চট্টগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যোগদান অনুষ্ঠানকে ঘিরে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যাপক রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত তার অনুপস্থিতি নগর রাজনীতিতে নতুন ধোঁয়াশার জন্ম দিয়েছে। কয়েকদিনের প্রচারণা, গুঞ্জন ও প্রত্যাশার পরও আলোচিত কোনো বড় রাজনৈতিক মুখের আনুষ্ঠানিক যোগদান না হওয়ায় এনসিপির আয়োজন ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
ঢাকঢোল পিটিয়ে, ব্যাপক প্রচারণা এবং উৎসবমুখর আয়োজনের মধ্য দিয়ে এনসিপি চট্টগ্রামে তাদের যোগদান অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কয়েকদিন নগরজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চলতে থাকে। এতে পুরো শহরে একটি উৎসবমুখর রাজনৈতিক আবহ তৈরি হয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে ঘিরেও শুরু হয় নানা গুঞ্জন ও আলোচনা। তবে প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কোনো হাই-প্রোফাইল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়ায় পুরো আয়োজন নিয়ে নগরজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এনসিপির নেতারা অবশ্য বলেছেন, আলোচিত কেউ যোগ না দিলেও রাজনীতির আলোচনা এখানেই শেষ নয়। যথাসময়ে চমক দেখা যাবে বলেও দাবি করছেন তারা। তবে সেই চমক কী ধরনের হবে, সেটি নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
দলটির মহানগর পর্যায়ের যোগদান সভায় সাধারণ কর্মী, পেশাজীবী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। কিন্তু বহুল আলোচিত কোনো রাজনৈতিক নেতার আনুষ্ঠানিক যোগদান না থাকায় অনুষ্ঠানের কেন্দ্রীয় আকর্ষণ অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। নতুন কর্মী অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সাংগঠনিক বিস্তারের বার্তা এলেও প্রত্যাশিত রাজনৈতিক চমকের অনুপস্থিতি আলোচনাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়।
এনসিপির এই আয়োজনকে ঘিরে গত কয়েকদিন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নাম ছিল সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলম। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলের সঙ্গেই বিভিন্ন সময়ে তার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা থাকায় তিনি নগর রাজনীতির পরিচিত মুখ। এনসিপিতে তার যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তাকে এনসিপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলেও গুঞ্জন ওঠে।
এ আলোচনার মধ্যেই গত ১৪ এপ্রিল এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ চট্টগ্রামে গিয়ে মোহাম্মদ মনজুর আলমের বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাতের পর গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। তবে সে সময় মনজুর আলম জানান, এটি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। এরপরও রাজনৈতিক মহলে জল্পনা থামেনি।
চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সমন্বয়কারী সদস্য রিদুয়ান হৃদয় কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা বড় বড় নেতারা যোগদান করবেন—এমন বিষয়কে কেন্দ্র করে আয়োজন করিনি। আমাদের কাছে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৮৫০টি আবেদন এসেছে। যাচাই-বাছাই শেষে থানা ও ওয়ার্ড পর্যায় মিলিয়ে গতকালের সভায় ৫০০-এর বেশি মানুষ যোগদান করেছেন। অনুষ্ঠানও যথেষ্ট সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাবেক মেয়র মনজুর আলমের বিষয়ে যেটি বলা হচ্ছে, আমাদের হাসনাত ভাইয়ের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রয়েছে। তিনি বাসায় এসেছেন, দাওয়াত ও খেয়েছেন। তবে তিনি এনসিপিতে যুক্ত হচ্ছেন কি না—এমন গুঞ্জন থাকতেই পারে।’
অন্যদিকে মোহাম্মদ মনজুর আলমের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় নন। ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক বিষয় নিয়েই সময় কাটাচ্ছেন। পরিবার থেকেও বলা হয়েছে, বয়স ও পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি আপাতত রাজনৈতিক ঝুঁকি এড়িয়ে চলছেন। তার এই অবস্থান নিয়েও নগর রাজনীতিতে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রামের এনসিপি নেতারা জানান, মনজুর আলমকে দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক এবং পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী করার প্রস্তাব নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। একটি সূত্র দাবি করেছে, মনজুর আলম যোগ দিলে নগর রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারত। এ কারণে বিষয়টি নিয়ে ভেতরে টানাপোড়েন তৈরি হয়। আবার কেউ কেউ বলেছেন, পারিবারিক চাপের কারণে তিনি যোগদান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গত কয়েকদিন তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় এবং যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া না পাওয়ায় আলোচনা আরও বাড়ে।
