ভালো কাজের প্রলোভনের শিকার হয়ে অনেক নারী অবৈধভাবে ভারতে পাড়ি জমায় দালাল বা মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে। বিভিন্ন পথ ঘুরে তাদের বড় অংশের গন্তব্য মহারাষ্ট্রের মুম্বাই। গত দুই বছরে বাংলাদেশি নারীদের মুম্বাইয়ে অবৈধভাবে যৌনকাজে বাধ্য করার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ থেকে মুম্বাইয়ে নারী পাচারের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
জানা গেছে, সীমান্তের যেসব অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই বা ছোট নালা বা খাল রয়েছে, সেসব অংশ দিয়ে বিশেষ করে নারী ও শিশু পাচার করা হয়। তাদের ভারতে ভালো চাকরি, বিয়ে, এমনকি টিকটকের ভিডিওর জন্য মডেল হওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়।
গত মাসে বোম্বে হাইকোর্ট পাচারের শিকার বাংলাদেশি এক নারীকে দেশে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৪ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী একটি রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।
২০০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য মতে, প্রতিবছর আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি নারী ও কিশোরী ভারতে পাচারের শিকার হয়েছে। এদের একটি বড় অংশকে মুম্বাই, গোয়া এবং অন্যান্য শহরের যৌনপল্লী ও অবৈধ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
কিছু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত পাচার হওয়া বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা দু-তিন লাখ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই সংখ্যা আনুমানিক। ২০১০ সালের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন দালালচক্র সক্রিয় হওয়ায় পাচারের হার বেড়ে যায়।
পাচার হওয়া ছাড়াও অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ পুরনো। কথিত বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মুম্বাই কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অভিযান চালাচ্ছে।
ভিসার শর্ত ভেঙে ভারতে সমস্যায় পড়ছে বাংলাদেশিদের অনেকে : জানা গেছে, পর্যটক ভিসা কার্যত বন্ধ থাকায় অনেকে মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে ভারত ভ্রমণ করছে। ভিসার ক্যাটাগরি অনুযায়ী শর্ত নির্দিষ্ট থাকে। যেমন মেডিক্যাল ভিসার আবেদনের সময় যে শহরের যে চিকিৎসককে দেখাবে, তার তথ্য-উপাত্ত জমা দিতে হয়। পরে তা অনুসরণ না করলে ভিসার শর্ত লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আবার অনেকে মেডিক্যাল ভিসায় ভারতে গিয়ে নির্দিষ্ট শহরের বাইরে গিয়ে পর্যটকদের মতো কাশ্মীর বা দিল্লির মতো জায়গায় ঘোরাঘুরি করতে গিয়েও ধরা পড়ছে। মাল্টিপল বা দীর্ঘমেয়াদি ভিসার ক্ষেত্রে একটানা কত দিন থাকা যাবে, তা-ও নির্দিষ্ট থাকে। সেটি মেনে না চললে বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিবন্ধন না করলেও শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অবৈধ অভিবাসন ও বাস্তবতা : ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি গত সপ্তাহে বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছেন, ভারতে অবৈধভাবে অবস্থানরত প্রায় তিন হাজার বাংলাদেশির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশকে করা অনুরোধ ঝুলে আছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু অনুরোধ পাঁচ বছরের পুরনো।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশের কাছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য পাঠানো দুই হাজার ৮৬০টিরও বেশি অনুরোধ এখনো ঝুলে আছে। সেগুলোর কিছু পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে এসব ব্যক্তির নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছি, যাতে তাদের সুষ্ঠুভাবে ফেরত পাঠানো যায়। আশা করি, বাংলাদেশ এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে, যাতে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।’
জানা গেছে, পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি খুব সহজ নয়। নাগরিকত্ব বিষয়ে শতভাগ নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশ কাউকে নাগরিক হিসেবে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনবে না। অনেক সময় ঠিকানাসংক্রান্ত তথ্য পুরোপুরি পাওয়া যায় না। নাম, পরিচয়, ঠিকানা অসম্পূর্ণ থাকে। এ ছাড়া ভারতে কারো সাজা হলে সাজার মেয়াদ শেষ না হলে দেশে ফেরার সুযোগ থাকে না।