Image description

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর। গত রবিবার (১০ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম তার ডিন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলোচিত ছিল সালেহ জহুরের নাম। ফলে তার ডিন হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি ক্যাম্পাসে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ড. সালেহ জহুর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ঋণ অনিয়ম, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) ট্রাস্ট ও আইআইইউসি টাওয়ারের অর্থ ব্যবস্থাপনা, ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলাগুলোতে তার নাম উঠে আসে। তথ্য বলছে, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্ব পালনকালে ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণ অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন।

২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের পর বিপুল ঋণ বিতরণ ও অনিয়মে কিছু পরিচালক ও কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। সেখানে ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুরের নাম বোর্ডসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৮২৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ৫২ জনের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার এজাহারে ড. সালেহ জহুরকে ব্যাংকের সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে আসামি করা হয়।

 

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (আইআইইউসি) টাওয়ারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ ওঠে, সেখানেও এই শিক্ষকের নাম জড়িয়েছে। ওই সময়ে দুদকের এজাহারে বলা হয়, ২০২১ সালের ৬ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের মধ্যে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ট্রাস্টের ১২ কোটি ৭৯ লাখ ৪১ হাজার ৫৫৬ টাকা আত্মসাৎ করেন। আসামিরা ট্রাস্ট আইন ও বিধি উপেক্ষা করে ওই অর্থ নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

এ ঘটনায় দুদক জানায়, ট্রাস্টের নামে প্রাপ্ত আয় সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়ের কথা থাকলেও আসামিরা তা নিয়মবহির্ভূতভাবে আত্মসাত করেছেন। পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়ার পরই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানায় দুদক।

আমরা আসলে তার একাডেমিক ক্যারিয়ার ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি তিনি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন— অধ্যাপক ড. আল ফোরকান, উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এদিকে, আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ কেলেঙ্কারির নানা অভিযোগে আলোচিত একজন ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকের মতে, ফ্যাসিবাদী সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে সমালোচিত কাউকে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। এ ছাড়া, তার কয়েকটি ব্যাংক হিসাব এখনো ফ্রিজ অবস্থায় রয়েছে। পাশাপাশি সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এম এ মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায়ও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এটা আমাদের জন্য লজ্জার। অর্থ কেলেঙ্কারির মতো এমন অভিযোগ যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে রয়েছে তাকে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়? দুদকে ওই শিক্ষকের মামলার তদন্ত এখনো চলমান, তার সমস্ত একাউন্ট ফ্রিজ করা রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন এমন মানুষ ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেলেন না ডিনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য?

এ সমস্ত অভিযোগের বিষয়ে ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি এক কথায় বলবো— এগুলো পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ। যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে, তার অনেকগুলোই মিথ্যা। আমি সেখানে স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলাম, কারও ব্যক্তিগত প্রতিনিধি হিসেবে না। একজন স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যতটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার, আমি ঠিক ততটুকুই করেছি।

জামায়াত সমর্থিত কিছু শিক্ষক তাদের নিজেদের লোককে ডিন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় আমাকে নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। অথচ আমাকে ডিন করা হয়েছে আমার যোগ্যতার ভিত্তিতে, যাতে আমি একাডেমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারি। তারা নিজেদের পছন্দের লোক দিতে পারেনি বলেই এখন রাজনৈতিকভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে— ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর, নবনিযুক্ত ডিন, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, চবি

তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করছে। তবে এখনো কোনো মামলায় চার্জশিট হয়নি। দুদক থেকে আমাদের বারবার ডাকা হচ্ছে, আমরাও যাচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট জমা দিচ্ছি। আমি যে নথিগুলো জমা দিয়েছি, সেগুলো সঠিকভাবে বিবেচনা করা হলে কোনোভাবেই আমি দোষী সাব্যস্ত হবো না বলে বিশ্বাস করি।

ডিন নিয়োগ নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত সমর্থিত কিছু শিক্ষক তাদের নিজেদের লোককে ডিন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় আমাকে নিয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। অথচ আমাকে ডিন করা হয়েছে আমার যোগ্যতার ভিত্তিতে, যাতে আমি একাডেমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে পারি। তারা নিজেদের পছন্দের লোক দিতে পারেনি বলেই এখন রাজনৈতিকভাবে এসব অভিযোগ ছড়াচ্ছে।

সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য এম এ মোহাম্মদ শাহজাহান চৌধুরীর নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমি তার নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো বক্তব্য দিইনি। হয়তো কোথাও বলেছি যে তিনি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু আমি মাঠের রাজনীতির মানুষ না, আমি কোনো রাজনৈতিক বক্তাও নই। আমি একজন একাডেমিক মানুষ, এ কাজটাই করে যাচ্ছি।

অর্থ কেলেঙ্কারির মতো এমন অভিযোগ যে শিক্ষকের বিরুদ্ধে রয়েছে তাকে কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন বড় দায়িত্ব দেওয়া হয়? দুদকে ওই শিক্ষকের মামলার তদন্ত এখনো চলমান, তার সমস্ত একাউন্ট ফ্রিজ করা রয়েছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখন এমন মানুষ ছাড়া আর কাউকে খুঁজে পেলেন না ডিনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য?— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক

তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কাউকে দোষী বলা ঠিক না। আমি মনে করি, বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত হলে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো থেকে আমি মুক্তি পাব।

আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা আসলে তার একাডেমিক ক্যারিয়ার ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি তিনি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবেন।