Image description

জুলাই বিপ্লবে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ফারহান ফাইয়াজ ও মাহমুদুল রহমান সৈকতসহ ৯ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস এবং সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশের জন্য আজ দিন ধার্য রয়েছে।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ বিষয়ে আদেশ দিবেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

 

এই মামলায় তাপস-নানক আসামিদের মধ্যে অন্যতম ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকারসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের মোট ২৮ নেতাকর্মী।

 

এ মামলায় চারজন আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন— নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্রলীগের মোহাম্মদপুর থানা শাখা সভাপতি নাঈমুল হাসান রাসেল, সহ-সভাপতি সাজ্জাদ হোসেন, ওমর ফারুক ও ফজলে রাব্বি। গতকাল সকালে তাদের কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয় । গত ৭ মে আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য ছিল। তবে তা পিছিয়ে আজকের দিন নির্ধারণ করে ট্রাইব্যুনাল।

 

এর আগে, ২৬ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ। এরপর আদেশের জন্য ৭ মে দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।

 

এই মামলায় প্রসিকিউশন আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ আনেন।

 

প্রথম অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, ছাত্র-জনতাকে দমনে নানক শেখ হাসিনার সঙ্গে নিয়মিত ফোনে কথা বলতেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, অ্যাডিশনাল ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, এডিসি রৌশানুল হক সৈকতগণের সঙ্গে যোগাযোগ করে ছাত্র-জনতাকে দমনে নির্দেশনা দিতেন।

 

এই অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, আসামি হাবিবুর রহমান তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হিসেবে ২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ জুলাই ওয়ারলেস ম্যাসেজের মাধ্যমে চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারীদেরকে হত্যার নির্দেশ দেন।

 

এছাড়া ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, ডিএমপি যুগ্ম কমিশনার (অপারেশন) এবং মোহাম্মাদপুর জোনের এডিসি রৌশানুল হক সৈকত ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর থানায় উপস্থিত হয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আন্দোলনকারীদের ওপর চাইনিজ রাইফেল ব্যবহার করে গুলি করার নির্দেশ দেন। এর পরিপ্রেক্ষিততে ১৮ ও ১৯ জুলাই মোহাম্মদপুর থানা অস্ত্রাগারে সংরক্ষিত ২০০ রাউন্ড চায়নিজ রাইফেলের গুলি ও ১৮০০ রাউন্ড শর্টগানের গুলি আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যবহার করা হয়। এতে ১৮ জুলাই ফারহান ফাইয়াজ গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ও ফাতহীন মহতাদী ত্বকী কে গুরুতর জখম করা হয়। যা আসামিদের জ্ঞাতসারেসংঘটিত হয়েছে।

 

দ্বিতীয় অভিযোগ বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড হতে বসিলা রোড ও নূর জাহান রোডসহ আশপাশের এলাকায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আসামি বিপ্লব কুমার সরকার, ডিএমপি যুগ্ম-কমিশনার (অপারেশন) এবং আসামি রৌশানুল হক সৈকত নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চাইনিজ রাইফেল, শটগান, গ্যাস শেল, সাউন্ড গ্রেনেডসহ অবস্থান নেন।

 

একপর্যায়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি করতে থাকেন। এতে রিকসা চালক মো. মাহিন মিয়া ও রনি গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন এবং অসংখ্য ছাত্র-জনতাকে গুরুতর জখম করা হয়। যা আসামিদের জ্ঞাতসারে,সম্পৃক্ততায় ও সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছে।

 

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, আসামিদের নির্দেশে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মোহম্মাদপুর থানাসহ আশপাশের এলাকায় আল শাহরিয়ার হোসেন ওরফে রোকনসহ ৬ জনকে গুলি করে হত্যা এবং মো. নাহিদ হাসানসহ কমপক্ষে ৮ জনকে হত্যার উদ্দেশ্যে গুরুতর জখম করা হয়। যা আসামিদের উপস্থিতিতে এবং সহায়তায় সংঘটিত হয়েছে। এঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই রাজধানী মোহাম্মদপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নৃশংসতা চালায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় তদন্তের পর ২৮ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা।

 

এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আসামিদের উসকানি-প্ররোচনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ উপস্থিতিতে জুলাই বিপ্লবে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। এতে মাহমুদুর রহমান সৈকত, ফারহান ফাইয়াজ, ৯ জন শহীদ হন। এবং অসংখ্য ছাত্রজনতা আহত হন। এ মামলায় ৫০ জনকে সাক্ষী আসামিদের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিবেন।