রাজধানীর ১৭টি এলাকার পয়ঃবর্জ্য শোধনে গুরুত্বপূর্ণ একটি দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার। প্রকল্পটিতে খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৩৭০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা চায়না এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ। আগামী বছর থেকে শুরু হবে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়। চীন থেকে নেওয়া এই ঋণ পরিশোধের দুশ্চিন্তা জেঁকে বসেছে ঢাকা ওয়াসার মাথায়। তারা ভাবছে, এই টাকা পাওয়া যাবে কোথায়?
চীনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণের সুদের হার দুই শতাংশ, কমিটমেন্ট ফি শূন্য দশমিক দুই এবং রক্ষণাবেক্ষণ ফি শূন্য দশমিক দুই শতাংশসহ পরিশোধ করতে হবে ২ হাজার ৭৬০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
ঢাকা ওয়াসার এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, যে লক্ষ্য নিয়ে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারটি চালু হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ও আধুনিক এই ট্রিটমেন্ট প্লান্টটিতে শুরু থেকেই সংযোগ লাইন নেই। ফলে এর আওতাভুক্ত এলাকার মাত্র এক-চতুর্থাংশ বর্জ্য শোধন করা হচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রার ৭৫ শতাংশ এলাকা এখনো এর আওতার বাইরে রয়ে গেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত আয় আসছে না। পাশাপাশি এটির পরিচালন ব্যয় অনেক বেশি, যা নিজস্ব আয় দিয়ে করা কষ্টকর। সেখানে ঋণ পরিশোধের বিষয়টি কঠিন হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ-ইআরডির চায়না ডেস্কের এক কর্মকর্তা গতকাল বুধবার আগামীর সময়কে বলেছেন, চীন থেকে ঋণ নিলে বছরে দুবার কিস্তি দেওয়ার কথা। তারা যদি কিস্তি দিতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হতে হবে। এর আগেও ওয়াসার বেশ কিছু ঋণের কিস্তি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পরিশোধ করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার এ প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত সাবেক কর্মকর্তা মমতাজুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, চীনের কাছ থেকে এই ঋণটি নেওয়া হয়েছে অনেক কম সুদে। অন্যান্য ঋণ যেখানে প্রায় পাঁচ শতাংশ সুদ থাকে, সেখানে আমরা দুই শতাংশে নিয়েছি। এটা কনসশেসনাল লোন বলা হয়। এখন ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সরকারকে সহায়তা দিতে হবে। কারণ স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্টের খরচ সাধারণ পানি শোধনাগারের চেয়ে অনেক বেশি। এক্ষেত্রে ধীরে ধীরে ওয়াসার আয় বাড়বে, সঙ্গে সরকারকে সাবসিডি দিতে হবে। কারণ এর সঙ্গে পরিবেশ, প্রতিবেশ, মানুষের জীবন যুক্ত। জাপানে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্টে সরকার ৬০ শতাংশ সাবসিডি দিচ্ছি। বিশ্বের অনেক দেশই ৫০ শতাংশের বেশি সাবসিডি দেয়। এখানে সরকারকে সেটি দেওয়া দরকার।
এদিকে এই প্লান্টটি পরিচালনায় অতিমাত্রায় বৈদেশিক নির্ভরতা, স্লাজ ব্যবস্থাপনা, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধকে ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ-আইএমইডি। সেইসঙ্গে প্রকল্পটির দুর্বল দিক হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকল্পের সঙ্গে সংযোগ পাইপলাইনের (নেটওয়ার্ক) অভাব এবং পরিচালনায় সমন্বয়হীতা।
আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষার দ্বিতীয় খসড়া প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পটির মূল অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নে সময় লেগেছে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ঢাকার গুলশান, বনানী, বারিধারা, বারিধারা ডিওএইচএস, বসুন্ধরা, বাড্ডা, ভাটারা, বনশ্রী, কুড়িল, সংসদ ভবন এলাকা, শুক্রাবাদ, ফার্মগেট, তেজগাঁও, আফতাবনগর, নিকেতন, সাঁতারকুল এবং হাতিরঝিলের আশপাশের এলাকার পয়ঃবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদীতে নিষ্কাশন করা হচ্ছে। এতে পানি ও বাতাস দূষণ কমানো সম্ভব হচ্ছে। পাশাপাশি সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ফেইজ-১ ও ফেইজ-২-এর ইনটেক পয়েন্টে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষণ কমানো সম্ভব হচ্ছে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিবেশগতমান ও জনস্বাস্থ্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবেশ দূষণ কমেছে ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ, দুর্গন্ধ কমেছে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্যুয়ারেজ উন্নয়ন ঘটেছে ৪৫ দশমিক ৯ শতাংশ। পাশাপাশি খাল-নদীর পরিবেশ ও জলজ প্রাণীবৈচিত্র্যের উন্নয়ন হয়েছে। তবে ড্রেনেজ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অতিবৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা, আংশিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্যুয়ারেজ সংযোগে ঘাটতি এবং জনসচেতনতার অভাব প্রকল্পের পূর্ণ সফলতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময় বিভিন্ন অর্থবছরে ৭৪টি অডিট আপত্তি উত্থাপন হয়েছিল। এর আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৭ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এসব আপত্তির মধ্যে ২০টি নিষ্পত্তি হয়েছে, ২৮টি নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোর এখনো সমাধান হয়নি।
প্রতিবেদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, ফ্লাই অ্যাশ বিক্রি আরও স্বচ্ছ করতে সব ক্রেতার সঙ্গে ফোকাস গ্রুপ আলোচনা করে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করতে হবে। এ ছাড়া বর্তমানে প্লান্টের যেসব অপারেটিং সফটওয়্যার আছে, তার যেকোনো সমস্যা বা মেশিনগুলোর যান্ত্রিক ক্রুটির জন্য চীনা বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসার প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রকৌশলী ও অপারেটর স্টাফদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এ বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে।
এ ছাড়া রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানোর জন্য জ্বালানি হিসেবে ডিজেলের পরিবর্তে এলপি গ্যাস ব্যবহার করা যায় কি না, এ নিয়ে গবেষণা করতে হবে। আর প্লান্টের ভেতরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সোলার প্যানেলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্লান্ট থেকে বের হওয়া ধোঁয়ায় মাঝে মাঝে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এটি কমানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে যথাসময়ে পিআইসি (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি) এবং পিএসসি (প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি) সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ভবিষ্যতে এমন প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব সভা নিয়মিত করতে হবে বলে প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।