপালং মাদ্রাসার দেয়ালে ‘জয় বাংলা, জয়তু শেখ হাসিনা’ লেখা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেন। শনিবার সন্ধ্যায় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রদলের কর্মী মো. জিসান দেয়াল লিখনটি নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী মো. ইউনুস।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেসবুকের ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাতে বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী ইউনুসকে আটক করে মারধর শুরু করেন। এ সময় তাকে ছাড়াতে যান তার বন্ধু ও স্থানীয় এনজিওকর্মী এসএম ইমরান। তখন ইমরানকেও মারধর করা হয়। ইমরানকে মারধরের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান তার মা ছৈয়দা বেগম। ছেলেকে রক্ষা করতে গেলে তার ওপরও হামলা চালানো হয়। এ সময় ঘটনাস্থলে অজ্ঞান হন তিনি। তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, তিনি নিজের শরীর দিয়ে ছেলেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু হামলাকারীরা তখন মায়ের ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিল-ঘুসি ও মারধরের একপর্যায়ে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ছৈয়দা বেগম। এছাড়া মারধরের শিকার ছাত্রলীগ নেতা ইউনুসকে আহত অবস্থায় পুলিশের হাতে তুলে দেয় হামলাকর্মীরা।
অভিযুক্তরা হলেন, চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাসেম সিকদার জিসান, উপজেলা বিএনপির সদস্য মিজান সিকদার, দক্ষিণ রাজাপালং শ্রমিক দলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সিকদার, ছাত্রদল নেতা জুলফিকার রহমান আকাশ, বিএনপি নেতা শামসুল আলম (অ্যাম্বুলেন্স শামসু), আবদুল করিম, ছৈয়দ বাবুল, মাহবুবুর রহমান ও ছালাম সিকদারসহ আরও কয়েকজন।
এদিকে অভিযুক্তরা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বিএনপি নেতা মিজান রহমান সিকদার দাবি করেন, নিহত নারীর গায়ে কেউ হাত তোলেনি, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। প্রতিদিন এভাবে হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু হচ্ছে, আপনারা কয়জনের মৃত্যুর জন্য মামলা করতে পারবেন?
ঘটনার পর এলাকায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বিএনপি ও ছাত্রদলের একাধিক গ্রুপ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও মব চালিয়ে আসছিল। ছৈয়দা বেগম সেই দাপটেরই নির্মম শিকার হয়েছেন বলে দাবি করছেন তারা।
এ ঘটনায় উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক তারেক মাহমুদ রাজিব চৌধুরীর আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আজই ঢাকা থেকে উখিয়ায় এসেছি। এ সময় তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করার জন্য অনুরোধ জানান।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি সরওয়ার জাহান চৌধুরী বলেন, দুইপক্ষ দুই ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে। একপক্ষের দাবি, নিহত নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অন্যপক্ষের দাবি, তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। এ কারণে আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই। হত্যাকাণ্ডে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এ বিষয়ে প্রশাসনকে আমরা সহযোগিতা করব।
উখিয়া থানার ওসি মুজিবুর রহমান বলেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। তদন্ত শেষে রোববার সকালে লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হয়।
তিনি বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দেয়াল লিখন নিয়ে স্থানীয় এক বিএনপি সমর্থক ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টে স্থানীয় এক যুবক ‘হা হা’ রিঅ্যাক্ট দেন। আকাশ ওই যুবকের কাছ থেকে এ ধরনের রিঅ্যাক্টের কারণ জানতে চান। জবাবে তিনি জানান, তার স্ত্রী ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি ব্যবহার করেন।
এসপি আরও বলেন, এ ঘটনার জেরে দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতির সময় সৈয়দা খাতুন আহত হন। হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় একজনকে হেফাজতে নিয়েছে। বর্তমানে এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।