ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতটি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। মূলত বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে তারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এ কারণে ভোটের আগেই দল থেকে বহিষ্কার হন। ধারণা করা হয়েছিল, নির্বাচনের পর জয়ী স্বতন্ত্রদের দলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু সরকার গঠনের পর এখনও তাদের দলে নেওয়া হয়নি। এরইমধ্যে সংসদের প্রথম অধিবেশন শেষ হয়েছে। কিন্তু এসব এমপি নিজেদের মতোই ভূমিকা রেখেছেন। এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সাবেক সহ সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি গঠনমূলক সমালোচনাও করছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য একজন সদস্য পেলেও সেখানে ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকেন রুমিন।
জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর ও নিকলী) আসনের এমপি শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, আমরা সাতজন স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচিত হলেও সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। আপাতত স্বতন্ত্র ৬ এমপি জোটবদ্ধভাবে কাজ করছি। আর ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা ভিন্নভাবে ভূমিকা রাখছেন।
তিনি বলেন, দলের পক্ষ থেকে স্বতন্ত্র এমপিদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরাও এক্ষেত্রে নিজস্ব অবস্থান থেকে এগোতে চাই। আর দল চাইলে ফিরতে চাই। সাধারণ মানুষের পক্ষে ভূমিকা রাখাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।
স্বতন্ত্ররা যে আসনে জয়ী
নির্বাচনের আগে দলের মনোনীত প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করেন বিএনপির একাধিক প্রার্থী। এতে করে তারা বহিষ্কার হন। যদিও ভোটের লড়াইয়ে সাতজন জয়ী হন। তারা হলেন-
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর আংশিক) ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সহ-সম্পাদক। বিএনপি জোটের জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সহ-সভাপতি জুনায়েদ আল হাবিবকে পরাজিত করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয় দলের চেয়ারম্যানের পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদা।
টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) প্রার্থী লুৎফর রহমান খান আজাদ। তিনি ২০০১ সালে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার নিকটতম ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী ওবায়দুল হক।
চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আব্দুল হান্নান। উপজেলা বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির হারুন উর রশীদ।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা) আতিকুল আলম (শাওন)। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কার হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন এলডিপির মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেওয়া রেদোয়ান আহমেদ।
ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া) আসনে জয়ী হন সালমান ওমর। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। দলীয় নির্দেশ অমান্য করে প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচনের আগেই ময়মনসিংহ উত্তর জেলার সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার হন সালমান ওমর।
দিনাজপুর-৫ আসনে জয়ী হন এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আব্দুল আহাদ। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন এ কে এম কামরুজ্জামান। রেজয়ানুল হককে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
জোটবদ্ধ ৬ এমপি, একলা চলো নীতি রুমিনের
বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচিত হলেও দলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন স্বতন্ত্র ৬ সংসদ সদস্য। সংসদে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই তারা দলের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা সংসদ সদস্য পদের বাইরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিরোধী দলের মতো শপথ নেননি। সবক্ষেত্রেই সরকারকে সমর্থন দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত আসনে তারা একজন নারী সদস্য পেয়েছেন। সুলতানা জেসমিন নামের ওই সদস্যও ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী ছিলেন।
তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। তিনি শুরুতেই নিজের মতো করে চলছেন। সংরক্ষিত আসনের ক্ষেত্রেও ভোটদানে বিরত ছিলেন। বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের বিরোধিতা করছেন তিনি। শুধু তাই নয়, নির্বাচনি এলাকায়ও চলছেন আলাদা বলয় নিয়ে। প্রতিপক্ষের হামলারও শিকার হয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনও দল নয় আপাতত নিজস্ব অবস্থান থেকেই মানুষের পক্ষে কথা বলতে চান।
সর্বশেষ গত ২৯ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তির বিষয়টি জাতীয় সংসদে তোলার দাবি জানান রুমিন ফারহানা। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ২৮ এপ্রিল মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। সে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাণিজ্যচুক্তিটির বিষয়ে বেশ কিছু কথা বলেছেন। তার মধ্যে ওই বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রফতানির ঘাটতি, বাংলাদেশের কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি, দেশে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতি সংস্কারের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তবে তার প্রস্তাব অনুযায়ী বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সংসদে আলোচনার বিষয়ে সম্মত হয়নি সরকারি দল।
কী করবেন স্বতন্ত্ররা
আগামী দিনের পথচলা কেমন হবে? সরকারি দলের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে কয়েকজন এমপি জানান, তারা নিজস্ব অবস্থানে থেকে ভূমিকা রাখতে চান। পাশাপাশি এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছেন। তারা দলে ফিরতে চান। তাদের প্রত্যাশা দল তাদেরকে ফিরিয়ে নেবে।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের এমপি সালমান ওমর বলেন, স্বতন্ত্র এমপিরা ফিরতে চান। সে অনুযায়ী ইতোমধ্যে নিজেদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। দলীয় হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের আবেদন বাস্তবায়ন না হলেও নিজেরা সরকারের ইতিবাচক কাজের পক্ষে থাকবেন।
সালমান ওমর বলেন, আমাদের সংরক্ষিত নারী সদস্যও চলবেন আমাদের নীতিতে। তিনি আরও জানান, আরেক সদস্য রুমিন ফারহানা তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেননি।