ছোট্ট এক শান্ত শহরে সকালবেলা একসঙ্গে খুন হয়ে গেল দুইজন। তাদের মধ্যে কোনো সংযোগ নেই, কে কেন তাদের খুন করল সেটা সম্পর্কেও কারও কোনো ধারণা নেই। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া হত্যাকারীর ব্যবহৃত ক্যাপ থেকে তার ডিএনএ নমুনা পাওয়া গেলেও ১৬ বছরে হত্যাকারী সম্পর্কে ন্যূনতম কোনো ধারণাও করতে পারেনি পুলিশ। এরপর একদিন ওই ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণ করে হত্যাকারীর প্রায় ২০০ বছরের পুরনো পূর্বপুরুষের সন্ধান পাওয়া গেল। সেটা থেকে তৈরি হয় বংশগতির তালিকা বা ফ্যামিলি ট্রি। শুধুমাত্র ডিএনএ নমুনার ওপর ভর করে এভাবে ২০০ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে ওই বংশের বর্তমান প্রজন্মের খোঁজ পায় পুলিশ, সেই সঙ্গে খোঁজ পাওয়া যায় হত্যাকারীর, অবশেষে ভাঙে ১৬ বছরের রহস্য।
ডিএনএ টেস্টের এই কারিশমা কোনো কাল্পনিক ঘটনা নয়। সুইডেনের লিংশোপিং নামের এক শহরে ২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া ঘটনা এটি। ২০০৪ সালের এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট কাটে ২০২০ সালে এসে। সত্য উদঘাটনে আসলে নীরব শক্তি এই ফরেনসিক বিজ্ঞান ও ডিএনএ পরীক্ষা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে দুটি ধর্ষণের ঘটনায়ও আলোচনায় আসে এই পরীক্ষার গুরুত্ব। এর একটিতে দেখা যায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যাকে ধর্ষণে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, তিনি নন বরং ধর্ষণের শিকার মেয়েটির আপন বড় ভাই তাকে ধর্ষণ করেছিল। দ্বিতীয়টি সম্প্রতি নেত্রকোণায় ১২ বছরের এক ছাত্রী ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাটি নিয়ে। ঘটনাটিতে কোনো ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন না হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফলাফল নিয়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দাবি করা হয়, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি নন, বরং শিশুটির নানা ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত। তবে আসামি গ্রেপ্তারের পর পুলিশ এসব দাবিকে সম্পূর্ণ গুজব বলে নিশ্চিত করে।
বাস্তবতায় ফরেনসিক বিজ্ঞান, বিশেষ করে ডিএনএ পরীক্ষা, অপরাধ তদন্তে অত্যন্ত জটিল ও কাঠামোবদ্ধ একটি প্রক্রিয়া। চোখে দেখা আলামত অনেক সময় বিভ্রান্ত করলেও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ সত্য উন্মোচন করে। অপরাধ তদন্তে এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশ, চিকিৎসক, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং পরীক্ষাগার বিশেষজ্ঞ—বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকেন। এই জটিল প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়; যার থেকে জন্ম নেয় গুজব।
ফরেনসিক মেডিসিন চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা, যেখানে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার করে আইন ও অপরাধ তদন্তে সহায়তা করা হয়। একজন ফরেনসিক চিকিৎসক মৃত্যুর কারণ, সময়, আঘাতের ধরন, বিষক্রিয়া, যৌন নির্যাতন বা হত্যার প্রমাণ বিশ্লেষণ করেন। অনেক সময় একটি পোস্টমর্টেম রিপোর্টই পুরো মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। আদালতেও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মতামত গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে কথা হয় সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক ডা. ফাতেমা বাঁধনের সঙ্গে। তার ব্যাখ্যায় উঠে আসে, সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রথম ধাপটি শুরু হয় পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদন দিয়ে— যেখানে ঘটনাটিকে আইনগতভাবে ‘ফরেনসিক পর্যবেক্ষণের উপযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরপরই মরদেহ মর্গে আসে। ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে মরদেহ গ্রহণের পর কেস হিস্ট্রি, সুরতহাল রিপোর্ট এবং আলামত যাচাই করা হয়। তারপর পোস্টমর্টেম করা হয়।
ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও মরদেহের অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। ডা. ফাতেমা বলেন, সাধারণত রক্ত, হাড়, দাঁত, চুলের গোড়া, নখ বা টিস্যু থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। তাজা মরদেহে রক্ত ও টিস্যু সবচেয়ে কার্যকর হলেও পচে যাওয়া বা পুরোনো মরদেহে দাঁত ও হাড় থেকে ভালো ডিএনএ পাওয়া যায়, কারণ এগুলো দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে। নমুনা সংগ্রহের সময় দূষণ এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে কথা হয় সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির সহকারী অ্যানালিস্ট মো. আশরাফুল আলমের সঙ্গেও। তিনি বলেন, সিনেমা বা সিরিজে ডিএনএ পরীক্ষাকে যেভাবে তাৎক্ষণিক ফলাফল হিসেবে দেখানো হয়, বাস্তবে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বাস্তব তদন্তে আইন, প্রক্রিয়া ও প্রমাণ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ধাপ অনুসরণ করতে হয়।
