বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সীমাহীন দুর্নীতি ও হরিলুটের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রূপপুর প্রকল্পে ৮০ হাজার টাকায় বালিশ ও চার-পাঁচ লাখ টাকায় ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে। টানেলের দুই পাশে গাছ লাগানোর কথা বলে ৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হলেও কোনো গাছ পাওয়া যায়নি।
সোমবার (১১ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ‘পুলিশ সপ্তাহ’ উপলক্ষে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
দীর্ঘ এই বৈঠকে তিনি দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিগত সরকারের দুর্নীতি, পুলিশের পেশাদারিত্ব, জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে অপরাধের ধরন পাল্টেছে।
তিনি বলেন, বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমেই পুলিশের কাছে যায়। পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব হতে হবে এবং মানুষের আস্থার জায়গা তৈরি করতে হবে। পুলিশ প্রশাসন সফল হলে কার্যত সেটি সরকারের সফলতা হিসেবেই বিবেচিত হয়। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকার আপসহীন। অপরাধ দমনে ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে, তাকে কেবল অপরাধী হিসেবেই দেখতে হবে। পুলিশকে মনে রাখতে হবে, তারা কোনো দলের নয়, তারা আইনের রক্ষক।
ভঙ্গুর অর্থনীতি ও নজিরবিহীন দুর্নীতির চিত্র
দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের প্রতিটি খাতকে ‘ভঙ্গুর ও যুদ্ধবিধ্বস্ত’ অবস্থায় পেয়েছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অডিটর জেনারেলের রিপোর্টে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। রূপপুর প্রকল্পে বিদেশিদের জন্য তৈরি করা ভবনে প্রতিটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা এবং ড্রেসিং টেবিলের দাম ধরা হয়েছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশে সমমানের একটি প্রকল্প করতে যেখানে ১৪ হাজার কোটি টাকা লেগেছে, সেখানে রূপপুরে খরচ দেখানো হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা।

কর্ণফুলী টানেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টানেলের ওপারে কোনো প্রয়োজন ছাড়াই বিলাসবহুল ভবন নির্মাণে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। টানেলের দুই পাশে গাছ লাগানোর নামে ৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হলেও অডিটে কোনো গাছ পাওয়া যায়নি।
পিরোজপুরের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি জানান, শুধু কাগজ দেখিয়ে কোনো কাজ না করেই এলজিআরডির ৩৫০০ কোটি টাকা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। জেলার কয়েকটি দপ্তর মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা লোপাটের তথ্য পাওয়া গেছে।
পদ্মা সেতুর ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশে ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে ১৪-১৫ হাজার কোটি টাকা লাগলেও পদ্মা সেতুতে ব্যয় হয়েছে ৫৪-৫৬ হাজার কোটি টাকা। আজকে এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো না হলে পুলিশ, সেনাবাহিনী, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমরা অনেক ভালো কিছু করতে পারতাম। দুর্নীতিবাজদের এই ঋণের বোঝা এখন দেশের ২০ কোটি মানুষের ঘাড়ে এসে পড়েছে।
সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান ও নবীর (সা.) শিক্ষা
রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্যাবিনেট সদস্যদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ আমরা ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছি। তবে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা চিকিৎসকের মতো জরুরি সেবার ক্ষেত্রে এই নিয়ম শিথিল থাকবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদিসের উদাহরণ টানেন। তারেক রহমান বলেন, এক ব্যক্তি তার সন্তানের অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাস দূর করতে নবীর (সা.) কাছে গেলে, তিনি তাকে তিনদিন পর আসতে বলেন। কারণ, নবী (সা.) নিজেও মিষ্টি পছন্দ করতেন এবং অন্যকে উপদেশ দেওয়ার আগে তিনি নিজে তিনদিন মিষ্টি খাওয়া থেকে বিরত ছিলেন।
এই উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, অন্যকে বলার আগে আমি নিজে সাশ্রয়ী হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমরা যারা এই মুহূর্তে দায়িত্বে আছি, দেশের ২০ কোটি মানুষের তুলনায় আমরা অত্যন্ত প্রিভিলেজড (সুবিধাপ্রাপ্ত)। আসুন, আমরা এই সুবিধা কিছুটা হলেও কম নিই। প্রত্যেকে একটু একটু করে ছাড় দিলে রাষ্ট্রের অনেক বড় সাশ্রয় হবে।
পর্যায়ক্রমে পূরণ হবে পুলিশের দাবি
পুলিশ সদস্যদের আবাসন, পরিবহন ও আইটি খাতের সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পুলিশের দায়িত্বের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। ছুটির দিনেও তাদের কাজ করতে হয়। তাই সরকার তাদের শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও কল্যাণের বিষয়ে উদাসীন থাকতে পারে না।
তিনি আশ্বাস দেন, সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও পর্যায়ক্রমে পুলিশের যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণ করা হবে। এছাড়া, পুলিশের নতুন সাইবার ক্রাইম ইউনিটটি বিদ্যমান কাঠামোর মধ্য দিয়েই দ্রুত শুরু করার নির্দেশ দেন তিনি। প্রয়োজন হলে সরকার অতিরিক্ত সহায়তা দেবে বলেও জানান।
বক্তব্যের শেষে তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের সবার লক্ষ্য একটাই— একটি বাসযোগ্য উন্নত বাংলাদেশ তৈরি করা। এই পুলিশ সপ্তাহে ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’— যে স্লোগানটি আপনারা তৈরি করেছেন, সততা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে তা সার্থক করে তুলতে হবে।