এবারের পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর সদস্যদের সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘পুলিশ পদক’ প্রদান অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। প্রতি বছর তাদের দক্ষতাপূর্ণ কাজের জন্য সদস্যদের পদক দেওয়ার প্রথা থাকলেও এবারের তালিকায় জুলাই অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা একাধিক সদস্যের নাম থাকায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। গতকাল শনিবার রাতে পুলিশ সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষস্থানীয় এক কর্মকর্তাকেও পুলিশ পদক দেওয়া হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ের আজ রোববার ঘোষণা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এছাড়া পদকপ্রাপ্তদের প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকা একাধিক কর্মকর্তা জানান, তাদের মৌখিকভাবে রাজারবাগ প্যারেড গ্রাউন্ডে পদক আনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি জানানো হয়।
পদক প্রদান আনুষ্ঠান বাতিল করার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের কারো কাছে এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয় যায়নি। তবে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, পদকপ্রাপ্তদের তালিকায় বিতর্কিত একাধিক সদস্যের নাম রয়েছে। শেষ সময়ে তা নজরে আসায় বাতিল করা হয়েছে।
জানা গেছে, বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদকপ্রাপ্ত এবং দলীয় অনুগত হিসেবে পরিচিত ১১ কর্মকর্তা এবারের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এদের মধ্যে কারো বিরুদ্ধে ‘কথিত জঙ্গি’ দমনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা, কেউ প্রভাবশালী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কোটায় সুযোগ পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কেউ জামায়াতের আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ‘হ্যাক কাণ্ডে’ প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা রাখার পরও তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এবারের পুলিশ সপ্তাহে বাহিনীর ১০৭ সদস্যের পদক পাওয়ার কথা ছিল।
দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনে পুলিশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বিরোধী মতকে দমন ও নিপীড়ন ছিল পদোন্নতির অন্যতম অলিখিত শর্ত। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আস্থার সংকটে ছিল পুলিশ। থানাগুলোতে সেই সময় পুলিশ ভয়ে যেতে পারেনি। অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত পুলিশ। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’Ñএই প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করবেন। তিনি পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ দেবেন। এ সময়ে কৃতিত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে নির্বাচিত পুলিশ সদস্যদের সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘পিপিএম’ ও ‘বিপিএম’ পদক পরিয়ে দেবেন। পরে তিনি কল্যাণ প্যারেডে অংশগ্রহণ করবেন।
প্যারেডে বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে ১১টি দাবি তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে। সে দাবিগুলো হচ্ছে, বিশেষ সাইবার ক্রাইম ইউনিট প্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালসহ বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের বিদ্যমান পুলিশ হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করতে একটি পুলিশ মেডিকেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে সিলেট এবং বরিশাল বিভাগে দুটি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি), জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে তাদের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ক্রীড়া সক্ষমতার মান আরো বাড়াতে স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণ, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, বিদেশে মানব পাচার, নির্যাতন ও বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধ করতে, একই সঙ্গে দেশে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ব্যবস্থাপনা আরো উন্নীতকরণসহ সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মিশন-দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসার নিয়োগসহ দুদক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, বিআইডব্লিউটিএ ইত্যাদিতে পুলিশ অফিসারদের পদায়ন, এভিয়েশন পুলিশ ইউনিট প্রতিষ্ঠা করা, আবাসন সংকট দূর, বিভাগীয় পর্যায়ে শুধু পুলিশের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন, গাড়ির জন্য সুদমুক্ত ঋণ, উপকূলীয় থানায় দায়িত্ব পালনের জন্য অতিরিক্ত ভাতা, রেশন বৃদ্ধি ও সিটিটিসিতে কর্মরত কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধি। এছাড়া ছোটখাটো আরো কিছু দাবি-দাওয়া প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনবেন তারা। পাশাপাশি পুলিশের আরো পদ সৃষ্টি করে যোগ্য পুলিশ সদস্যরা যাতে সঠিক স্থানে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেই বিষয়টিও তুলে ধরা হবে।
