মাসুম খলিলী
ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকীতে লেখা হাসান টি. আলহাসান ও এমিল হোকায়েমের এক প্রবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষত সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই গালফ রাষ্ট্রগুলো নিজেদেরকে সংঘাত প্রশমন ও সংলাপ গঠনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করছে।
লেখকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উপসাগরীয় দেশগুলো কৌশলগতভাবে নিজেদের অবস্থান বদলেছে। কোভিড-পরবর্তী জ্বালানি সংকট তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে তাদের প্রভাব বাড়িয়েছে। বিশেষ করে কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সরবরাহ বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই অর্থনৈতিক শক্তি তাদের কূটনৈতিক স্বাধীনতাও বাড়িয়েছে। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তুলছে—অর্থাৎ একক মিত্রনির্ভরতার বদলে বহুমুখী ভারসাম্য কৌশল গ্রহণ করেছে।
প্রবন্ধে বলা হয়, গালফ দেশগুলো সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী—বিশেষ করে ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে—সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা নিয়েছে। সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকগুলো এই পরিবর্তনের উদাহরণ। এসব উদ্যোগ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর পাশাপাশি তাদের নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। কারণ, তারা বুঝতে পেরেছে যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ পরিবেশের জন্য হুমকি।
লেখকরা যুক্তি দেন যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত বৈদেশিক নীতিও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর সাম্প্রতিক সফর এবং গালফ দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব পুনর্বিন্যাস মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। ওয়াশিংটন এখন প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পথ খুঁজছে। এই অবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন হলো—এই দেশগুলো কি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হতে পারবে? লেখকদের মতে, তাদের কিছু সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, তারা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী এবং সংঘাতপীড়িত পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে। দ্বিতীয়ত, তারা সরাসরি সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ নয়, বরং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, তারা নিজেদের ভূখণ্ড ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ককে আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ইরান-ইসরায়েল দ্বন্দ্বের গভীরতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন—এসব বিষয় মধ্যস্থতাকে জটিল করে তুলতে পারে। এছাড়া, গালফ দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন মধ্যস্থতাকারী নয়; বরং কৌশলগত সমন্বয়ের মধ্যে কাজ করছে।
লেখকরা ইঙ্গিত করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ কেবল বৃহৎ শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না, বরং আঞ্চলিক মধ্যম শক্তিগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই দেশগুলো এখন শুধু সংঘাতের ভুক্তভোগী নয়, বরং সম্ভাব্য সমাধানের অংশীদার। যদি তারা ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগ বজায় রাখতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।
সার্বিকভাবে প্রবন্ধটি দেখায় যে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে। গালফ রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের জটিল সমীকরণে একটি নতুন মধ্যস্থতাকারী স্তর তৈরি করছে। তবে তাদের সাফল্য নির্ভর করবে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিশ্রুতির ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে প্রবন্ধটির মূল বার্তা হলো—মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এখন কেবল বৃহৎ শক্তির হাতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নতুন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা ভবিষ্যৎ কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে।