Image description
রংপুরের গ্যাং কালচার

ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে নিজ হাতে খুনের পর নামের সঙ্গে জুড়ে যায় ‘মার্ডার’ উপাধি। সেই পরিচয়ে ধীরে ধীরে এলাকায় ভয়ংকর সব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন ফিরোজ শাহ। হত্যা মামলায় কারাগারে থাকলেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের তদবিরে তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সংসদ সদস্যের ‘ধর্মছেলে’ পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য গড়ে তোলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই সময় থেকেই ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মারধরসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন ফিরোজ। একপর্যায়ে স্থানীয় কিশোর ও তরুণদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন নিজস্ব বাহিনী, যা এলাকাজুড়ে ‘মার্ডার ফিরোজ গ্যাং’ নামে পরিচিতি পায়।

ফিরোজ শাহর বাড়ি বদরগঞ্জ পৌর শহরের বটপাড়া এলাকায়। স্থানীয়রা জানান, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর দ্রুত রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেন তিনি।

এরপর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে তার গ্যাং। একটি দোকানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে এই গ্যাংয়ের হাতে খুন হন বিএনপির দুই কর্মী। এ ঘটনায় করা মামলাতেও উচ্চ আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে এলাকায় আবার সক্রিয় হন ফিরোজ। সর্বশেষ আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অস্ত্র হাতে মহড়ার সময় প্রকাশ্যে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিরীহ ভ্যানচালককে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ফিরোজ গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে। গ্যাং লিডার ফিরোজের বিরুদ্ধে চারটি হত্যা মামলাসহ মোট ১২টি মামলা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে তিনি এলাকায় একটি সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।

বন্ধুকে হত্যার পর নাম হয় ‘মার্ডার ফিরোজ’: রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভা সংলগ্ন শংকরপুর মধ্যপাড়া গ্রামের রেজাউল ইসলাম রানা ছিলেন স্থানীয় কলেজিয়েট স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়সে বড় হলেও বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি হওয়ায় ফিরোজ শাহের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। প্রায়ই রানাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন ফিরোজ। পরিবারের অভিযোগ, ২০১৮ সালে বদরগঞ্জ স্টেশন এলাকায় প্রকাশ্যে রানাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন ফিরোজ শাহ। এরপর থেকেই এলাকায় তিনি ‘মার্ডার ফিরোজ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফিরোজ শাহ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে লালমনিরহাট রেলওয়ে থানায় হত্যা মামলা করে রানার পরিবার। মামলায় ফিরোজকে প্রধান আসামি করা হয়। ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল চার্জশিট দেয় পুলিশ।

শংকরপুর মধ্যপাড়া গ্রামে গিয়ে কথা হয় হত্যাকাণ্ডের শিকার রানার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। রানার মা হাওয়া বেগম বলেন, ফিরোজ তার ছেলে রানার বন্ধু ছিল। প্রায়ই বাড়িতে এসে রানাকে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যেত। তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। এ ছাড়া কী কারণে রানাকে হত্যা করা হয়েছিল, সেটি আজও জানতে পারেননি তারা। কাঁদতে কাঁদতে হাওয়া বেগম বলেন, ‘আমার ছেলেকে কেন মারল, এখনো জানি না। ফিরোজ অনেক মায়ের বুক খালি করেছে, অনেক অন্যায় করেছে। আমি তার ফাঁসি চাই।’

যেভাবে গড়ে উঠল ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাং: বিদ্যালয়ের পাশেই বাড়ি হলেও পড়াশোনায় মন ছিল না ফিরোজের। স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই ঝামেলা ও মারামারিতে জড়িয়ে পড়ত ফিরোজ। এক পর্যায়ে আশপাশের বখাটে তরুণদের নিয়ে এলাকায় কিশোর গ্যাং কালচার গড়ে তোলেন তিনি। বন্ধু রানা হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারেও যেতে হয় ফিরোজকে। তার আগেও মারামারি ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি মামলা হয়েছিল। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে তাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে জামিনে মুক্ত করার পেছনে ভূমিকা রাখেন আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলে রাব্বি সুইট।

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্য আহসানুল হক চৌধুরী ডিউকের ‘ধর্মছেলে’ পরিচয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন ফিরোজ। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় স্থানীয় বখাটেদের নিয়ে নিজের গ্যাং নেটওয়ার্ক আরও বিস্তৃত করেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগের ক্যাডার বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হতো এই গ্রুপকে।

পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব গোপাল ব্যানার্জি, বদরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল হোসেন সম্রাট, আব্দুর রহমান লাবিব, সাগর, সজীব, শিমুল, সৌরভ, পীযূষ, বুলেট ও মোস্তাকিম তার গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে।

এলাকাবাসীর দাবি, ফিরোজের নেতৃত্বে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং মানুষকে তুলে এনে মারধরের মতো নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। তার ভয়ে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পেতেন না।

হত্যাকাণ্ডের শিকার রেজাউল ইসলাম রানার বন্ধু আক্তারুল ইসলাম বলেন, ফিরোজ পড়াশোনা করত না। সারা দিন ঘোরাঘুরি করত। এলাকার খারাপ ছেলেদের সঙ্গে চলাফেরা ছিল তার। ছোটবেলা থেকেই ঝামেলা-মারামারির সঙ্গে যুক্ত ছিল।

সম্প্রতি ফিরোজ গ্যাংয়ের হাতে নিহত ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামের চাচা মোস্তাফিজার রহমান বলেন, কথায় কথায় সে মানুষকে মারধর করে। দিনদুপুরে ছুরি হাতে মহড়া দেয়। বর্তমানে তার গ্রুপের ভয়ে মানুষ কিছু বলতে সাহস পায় না। তার হাতে অনেক মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। এলাকার বখাটে ছেলেদের নিয়ে সে একটি ভয়ংকর গ্রুপ গড়ে তুলেছে।

৫ আগস্টের পর বদলে ফেলেন ‘রং’: উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক থেকে পরে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করা কালুপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিক এবং তার ছেলে জেলা যুবলীগ নেতা তানভীর আহমেদ তমাল ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করে বিএনপির পরিচয়ে সক্রিয় হন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সেই সুযোগে ফিরোজও নিজেকে সাবেক ছাত্রদল নেতা দাবি করতে শুরু করেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, শহিদুল হক মানিকের ‘কালা মানিক বাহিনী’ ও ‘মার্ডার ফিরোজ গ্যাং’ মিলে এলাকায় ফের প্রভাব বিস্তার শুরু করে। ৫ আগস্টের পর কমিউনিটি সেন্টার দখল, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং মানুষকে মারধরের মতো নানা অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। ওই সময়ের পর থেকেই ফিরোজের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলাসহ অন্তত ছয়টি মামলা হয়। মামলায় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও আসামি করা হয়েছে।

জানা গেছে, বদরগঞ্জ পৌর শহরের শহীদ মিনার এলাকায় একটি দোকানঘর নিয়ে ভাড়াটিয়া ও মালিকপক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় মালিকপক্ষের হয়ে অবস্থান নেন জেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী সরকার। অন্যদিকে ভাড়াটিয়া পক্ষকে সমর্থন দেন কালুপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিক। বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা চললেও হামলা ও দোকানপাট লুটের অভিযোগ তুলে ৫ এপ্রিল মানববন্ধনের ডাক দেন ভাড়াটিয়া জাহিদুল ইসলাম। এর আগের দিন মোহাম্মদ আলী সরকারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক পোস্ট দেন চেয়ারম্যান মানিকের ছেলে ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা তানভীর আহমেদ তমাল। মোহাম্মদ আলী সরকারের অনুসারী হিসেবে পরিচিত শফিকুল ইসলাম ও মধুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সমাজকল্যাণ সম্পাদক লাভলু মিয়া গত ৫ এপ্রিল দুপুরে বদরগঞ্জ বাজারের একটি দোকানে বসে পান খাচ্ছিলেন। সেখানেই তাদের ওপর হামলা চালানো হলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন লাভলু। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান শফিকুল।

লাভলু মিয়ার পরিবারের অভিযোগ, সেদিন চেয়ারম্যান মানিক, তার ছেলে তানভীর আহমেদ তমাল, ফিরোজ ওরফে ‘মার্ডার ফিরোজসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে একটি দল এসে হামলা চালায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে লাভলু ও শফিকুলের মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বিএনপি নেতা লাভলু মিয়া। গুরুতর আহত শফিকুল ইসলাম রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন মাস ২০ দিন পর তিনিও মারা যান।

