দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গত কয়েক দিনে নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও গোপালগঞ্জে ধর্ষণের ঘটনায় চারজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। তবে এই গ্রেপ্তার ও আইনি প্রক্রিয়ার সমান্তরালে ফুটে উঠেছে এক ভয়ংকর সামাজিক বাস্তবতা। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও নারী ও শিশু নির্যাতনের লাগাম টানা সম্ভব হয়নি; বরং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই অপরাধের মাত্রা আরো বেড়েছে।
নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রীর অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার ঘটনায় অভিযুক্ত মাদরাসা শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১৪। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত এই শিক্ষক চার বছর আগে একটি মহিলা কওমি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ভুক্তভোগী শিশুটি তার নানার বাড়িতে থেকে ওই মাদরাসায় লেখাপড়া করত।
ময়মনসিংহের নান্দাইলে তিন বছরের শিশুকন্যার সামনে এক নারীকে (২৬) সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান আসামি কাজলকে (৩৫) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত সোমবার বিকেলে ফেনী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-১৪। গত ২০ এপ্রিল রাতে ভুক্তভোগী নারী পথ হারিয়ে নান্দাইল চৌরাস্তায় চলে এলে আসামিরা তাঁকে কৌশলে অটোরিকশায় তুলে নির্জন হাওরে নিয়ে রাতভর ধর্ষণ করে। এই ঘটনায় এ পর্যন্ত মোট তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে দুই বছরের সন্তানের সামনে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের দায়ে পলাতক আসামি হাফিজ মোল্যাকে (৩৫) রাজধানীর পল্লবী থেকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত ১৬ এপ্রিল রাতে ভুক্তভোগী তাঁর সন্তানকে প্রস্রাব করাতে ঘরের বাইরে বের হলে প্রতিবেশী হাফিজ তাঁকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে ধর্ষণ করে। ভুক্তভোগীর চিৎকারে স্বজনরা এগিয়ে এলে অভিযুক্ত পালিয়ে যায়। গ্রেপ্তার হাফিজকে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
সম্প্রতি মানিকগঞ্জের হাটিপাড়ায় সাত বছরের শিশু আতিকাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় কিশোর অপরাধী নাঈমের নাম আসতেই স্থানীয়রা উত্তেজিত হয়ে নাঈমের বাবা ও চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করে। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি গভীর সংকটের ইঙ্গিত। যখন মানুষ মনে করে আইনি প্রক্রিয়ায় বিচার পাওয়া অসম্ভব বা দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধী পার পেয়ে যাবে, তখনই তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় বা ‘মব জাস্টিস’-এর দিকে ঝোঁকে। এই প্রবণতা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি এটি বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের অনাস্থারও বহিঃপ্রকাশ।
পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা হ্রাসের কোনো লক্ষণ নেই। ২০২০ সালে ২২ হাজার ৫১৭টি মামলা নারী নির্যাতনের মামলা হয়। পরের বছর হয় ২২ হাজার ১৩৬টি মামলা, ২০২৩ সালে মামলা হয় ১৮ হাজার ৯৪১টি, ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি ও ২০২৫ সালে এই সংখ্যা পুনরায় লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৯৯টিতে।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য বলছে, গত তিন মাসে দেশে ১২৮ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৩৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩১ ও মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি ৬১ জন। এর মধ্যে গত মার্চ মাসে ছয় বছরের নিচে পাঁচজন শিশু ধর্ষণের শিকার। সাত থেকে ১২ বছরের ১৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার। তাদের মধ্যে একজন দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার। ১৩ থেকে ১৮ বছরের ১০ জন, ১৯ থেকে ২৪ বছরের চারজন, ২৫ থেকে ৩০ বছরের তিনজন, ৩০ বছরের বেশিসহ অন্যান্য ২৬ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
আসকের তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত চিত্র পুলিশের দাপ্তরিক সংখ্যার চেয়েও বেশি। গত মার্চ মাসেই পৃথক ঘটনায় ৬১ জন ধর্ষণের শিকার হলেও ৪৯ জন পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছে। বাকি ১৩ জন ও তার পরিবার মামলা করেনি। অনেক পরিবার আসামির হুমকির মুখে মামলা করার সাহস পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ মামলা নিতে অনীহা প্রকাশ করে অথবা প্রভাবশালী আসামিরা রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় জামিনে বেরিয়ে এসে ভুক্তভোগী পরিবারকে এলাকাছাড়া করার হুমকি দেয়। এসব কারণে মামলা করা হয় না। ফলে প্রকৃত চিত্র থেকে যায় আড়ালে।