এনসিপির একাধিক সূত্রের ভাষ্য, তিনি অসুস্থ এবং বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছে। অন্যদিকে কেউ কেউ দাবি করছেন, তার সম্ভাব্য যোগদান রাজনৈতিক মেরূকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারত বলেই তাকে ঘিরে চাপ তৈরি হয়েছিল। তবে তার অবস্থান, অসুস্থতা কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে এনসিপির কয়েকজন নেতা তার বাসায় গিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখান থেকেও স্পষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। এরপর নগরজুড়ে আরও জোরালো হয় গুঞ্জন। কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, তিনি অপহরণের শিকার হয়েছেন কি না অথবা অন্য কোনো অঘটন ঘটেছে কি না। তবে এসবেরও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত বৃহস্পতিবার বিকেলে এনসিপি চট্টগ্রামে যোগদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তার আগের দিন থেকেই মোহাম্মদ মনজুর আলমের খোঁজ মিলছিল না। পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সূত্র ইঙ্গিত দেয়, তিনি আপাতত এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন না। তার পরও দলীয় নেতারা পুরোপুরি আশাহত নন বলে আলোচনা রয়েছে।
পরে বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা দেন তার ছেলে সরওয়ার উল আলম। তিনি জানান, তার বাবা বাসা বা অফিস কোথাও নেই এবং বর্তমানে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, ‘এ বয়সে এসে বাবা আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না। ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকের ঋণ এবং পারিবারিক অনুরোধ সবকিছু বিবেচনা করেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ তার এই বক্তব্যের পর অজ্ঞাতবাসের বিষয়টি কিছুটা পরিষ্কার হলেও রাজনৈতিক গুঞ্জন পুরোপুরি থামেনি।
এরপরও এনসিপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে মোহাম্মদ মনজুর আলমের নাম ও সম্ভাব্য উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। বিশেষ করে— দলের একটি ইফতার মাহফিলকে কেন্দ্র করে তার নাম নিয়ে নানা বিশ্লেষণ সামনে আসে। তবে কোনো পক্ষই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিষ্কার অবস্থান নেয়নি।
এদিকে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এনসিপির যোগদান সভাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত বড় রাজনৈতিক মুখের অনুপস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করেন অনেকে। দলীয় নেতাকর্মীরা অবশ্য এটিকে সাংগঠনিক বিস্তারের অংশ হিসেবে দেখছেন।
অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নতুন সদস্য ও বিভিন্ন পেশাজীবীকে ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক এবং ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এতে অংশ নেন। এ ছাড়া এলডিপি ও বিএনপির কিছু স্থানীয় পর্যায়ের কর্মীও যোগ দিয়েছেন বলে জানা যায়। ফলে অনুষ্ঠানে বহুমাত্রিক রাজনৈতিক উপস্থিতি দেখা গেলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ের আলোচিত মুখ না থাকায় তা পূর্ণতা পায়নি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের চট্টগ্রাম সফর নিয়েও তৈরি হয়েছে কিছু প্রশ্ন। ঘোষিত তালিকায় একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার উপস্থিতির কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে কয়েকজনকে দেখা যায়নি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামের উপস্থিতির কথা থাকলেও বিশেষ অতিথিদের মধ্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ, আব্দুল হান্নান মাসউদ এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম ছিল। শেষ পর্যন্ত আসিফ মাহমুদ ও আব্দুল হান্নান মাসউদ উপস্থিত ছিলেন না।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা মোহাম্মদ মনজুর আলম ২০১০ সালে বিএনপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। পরে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের কারণে আলোচনায় আসেন। একসময় তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের উপদেষ্টা পদেও ছিলেন। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাওয়ার বিষয়টিও তাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করে।
এনসিপির এই যোগদান অনুষ্ঠান নতুন কর্মী অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সাংগঠনিক বিস্তারের বার্তা দিলেও সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে ঘিরে তৈরি হওয়া গুঞ্জন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতি পুরো আয়োজনকে ভিন্ন মাত্রার রাজনৈতিক আলোচনায় নিয়ে গেছে। এখন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, মোহাম্মদ মনজুর আলম সত্যিই কোনো নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন কি না, নাকি এটি কেবল নতুন আরেকটি রাজনৈতিক গুঞ্জন।
মঞ্জুর আলমের বিষয়ে জানতে চাইলে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মুখ্য সংগঠক ও চট্টগ্রাম অঞ্চল তত্ত্বাবধায়ক জোবাইরুল হাসান আরিফ কালবেলাকে বলেন, ‘উনি তো আমাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করছেন। আমাদের পক্ষ থেকেও তার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। তবে মহানগরের অনেক নেতাকর্মী দলে যুক্ত হতে চাচ্ছেন। দ্রুত একটি ছোট পরিসরের প্রোগ্রাম করা হয়েছে। পরে বড় কর্মসূচিতে হয়তো তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন। সামনে আরও বড় প্রোগ্রাম করার পরিকল্পনাও রয়েছে আমাদের।’