Image description
বিএনপি সরকারের ৯০ দিন প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণ

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখতে দেখতে তিন মাস তথা নব্বই দিন অতিবাহিত করল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। দেশে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের যাত্রা শুরু হয়। মূলত সরকার গঠনের পর থেকেই এক বিধ্বস্ত অর্থনীতি, ভঙ্গুর প্রশাসনিক কাঠামো এবং আইনশৃঙ্খলাসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে বিএনপি সরকার। প্রথম দুই মাসেই অনেক বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকাণ্ড দৃশ্যমানও হয়েছে। অতিসম্প্রতি পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন এবং ত্রয়োদশ সংসদের ২৫ কার্যদিবসে ৯৪টি বিল পাস উল্লেখযোগ্য অর্জন বলে দায়িত্বশীল মন্ত্রী-এমপিরা মনে করছেন। সব মিলিয়ে গত ৯০ দিনে বিএনপি সরকার বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিএনপি সরকারের প্রথম নব্বই দিনকে সার্বিকভাবে ইতিবাচক অভিযাত্রা হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন—প্রত্যেক জিনিসেরই কম-বেশি, সরকারের ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক থাকে। এক্ষেত্রে বিএনপি সরকারের অবস্থাও তেমন। তবে এখন পর্যন্ত সরকরের সাফল্যই বেশি। কেননা, এক কঠিন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে সরকার। স্বল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক জনমুখী প্রকল্প গ্রহণ, অর্থনীতিতে গতি আনাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চালুর মাধ্যমে সরকার নিজের সক্ষমতা অব্যাহতভাবে জানান দিচ্ছে। তবে জ্বালানি-বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

উল্লেখ্য যে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দক্ষ নেতৃত্বে বিএনপি এককভাবে ২১৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—৬৮টি। বাকি আসনগুলোতে বিভিন্ন জোট, দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। প্রধানমন্ত্রীসহ ৫০ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভায় চমক হিসেবে রয়েছেন ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী। যারা একেবারেই নতুন। এ ছাড়া পূর্ণ মন্ত্রীর মধ্যে ১৬ জনই নতুন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। এরপর কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে আবারও নতুনভাবে দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়। আবারও মন্ত্রিসভার আকার বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং ও সংশ্লিষ্ট একাধিক মন্ত্রী জানান, বিএনপি সরকার গঠনের কিছুদিন পরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কিছুটা চাপ পড়ে। তবে পরিস্থিতি সামলাতে সরকার দ্রুত গতিতে পদক্ষেপ নেয়। বিশেষ করে সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়, কৃষির পুনরুজ্জীবনে খালখনন ও কৃষক কার্ড এবং নিম্নবিত্তের সামাজিক সুরক্ষায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণসহ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। যা সমৃদ্ধ ও আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মানের পথে শুভযাত্রা বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে—মাত্র তিন মাস সময়কাল একটি দেশের আমূল পরিবর্তনের জন্য পর্যাপ্ত নয়, তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সঠিক পথেই যাত্রা শুরু করেছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—আগামী দিনগুলোতে এই সংস্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং জনগণ সুফল ভোগ করবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপি সরকার গঠনের পরদিন সচিবালয়ে অফিস করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-উপদেষ্টারা। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বসে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে কাজ শুরু করে। সেসময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন যে, বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার বিবেচনায় প্রাথমিকভাবে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করা, সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখা, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি সেক্টরে যেন কোনো সমস্যা না হয় এগুলো তাদের অগ্রাধিকার। অর্থাৎ সরকার গঠনের পর প্রথম ও প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা।