মানবাধিকার সংস্থা এমএসএফের প্রতিবেদন অনুসারে, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে দেশে ১০২টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মার্চে ৪৮টি এবং এপ্রিলে ৫৪টি। দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে মার্চে ১৫টি এবং এপ্রিলে ১৪টি। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা মার্চে তিনটি এবং এপ্রিলে দুটি।
সংস্থটি জানায়, ২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাসে ৯১টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে এপ্রিল মাসে ৩৮টি এবং মে মাসে ৫৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এই দুই মাসে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে ৩১টি। এ হিসেবে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে।
মানবাধিকার কর্মীদের ধারণা, এসব মানবাধিকার সংস্থা গণমাধ্যম থেকেই তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু অনেক ধর্ষণের ঘটনা গণমাধ্যমেও উঠে আসে না।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ অনেক ধর্ষণের ঘটনায় মামলা না হওয়া এবং মামলা হলেও বিচার না পাওয়ার পরিস্থিতির জন্য আইনি জটিলতা এবং তদন্তের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করেছেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধর্ষণের মামলা আদালতে প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন। প্রায়ই দেখা যায়, বিচার চলাকালে সাক্ষী পাওয়া যায় না। এমনকি যে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন বা যে পুলিশ কর্মকর্তা তদন্ত করেন, তাঁরাও বদলিজনিত কারণে সময়মতো সাক্ষ্য দিতে আসেন না। ফলে মামলার মেরিট নষ্ট হয় এবং অপরাধী খালাস পেয়ে যায়।’
মাদরাসাগুলোতে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণের মতো অপরাধ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি আরো বলেন, ‘অজস্র মাদরাসা গড়ে উঠছে, কিন্তু সেগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা ধর্মীয় অজুহাত দিয়ে পার পাওয়ার প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘অপরাধ করে যখন কোনো ধর্মীয় লেবাসধারী ব্যক্তি বলেন, ‘শয়তানের প্ররোচনায়’ এমনটা হয়েছে, তা অত্যন্ত হাস্যকর। যাঁরা ধর্ম শিক্ষা দেন, তাঁদের তো শয়তানকে প্রতিরোধ করার শক্তি সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি হওয়ার কথা। শয়তানের অজুহাত দিয়ে এই ভয়াবহ অপরাধের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ের ধর্ষণ অপরাধীদের একটি বড় অংশ কিশোর এবং তরুণ। মানিকগঞ্জের আতিকা হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত নাঈমের বয়স মাত্র ১৫ বছর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর গ্যাং কালচার, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং পারিবারিক শিক্ষার অভাব কিশোরদের এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাষ্ট্র কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান এবং আইনি প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করে আছে। সামাজিক আন্দোলন বা প্রশাসনিক কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দেখা যাচ্ছে না। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্র যেভাবে সামাজিক প্রতিরোধে এগিয়ে আসে, বাংলাদেশে তার অভাব স্পষ্ট। প্রতিটি বড় ঘটনার পর কিছুকাল আলোচনা হলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু থিতিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৩ জনের বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তী সরকার বা বর্তমান বিএনপি সরকার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সমাজ আরো অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। কেবল অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, দ্রুততম সময়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা এবং মাদরাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ‘মব জাস্টিস’ ও সামাজিক অস্থিরতা রাষ্ট্রকে এক ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দেবে।
বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদরাসার কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে আমরা তদন্ত করি। প্রমাণিত হলে শাস্তিস্বরূপ তাঁদের আজীবনের জন্য চাকরিচ্যুত করা হয়।’ তিনি আরো জানান, যে ঘটনাগুলো আসে এর সব আবার সত্যিও হয় না। অনেক সময় শত্রুতা করেও ধর্ষণের অভিযোগ সাজানো হয়। তদন্তে গিয়ে আমরা এমন চিত্রও দেখতে পেয়েছি।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ধর্ষণের ঘটনায় কোনো মাদরাসার শিক্ষকের নাম যখন আসে, তাতে সাধারণভাবেই মানুষের সেন্টিমেন্টে লাগে। আমরা এ ধরনের ঘটনা রোধে মোটিভেশনাল কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বিচারহীনতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে ধর্ষণের মতো অপরাধগুলো ঘটছে।’