লাভলু মিয়া হত্যাকাণ্ডে তার ছেলে রায়হান কবির হত্যা মামলা করেন। তিনি কালবেলাকে বলেন, আওয়ামী লীগের ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ফিরোজ ৫ আগস্টের পর চেয়ারম্যান শহিদুল হক মানিকের ছত্রছায়ায় নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। এরপর ফিরোজ গ্যাং ও মানিক বাহিনীর সদস্যরা একসঙ্গে মিলে এলাকায় দখল, চাঁদাবাজি, অপহরণ, মারধর ও হত্যাকাণ্ডের মতো কর্মকাণ্ডে জড়ায়। আমার বাবাকে হত্যার দিন ফিরোজ এসে প্রথম আঘাত করে। এরপর তার গ্যাং ও মানিকের সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা আমার বাবাসহ দুজনকে হত্যা করে।’

পৌর ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি জিহাদ সরকার রানা বলেন, আওয়ামী লীগের আমল থেকেই ফিরোজ তার গ্যাংয়ের মাধ্যমে এলাকায় মানুষকে নির্যাতন করতেন। তার অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময়ও বিএনপি নেতাকর্মী ও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন ফিরোজ। কিন্তু এখন সে রং বদলে বিএনপির পরিচয় দিচ্ছে। সারাক্ষণ বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাদের নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে। স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতা অবশ্যই তাকে শেল্টার দিচ্ছে। বিএনপির শেল্টার পেয়েই সে দলের নাম ব্যবহার করছে। আমিও তো বিএনপি করি, কিন্তু এখন কীভাবে তাদের নাম বলি?

মানুষকে নির্যাতন করাই ছিল নেশা: ফিরোজ ও তার সহযোগীরা ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রতিপক্ষকে দমন, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মারধরের ঘটনাকে যেন নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিরোজের ভয়ে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পান না। কেউ ব্যবসা করতে চাইলে চাঁদা, কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা—এভাবেই গড়ে উঠেছে তার ত্রাসের রাজত্ব। একের পর এক অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন তিনি।

বদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মাইনুল হাসান রাব্বি জানান, আওয়ামী লীগের আমলে ২০২৩ সালে রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর এলাকায় একটি কনসার্টে গিয়ে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে বিরোধে জড়ান ফিরোজ ও তার গ্যাংয়ের সদস্যরা। ওই ঘটনায় বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থীর বাড়ি মমিনপুর এলাকায় হওয়ায় তাকে আটকে রাখে ফিরোজের সহযোগীরা। খবর পেয়ে মীমাংসার জন্য সেখানে যান রাব্বি।

তার অভিযোগ, আলোচনা চলাকালেই অতর্কিতভাবে ছুরি নিয়ে হামলা চালায় ফিরোজ। এতে রাব্বির পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সাতটি সেলাই দিতে হয়। এ ঘটনায় রাব্বি বাদী হয়ে মামলা করেন। সেই মামলায়ও কারাভোগ করেন ফিরোজ।

অন্যদিকে বদরগঞ্জ স্কুল অ্যান্ড কলেজের এসএসসি পরীক্ষার্থী রিফাত ইসলামের অভিযোগ, তার বন্ধুদের সঙ্গে ফিরোজ গ্যাংয়ের বিরোধ সৃষ্টি হলে তাদের খুঁজতে থাকে গ্যাং সদস্যরা। বন্ধুদের না পেয়ে রিফাতকে ধরে মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি নিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তারা।

তিনি বলেন, এসএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের দিন বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পথে আম্বিয়ার মোড় এলাকায় একা পেয়ে তার ওপর হামলা চালায়। এ সময় তার প্রবেশপত্র ও রেজিস্ট্রেশন কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে তুচ্ছ ঘটনা কিংবা কোনো কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষকে মারধর ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে ফিরোজের বিরুদ্ধে।

‘বিচার না পাইলে হামরা বাপ-মাও আত্মহত্যা করমো’: আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বের জেরে গত ৫ মে বিকেলে উপজেলার বালুয়াভাটা এলাকার আম্বিয়ার মোড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানচালক আরিফুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাং। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রংপুর আদালতে মামলার হাজিরা দিতে যান ‘মার্ডার ফিরোজ’ গ্যাং ও পাঠানপাড়া এলাকার মমিনুল গ্রুপের সদস্যরা। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে ফিরোজের নেতৃত্বে মমিনুল গ্রুপের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে মমিনুলসহ কয়েকজন আহত হন। আদালত থেকে ফেরার পর বিকেলে বদরগঞ্জে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিশোধ নিতে মমিনুলের অনুসারীরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ফিরোজ বাহিনীকে খুঁজতে থাকে। একই সময় ফিরোজ গ্রুপও মমিনুল পক্ষকে খুঁজতে থাকে। একপর্যায়ে আম্বিয়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানচালক আরিফুলের কাছে তার বাড়ি কোথায় জানতে চাওয়া হয়। তিনি পাঠানপাড়া গ্রামের কথা বলতেই তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত আরিফুলের বাবা রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘এই মার্ডার ফিরোজ গ্রুপ যখনই শুনছে আমার ছেলের বাড়ি পাঠানপাড়া তখনই নির্মমভাবে কোপাইছে। তার মা আর আমি ওখানে যায়া (গিয়ে) রক্ত দুই হাতে নাড়ি (স্পর্শ) আসলাম। আমরা আত্মহত্যা করতে চাচ্ছি, কারণ আমরা গরিব মানুষ বিচার পাব না। কার কাছে যাব, আমার টাকা-পয়সা নেই। বিচার না পাইলে হামরা বাপ-মাও আত্মহত্যা করমো।’

এক ডজন মামলা, তবু ‘অধরা’: বিএনপির দুই নেতাকর্মী হত্যা মামলায় কয়েক মাস পালিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসে ফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন ফিরোজ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ফিরোজের বিরুদ্ধে চারটি হত্যাসহ এক ডজন মামলা রয়েছে। এর মধ্যে মারামারি, অপহরণ, চাঁদাবাজি এবং বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলাও রয়েছে। তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব গোপাল ব্যানার্জি ও সম্রাটও একাধিক হত্যা মামলার আসামি।

বিভিন্ন মামলায় জামিনে থাকলেও ফিরোজ দুটি মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ছিলেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একাধিক মামলা থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রকাশ্যে এলাকায় চলাফেরা করতেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতেন। রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থন ও গ্যাং নেটওয়ার্কের কারণে তিনি অনেক সময় ‘অধরা’ থেকে যান।

বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান জাহিদ সরকার বলেন, ফিরোজের বিরুদ্ধে বদরগঞ্জ থানায় তিনটি হত্যা মামলাসহ ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মামলায় ওয়ারেন্ট থাকায় সে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। ভ্যানচালক আরিফুল হত্যার আগের দিনও তাকে ধরতে অভিযান চালানো হয়েছিল।

ওসি বলেন, ‘আগে কী হয়েছে জানি না, কিন্তু এবার আর সন্ত্রাসীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্থাও কাজ করছে। তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে। এখানে কেউ গ্যাং কালচার, সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলেই গ্রেপ্তার করা হবে।’

কী বলছে ছাত্রদল: ফিরোজ শাহ ওরফে ‘মার্ডার ফিরোজ’ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে কখনো যুক্ত ছিলেন না বলে দাবি করেছে জেলা ছাত্রদল। তবে ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে তার গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও হত্যা মামলায় জড়িত থাকার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের বিরুদ্ধে শিগগির সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।

জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আফতাবুজ্জামান সুজন কালবেলাকে বলেন, অনেকেই সুবিধা নিতে দলের নাম ভাঙিয়ে চলে। আবার দলের কিছু নেতাকর্মীও তাদের সুযোগ করে দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমি ছাত্রদলের নেতৃত্বে থাকলেও ফিরোজ শাহ নামে কাউকে দলের পদ-পদবি বা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দেখিনি। অতীতে সে কারও ছত্রছায়ায় থাকলে সেই দায় তাকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, ‘বদরগঞ্জের হত্যাকাণ্ডে পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব গোপাল ব্যানার্জি এবং বদরগঞ্জ সরকারি কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম সম্রাটের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আমরা শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে সাংগঠনিকভাবে কাজ চলছে। এরই মধ্যে কিছু প্রাথমিক তথ্যপ্রমাণও হাতে এসেছে। এক-দুই দিনের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’