তিনি বলেন, ১৯৫৩ সালে ডিএনএ ডাবল হেলিক্স আবিষ্কারের পর জীববিজ্ঞান ও ফরেনসিক বিজ্ঞানে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটে। ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) মূলত শরীরের কোষ থেকে সংগৃহীত জৈব নমুনা বিশ্লেষণ করে ব্যক্তিগত পরিচয়, বংশগত সম্পর্ক বা অপরাধ সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণে ব্যবহৃত হয়। লালা, রক্ত, চুল বা ত্বকের কোষ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পিসিআর প্রযুক্তির মাধ্যমে ল্যাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
মো. আশরাফুল আলম বলেন, প্রতিটি মানুষের ডিএনএ গঠন অনন্য। অর্থাৎ এক ব্যক্তির ডিএনএ-এর সঙ্গে অন্য ব্যক্তির ডিএনএ-এর মিল থাকে না। এই বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়েই আশির দশকের শেষ দিকে ব্রিটেনে অপরাধ শনাক্ত ও অপরাধী চিহ্নিতকরণে ডিএনএ প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। বাংলাদেশে ফরেনসিক ডিএনএ-এর ব্যবহার শুরু হয় ২০০৫ সালের দিকে। পরবর্তীতে চিকিৎসা ও অপরাধ তদন্ত—উভয় ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।
ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার কেন্দ্রগুলো কোথায় এবং কীভাবে কাজ করে
ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার ক্ষেত্রে সাধারণত তখনই এই প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেওয়া হয়, যখন কোনো আইনি ঘটনায় ব্যক্তি শনাক্ত করা জরুরি হয়ে পড়ে এবং অন্য কোনো উপায়ে নিশ্চিত পরিচয় নির্ধারণ সম্ভব হয় না। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের অংশ হিসেবে বা আদালতের নির্দেশনায় এই পরীক্ষা করাতে পারেন বলে জানান মো. আশরাফুল আলম।
বর্তমানে দেশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ন্যাশনাল ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরি এবং পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) ল্যাবরেটরিতে এই পরীক্ষা করা হয়। আইনি প্রয়োজনে বা তদন্ত সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অনেক সময় আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে এই পরীক্ষা করা হয়।
এছাড়া ঢাকার শ্যামলীতে ডিএনএ সলিউশন লিমিটেড নামক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরীক্ষা করা হয়। তবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, শুধুমাত্র রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্ট করে থাকেন তারা। অপরাধ তদন্তের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে পিতৃত্ব নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা এখনো সীমিতভাবে সহজলভ্য। কেউ চাইলে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে এই ধরনের পরিস্থিতিতে পরামর্শ নিতে পারেন এবং সেখানে অভিযোগ গ্রহণ সাপেক্ষে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষা হতে পারে।
গুরুতর অপরাধ তদন্ত হোক কিংবা ধর্ষণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুর পিতৃত্ব নির্ধারণ প্রয়োজনই হোক ডিএনএ পরীক্ষায় কতটা সময় প্রয়োজন হবে সেটা নির্ধারিত হয় অপরাধ অথবা বিরোধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট এভিডেন্সের পরিমাণ ও প্রকৃতির ওপর। এই সময় এক মাস থেকে কয়েক মাসও হতে পারে।
বাংলাদেশে ডিএনএ পরীক্ষার অবকাঠামো ও সীমাবদ্ধতা
ডা. ফাতেমা বলেন, হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, অগ্নিদগ্ধ মৃত্যু, বিষক্রিয়া, সড়ক দুর্ঘটনা ও অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তকরণে ফরেনসিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। তবে উন্নত দেশগুলোর তুলনায় আমাদের এখনো জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও দ্রুত রিপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জেলা পর্যায়ে ল্যাব ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়ার তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সিআইডির ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরির বিশেষ পুলিশ সুপার আতিকুর রহমান জানান, প্রতি মাসে গড়ে ১৫০০ থেকে ১৮০০ নমুনা পরীক্ষার জন্য আসে। বাড়তি চাপ সামাল দিতে লোকবল বৃদ্ধির কাজ চলমান রয়েছে।
ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ
অপরাধ তদন্তে ফরেনসিক ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ গুরুত্বপূর্ণ। আলামত সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ল্যাবে পাঠানো, পরীক্ষা এবং আদালতে রিপোর্ট জমা দেওয়া—সবকিছুই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। আলামত এক পক্ষ থেকে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তরের সময় তার প্রকৃতি, অবস্থা ও পরিমাণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে পুরো চেইন অব কাস্টোডি অক্ষুণ্ণ থাকে। এতে আলামতের নিরপেক্ষতা বজায় থাকে এবং তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ কমে।
এর একটি বাস্তব উদাহরণ ২০১৫ সালে নিখোঁজ হওয়া এআইইউবি শিক্ষার্থী আসিফ ইমরানের ঘটনা। ৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সে সময় তার বাবা লুৎফর রহমান—আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টের সাবেক ম্যানেজার ছিলেন। তিনি ও তার স্ত্রী হজ পালনের জন্য সৌদি আরবে ছিলেন। দেশে ফিরে তারা ছেলের অপহরণ মামলা করেন।
কিন্তু তদন্ত চলমান থাকাকালীন এই পরিবারকে নতুন সংকটের মুখে পড়তে হয়। অপহরণ মামলার পর আসিফের বাবার বিরুদ্ধে বিবাদী পক্ষ অর্থ আত্মসাতের পাল্টা মামলা করে এবং এ মামলায় তিনি কিছু সময় কারাগারেও ছিলেন। এদিকে আসিফ নিখোঁজ হওয়ার কিছুদিন পর নারায়ণগঞ্জে অজ্ঞাত পরিচয়ে কয়েকটি মরদেহ উদ্ধার হয়। পরিচয় নিশ্চিত করা না যাওয়ায় সেগুলো অজ্ঞাত পরিচয়ে দাফন করা হয়। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তার সন্দেহ হয়, ওই মরদেহগুলোর একটির সঙ্গে আসিফ ইমরানের সম্পর্ক থাকতে পারে।
ঘটনার প্রায় ১৬ মাস পর তদন্তকারীরা উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের নমুনার সঙ্গে আসিফের বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে পরীক্ষা করেন। তাতেই নিশ্চিত হওয়া যায়, দাফন করা মরদেহগুলোর একটি আসিফ ইমরানের। পরে কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলন করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তৎকালীন সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা গাজী আতাউর রহমান বলেন, অপহরণ মামলাটি একপর্যায়ে হত্যা মামলার দিকে মোড় নেয়। চারটি মরদেহের মধ্যে একটি আসিফের হতে পারে—এমন ধারণা থেকেই ডিএনএ পরীক্ষা করা হয় এবং পরে নমুনা ক্রস-ম্যাচে নিশ্চিত মিল পাওয়া যায়।
এই ঘটনাটি নিখোঁজ ব্যক্তি ও অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। যখন প্রচলিত তদন্ত পদ্ধতিতে পরিচয় নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন বৈজ্ঞানিক ডিএনএ বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত সত্য উদঘাটনের পথ তৈরি করে।
ডিএনএ ম্যাচ পাওয়া মানেই কি পুরো ঘটনা প্রমাণ হয়ে যাওয়া?
ডিএনএ ম্যাচ পাওয়া মানেই পুরো ঘটনা প্রমাণ হয়ে যাওয়া নয়। ডিএনএ সবচেয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণগুলোর একটি হলেও এটি একা সবসময় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। অনেক সময় এটি তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, কিন্তু সেই মোড় ভুক্তভোগী বা সন্দেহভাজন—দুই পক্ষের যেকোনো দিকেই যেতে পারে।
এ কারণেই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ডিএনএকে ‘ডাবল-এজড সোর্ড’ বলেও উল্লেখ করেন। এটি যেমন প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করতে পারে, তেমনি নির্দোষ কাউকে মুক্ত করতেও সহায়তা করে।
যৌন সহিংসতার মামলায় ডিএনএ প্রমাণের ভূমিকা ও গুরুত্ব
যৌন সহিংসতার মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ডিএনএ অ্যানালিস্ট মো. আশরাফুল আলম বলেন, কোনো ধর্ষণের ঘটনায় গর্ভধারণ ঘটলে সাধারণত সন্তানের জন্মের পর মা, শিশু এবং সন্দিগ্ধ ব্যক্তির ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। এই তিনটির জেনেটিক প্রোফাইল মিলিয়ে পিতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, যা আদালতে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে সব ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি একই রকম থাকে না। গর্ভপাত বা মৃত সন্তান প্রসব হলে পুলিশ ভ্রূণ বা মৃত সন্তানের দেহাবশেষ সংগ্রহ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে পাঠাতে হয়। সেখানে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সন্দিগ্ধ ব্যক্তির ডিএনএ নমুনাও নেওয়া হয়। এভাবে ডিএনএ প্রোফাইল সংরক্ষণ করা হলে, সন্দিগ্ধ ব্যক্তি পলাতক থাকলেও ভবিষ্যতে তার নমুনা পাওয়া গেলে পিতৃত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
কীভাবে ফরেনসিক বা ডিএনএ রিপোর্ট তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?
ডা. ফাতেমা বাঁধন বলেন, অনেক মামলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রাথমিকভাবে যাকে সন্দেহ করা হয়েছিল পরে ডিএনএ পরীক্ষায় সে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছে। আবার কোনো অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। যৌন নির্যাতনের মামলাতেও ডিএনএ প্রমাণ প্রায়ই সবচেয়ে শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক সাক্ষ্য হিসেবে কাজ করে এবং প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করতে সাহায্য করে। সম্প্রতি ফেনীর ধর্ষণ মামলায় এমন একটি উদাহরণ চোখে পড়ে।
ফেনীর পরশুরামের বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের উত্তর টেটেশ্বর গ্রামে ১৪ বছর এক বয়সী কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে সন্তান প্রসব করে। কিশোরীর পরিবার ওই সন্তানের বাবা হিসেবে মক্তব শিক্ষক ও স্থানীয় জামে মসজিদের ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনে এবং ২০২৪ সালের নভেম্বরে মামলা করেন। মামলার পর ওই ইমামকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তিনি জেলও খাটেন। তবে তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ নবজাতকের ডিএনএ পরীক্ষা করে। এই পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় যে, নবজাতকের বাবা ইমাম নন, বরং শিশুটি ওই কিশোরীর আপন বড় ভাই মোরশেদের।
ক্রাইম সিনে আলামত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি
ডা. ফাতেমা বাঁধনের মতে, অপরাধস্থলে সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো আলামত দূষিত হয়ে যাওয়া। গ্লাভস ছাড়া আলামত স্পর্শ করা, অতিরিক্ত মানুষের যাতায়াত, রক্ত বা নমুনা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা, লেবেলিংয়ে ভুল করা, দ্রুত ঘটনাস্থল সিল না করা—এসব কারণে গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ক্রাইমসিন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, কোনো অপরাধ অথবা অস্বাভাবিক অবস্থা দৃশ্যমান হলে দ্রুততম সময়ে পুলিশকে জানানো এবং পুলিশ না আসা পর্যন্ত অপরাধস্থলে কাউকে প্রবশ করতে না দেওয়া ।
ফরেনসিক বিজ্ঞান ও ডিএনএ নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা কী?
ডা. ফাতেমা বাঁধনের মতে, অনেকেই মনে করেন ফরেনসিক মানেই কয়েক মিনিটে শতভাগ নিশ্চিত ফল পাওয়া যায়। যেমনটা সিনেমা বা টিভি সিরিজে দেখানো হয়। বাস্তবে ফরেনসিক বিশ্লেষণ সময়সাপেক্ষ এবং অনেক ক্ষেত্রে আলামত অসম্পূর্ণ থাকে। শুধু ডিএনএ পেলেই সব রহস্য সমাধান হয়ে যায়- এ ধারণাটাও পুরোপুরি সঠিক নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিভাগীয় ও জেলা শহরে ডিএনএ পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হয়। হাসপাতালগুলোতে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) থাকলেও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পাঠানোর ক্ষেত্রে এখনো নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এছাড়া কিছু উন্নয়ন সংস্থাও (এনজিও) ভিকটিমদের এ বিষয়ে সহায়তা দিয়ে থাকে।
তিনি আরও জানান, ভিকটিমের অভিযোগ বা মামলার ভিত্তিতে গভীরতর তদন্তের স্বার্থে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে ভিকটিমের কাছ থেকে ঘটনার সময়ের আলামত হিসেবে তার পরিধেয় কাপড়সহ প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়।
ধর্ষণের ডিএনএ পরীক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলো ভুক্তভোগী এবং অভিযুক্তের বীর্য। এগুলো সংগ্রহের পর ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়। এই কর্মকর্তা এমন বেশ কয়েকটি মামলার তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে জানান, ঘটনার পর ভিকটিম দ্রুত আইনের আশ্রয় নিলে এবং আলামত নষ্ট না হলে ডিএনএ পরীক্ষায় সবচেয়ে নির্ভুল ফল পাওয়া যায়। কারণ দেরি হলে আলামত নষ্ট হয়ে তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ফরেনসিক বিজ্ঞান ও ডিএনএ পরীক্ষা এখন শুধু ল্যাবভিত্তিক কোনো প্রযুক্তি নয়; বরং আধুনিক অপরাধ তদন্ত ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিকভাবে আলামত সংরক্ষণ করা গেলে একটি ক্ষুদ্র নমুনাও চোখে দেখা দৃশ্য, জনমত কিংবা প্রাথমিক সন্দেহকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে পুরো তদন্তের মোড় বদলে দিতে পারে।