মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় কারাভোগের পর ডিএনএ টেস্টে নির্দোষ প্রমাণিত হওয়া ফেনীর সেই আলোচিত ইমাম মাওলানা মুজাফফর আহমদ জুবায়েরের জীবনের গল্প এখন এক চরম ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। মুক্তি পেলেও সামাজিক লাঞ্ছনা আর আইনি লড়াইয়ের ক্ষত সইতে না পেরে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বর্তমানে তিনি রাজধানীর আদাবরের একটি মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মামলায় কারাবন্দি থাকা অবস্থায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়েছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও তার মানসিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজার ছোট ভাই ইমনের বাসায় অবস্থানকালে তিনি হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। তিনি এ সময় আকস্মিকভাবে বাসার আসবাবপত্র ভাঙচুর শুরু করেন এবং উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর চড়াও হন।
একপর্যায়ে তিনি পাশের ফ্ল্যাটের মালিককেও আঘাত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে পুলিশের সহায়তা নেওয়া হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়।
হাসপাতালে চিকিৎসকরা তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইনজেকশন দেওয়ার পর তিনি বর্তমানে স্থিতিশীল রয়েছেন। তবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা এবং আইনি অভিভাবকের অনুপস্থিতিতে তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে ভর্তি করা সম্ভব হয়নি।
শুক্রবার (১৫ মে) সকালে পরিবারকে খবর দিলে তারা ঢাকায় পৌঁছে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আদাবরের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার এই সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইদুল আশরাফ কুশল। তিনি মাওলানা জুবায়েরকে আজীবন বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও সম্প্রীতি সেলের সমন্বয়ক তারেক রেজা বলেন, ‘একজন নির্দোষ ইমামকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তিল তিল করে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
মূলত এসব মানসিক চিন্তায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তার মা-বাবা এসেছেন। আমরা তাকে আদাবরের এনলিগটেনেড সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে ভর্তি করেছি, সেখানে তার চিকিৎসা চলমান রয়েছে।’
উল্লেখ্য যে, ২০১৯ সালে ফেনীর পরশুরামে একটি মক্তব পড়ুয়া কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে স্থানীয় রাজনৈতিক রোষানল ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে জুবায়েরের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। ৩২ দিন কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও সমাজ তাকে গ্রহণ করেনি। পরবর্তীতে চাঞ্চল্যকর মোড় নেয় মামলাটি।
ডিএনএ টেস্টে দেখা যায়, ওই কিশোরীর সন্তানের জৈবিক পিতা মূলত তার নিজের ভাই। ২০২৫ সালের ১৯ মে অভিযুক্ত ভাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। কিন্তু তত দিনে জুবায়েরের সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেছে।
অসুস্থ হওয়ার মাত্র কয়েকদিন আগে শনিবার (৯ মে) ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমাম। তিনি অভিযোগ করেন, কোনো নোটিশ ছাড়াই তাকে মসজিদের ইমামতি ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলার খরচ মেটাতে পৈতৃক জমি বিক্রি করতে হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের একজন সম্মুখযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তাকে চরম সামাজিক হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি ৩টি প্রধান দাবি জানান, চাকরিতে পুনর্বহাল ও বকেয়া বেতন প্রদান, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ষড়যন্ত্রকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, মানসিক ও আর্থিক ক্ষতির বিপরীতে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান করা। পরে এ দাবির বিষয়ে সংহতি প্রকাশ করেন এনসিপি নেতারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির ফেনী জেলা আহ্বায়ক জাহিদুল ইসলাম সৈকত বলেন, ‘আমি তার অসুস্থতার খবরে ঢাকায় ছুটে এসেছি। আমি বর্তমানে সেই হাসপাতালে অবস্থান করছি। মোজাফফরের চিকিৎসা চলছে।