বিএনপি সরকারের তিন মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন। বিশেষ করে ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীকে পুনর্গঠন করে থানাগুলোকে শতভাগ সচল করা হয়েছে। পেশাদারিত্ব ও জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে বড় ধরনের রদবদল ও সংস্কার কার্যক্রম চলমান। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং চিহ্নিত অপরাধীদের গ্রেপ্তারে দেশব্যাপী যৌথবাহিনীর অভিযান চলমান, যা সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে। সড়ক, মহাসড়ক এবং বাজারগুলোয় দীর্ঘদিনের কায়েমি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং মাদক ও চাঁদাবাজি প্রতিরোধ কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই বলে সমালোচনা রয়েছে।

এদিকে বর্তমান সরকারের আমলে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ক্রমান্বয়ে গতি পাচ্ছে। ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি এবং রিজার্ভ সংকটের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফেরাতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমাতে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বিশেষ করে—সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাল, ডাল, তেল ও পেঁয়াজের মতো জরুরি পণ্যের শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে। টিসিবির মাধ্যমে নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সুলভমূল্যে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছানো হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে এর আওতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেবে সরকার। অবৈধ মজুতদার ও কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতেও সুশাসন ফেরাতে এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ‘ব্যাংকিং কমিশন’ গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। ব্যাংক লুটপাট ও অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত চলছে। বিদেশে পাচার অর্থ ফেরাতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। প্রবাসীদের জন্য বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করায় এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করায় প্রবাসী আয়ের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে স্থিতিশীল করতে সাহায্য করছে। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে ডিজিটালাইজেশনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, বিএনপি সরকারের আমলে আর্থিক খাত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা হবে।

এ ছাড়া রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের স্বৈরাচারী ধারা দূর করে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরিতে সরকার দৃশ্যমান কিছু অগ্রগতি দেখিয়েছে। বিচার বিভাগের আধুনিকায়ন, উচ্চ আদালত ও নিম্ন আদালতের বিচারক নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে আইনগত ও প্রশাসনিক সংস্কার চলমান রয়েছে। বিগত সময়ের বড় বড় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলাগুলো ফের সচল করা হয়েছে। প্রশাসনে দীর্ঘদিনের দলীয়করণের অবসান ঘটিয়ে ‘মেধা, জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে’ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হচ্ছে।

এদিকে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’ এই নীতির ভিত্তিতে ভারসাম্য রক্ষা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সফল বৈঠকের মাধ্যমে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জনশক্তি রপ্তানি এবং নতুন শ্রমবাজার খোঁজার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে বিতর্কিত শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা করে দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কর্মমুখী শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার পরিবেশ ফেরানোর চেষ্টা চলছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং ওষুধ কালোবাজারি রোধে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিন মাসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের জঞ্জাল দূর করে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে আরও সময়ের প্রয়োজন। সামনে সরকারের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধান করা এবং একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে শতভাগ প্রস্তুত করা। তিন মাসের এ অগ্রগতি ধরে রেখে সরকার জনগণের আস্থা বজায় রাখতে পারবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

সরকারের দায়িত্বশীলরা যা বলছেন

সরকারের তিন মাস প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালবেলাকে বলেন, আমরা তো যাত্রা শুরু করেছি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা এ ৯০ দিনে শুধু সরকার পরিচালনা করিনি; বরং একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ শুরু করেছি। গত তিন মাসে আমাদের বেশকিছু অর্জন ও পদক্ষেপ রয়েছে। বিশেষ করে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন করা হচ্ছে। আমরা যখন দায়িত্ব নেই, দেশের অর্থনীতি ছিল লুটপাটের শিকার। আমরা শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ শুরু করেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব পুনরুদ্ধার হচ্ছে। আমরা প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করছি। পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত আমরা জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখেই নিচ্ছি। আমাদের স্পষ্ট বার্তা—বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

তিনি বলেন, আমি জানি, প্রত্যাশা অনেক বেশি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিগত স্বৈরাচারী সরকার রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে দুর্নীতি আর অনিয়ম ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। এ জঞ্জাল তিন মাসে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। একটি কুচক্রী মহল এখনো ষড়যন্ত্র করছে স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে। আমি সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানাব। ইনশাআল্লাহ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমরা একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে পারব।