একাধিক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর বড় চ্যালেঞ্জিং সময় পার করে এসেছে পুলিশ। মনোবল ফেরাতে পুলিশকে অনেক ধৈর্য ধরে মাঠে কাজ করতে হয়েছে। আসন্ন পুলিশ সপ্তাহে আগামী বছরের নতুন পরিকল্পনা নিয়ে তারা মাঠে কাজ করবেন বলে জানা গেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুলিশ সপ্তাহে পুলিশের একটি বছরের ভালো-মন্দের গড় হিসাব করা হয়। একে অপরের সঙ্গে দেখা হয়ে থাকে। পাশাপাশি আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন নতুন কী কর্মপন্থা গ্রহণ করতে হবে, সে ব্যাপারে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। মাঠ পর্যায়ে কাজের ক্ষেত্রে কী সমস্যা হয়েছিল এবং কোন কোন স্থানে ঘাটতি পূরণ করতে হবে, তা খোলাখুলি কল্যাণ সভায় বলে থাকেন পুলিশের কর্মকর্তারা। কাজের ঘাটতি পূরণে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পরামর্শ আসে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের কাছে।
বরিশাল বিভাগের এক পুলিশ সুপার (এসপি) গতকাল সন্ধ্যায় আমার দেশকে জানান, এবারের পুলিশ সপ্তাহে আবাসন সংকট দূর ও রেশন বৃদ্ধির জন্য তারা দাবি করবেন। তারা ব্যাংক থেকে সুদমুক্ত ঋণ পান না। তারা যাতে এবার এই সুযোগটি পান সেই বিষয়টি তুলে ধরবেন। পাশাপাশি পুলিশের যে কমিউনিটি ব্যাংক রয়েছে সেই ব্যাংকের পরিধি বাড়ানোসহ আরো বেশি শাখা খোলার বিষয়টি তুলে ধরবেন। এছাড়াও জেলা পর্যায়ে তাদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল করার দাবি করবেন তিনি।
সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পুলিশের পক্ষ থেকে ঝুঁকিভাতার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার একাধিকবার আশ্বাস দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। পুলিশের পক্ষ থেকে এবারও কনস্টেবল থেকে আইজি পর্যন্ত সবাইকে ঝুঁকিভাতার আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানানো হবে।
প্যারেডের নেতৃত্ব দেবেন ডিএমপির ডিসি হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার
এবারের বার্ষিক পুলিশ প্যারেডে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্বে রয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপপুলিশ কমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার। তার নেতৃত্বে বিভিন্ন কন্টিনজেন্টের পুলিশ সদস্যরা প্যারেডে অংশ নেবেন। বার্ষিক পুলিশ প্যারেড অনুষ্ঠানে ২০২৫ সালে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’, ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)’ এবং গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলামূলক আচরণের মাধ্যমে প্রশংসনীয় অবদানের জন্য ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)-সেবা’ এবং ‘রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক (পিপিএম)-সেবা’ দেওয়ার কথা ছিল।
পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির বাণী
এ উপলক্ষে এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, পুলিশ বাহিনীর সততা, নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার ওপর একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও উন্নয়ন অগ্রযাত্রা অনেকাংশে নির্ভর করে। বিভিন্ন জাতীয় আয়োজন ও ক্রান্তিকালীন সময়েও পুলিশ বাহিনীর নৈর্ব্যক্তিক, পেশাদার ও জনবান্ধব ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, বর্তমান সরকার একটি সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিস্তারিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলছে। তবে ঘরে-বাইরে জনমনে নিরাপত্তা, স্বস্তি না থাকলে লক্ষ্য অর্জন দুরূহ হয়ে উঠবে। এজন্য পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নই এই মুহূর্তে আমাদের অগ্রাধিকার।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন, অপরাধ দমন এবং জাতীয় অগ্রগতির সঙ্গে পুলিশের উন্নয়ন নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। এ কারণে পুলিশের উন্নয়নে বিনিয়োগকে সরকার জননিরাপত্তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি। মব সহিংসতা, কিশোর গ্যাং এবং মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধে পুলিশকে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।