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র সালেহ শিবলী গতকাল শনিবার কালবেলাকে বলেন, বিএনপির যে নির্বাচনি ইশতেহার ছিল সেটাই পূরণ করা হচ্ছে, যা আমরা অতীতে কখনো দেখিনি যে, একটা সরকার জনতার কাছে যেভাবে ইশতেহার প্রচার করে এবং ইশতেহারের ওপর ভিত্তি করে নির্বাচন হয়। এরপর একদম সময় ধরে ধরে এটা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এটা আমরা আসলে কখনো এভাবে দেখিনি। কিন্তু আমরা দেখছি যে, তারেক রহমান সরকার গঠনের পর এক সপ্তাহ পর থেকেই এগুলো বাস্তবায়ন শুরু করেছেন। এটা একটা বড় অর্জন। অর্থাৎ জনগণ এবং জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান জনগণের কাছে দেওয়া ওয়াদা পূরণ করছে বর্তমান সরকার। এটা আমরা আগে দেখিনি।

তিনি আরও বলেন, এই সরকার একটা ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা, অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও একটা দলীয় প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছিল। দায়িত্ব নিয়ে বসতে না বসতেই আবার যুদ্ধ পরিস্থিতি। তারপর যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা দেখেছি পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়। ডিজেলসহ কোনো কিছুর দাম বাড়েনি দেড় মাস। এক পর্যায়ে কিছুটা বেড়েছে, সেটাও কিন্তু জনগণ বলেছে যে, বাড়ানো দরকার। কারণ সে সময় কেউ কেউ একটু ঝামেলা করার চেষ্টা করছিল। সুতরাং আমরা মনে করছি যে, এই তিন মাসে আমাদের এটা ভালো অর্জন।

সালেহ শিবলী আরও বলেন, সরকারের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসছে। মানুষ মনে করছে যে, সরকার আমাদের জন্য কিছু করছে। অর্থাৎ সরকার জনগণের জন্য কাজ করতে পারে। জনগণ এই সরকারকে আস্থায় নিয়েছে।

বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য বদরুল আলম চৌধুরী শিপুল কালবেলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে এগোচ্ছে। তবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন, যা মাত্র সাড়ে তিন মাসে বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই।

বিশ্লেষক অভিমত

চলমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রভাবে দেশে তৈরি হওয়া সংকটগুলো মোকাবেলা করাটাই বর্তমান সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন কালবেলাকে বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বিশ্ববাজারে এখন জ্বালানিসহ সবকিছুর দামে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে আসন্ন বাজেটে যে ব্যয় বাড়বে, তার বিপরীতে যে আয়—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটা ভাবনার বিষয়। আবার ঋণনির্ভরশীলতা কমানোর কথা বলা হচ্ছে। সেটাও কীভাবে হবে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন খাতে যে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিগত সংস্কারগুলো দরকার, সেগুলো হতে হবে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জোর দিতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্যবসার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক সরকারের তিন মাসের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে কালবেলাকে বলেন, সরকারের প্রথম তিন মাসকে দেশের সব সেক্টরে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের সময় হিসেবে ধরা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকার অনেকাংশে সফল হয়েছে বলে আমি মনে করি। তবে সার্বিক মূল্যায়ন অর্থনৈতিক উন্নতি, সুশাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের বাস্তব অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে। সে ক্ষেত্রে আরও কিছুটা সময় লাগবে মূল্যায়ন করতে। তিনি বলেন, লক্ষণীয় বিষয় হলো- এই তিন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাস্তববাদী নেতৃত্বের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণে তিনি আন্তরিকভাবে কাজ করছেন এবং তার সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাজ করার প্রয়োজনীয় বার্তা তিনি দিতে সক্ষম হয়েছেন। দেশের মানুষের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের জন্য তার নেতৃত্বের ওপর দেশের অধিকাংশ মানুষ আস্থাশীল হতে পেরেছেন বলে মনে করি।