অর্থসংকটসহ নানা কারণে কয়েক বছর ধরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ দূরের কথা, গত অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমেছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। একই পথে হাঁটছে চলতি অর্থবছরও, এডিপি বাস্তবায়নে দেখা দিয়েছে বেহাল দশা। অর্থবছর শেষ হতে চললেও এখনো এডিপির দুই-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন বাকি রয়েছে। অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বরাদ্দ পাওয়া অর্থই খরচ করতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ এর মধ্যেই ইতিহাসের রেকর্ড সর্বোচ্চ আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিতে যাচ্ছে সরকার।
সবকিছু ছাপিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড করতে যাচ্ছে এবারের এডিপি বরাদ্দ। তবে এই বিশাল এডিপির বড় অংশই থাকছে প্রকল্পের বাইরে ‘থোক বরাদ্দ’ হিসেবে, এই থোক বরাদ্দেও হতে যাচ্ছে রেকর্ড। প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা না থাকলেও উন্নয়ন কর্মসূচিতে এমন আকাশচুম্বী বরাদ্দ রাখাকে অনেকে বলছেন, উচ্চাভিলাষী। অনেকের মতে, আবার এডিপির আকার বাড়িয়ে দেখানোর কৌশল।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের অধীনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। এডিপির আওতায় বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি বা ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ, আর বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণ সংগ্রহ করা হবে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বা ৩৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ অর্থ।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ছিল ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার। সে তুলনায় বেড়েছে ৬১ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের মাঝপথে এসে কাটছাঁট করে কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে আগামী অর্থবছর বরাদ্দ বাড়বে ৯১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। কিন্তু এডিপি বাস্তবায়নে বিরাজ করছে উল্টো চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে এমন বরাদ্দ উচ্চাভিলাষী ছাড়া কিছুই নয়।
এদিকে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপির কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি বেশিরভাগ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। ওই বছর বরাদ্দের মাত্র ৬৭.৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়, যা ছিল ইতিহাসের সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন। ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকার মধ্যে অর্থবছর শেষে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সবগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে খরচ করতে পেরেছিল মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপির এক-তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন হয়নি। এর আগে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৯-২০ অর্থবছরে। কারোনাকালীন ওই অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার ছিল ৮০.৩৯ শতাংশ।
তারই ধারাবাহিকতায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন চলছে মন্থর গতিতে। অর্থ কাটছাঁট ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়ার দাবি করে অনেক প্রকল্প বন্ধও রাখে অন্তর্বর্তী সরকার। তার প্রভাব পড়ে এডিপিতে; দুই দশকের মধ্যে তলানিতে নামে বাস্তবায়ন হার। অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিলেও এডিপিতে তার প্রভাব এখনো রয়ে গেছে। অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। বাকি তিন মাসে বাস্তবায়ন করতে হবে ৬৩ দশমিক ৮১ শতাংশ, যা একেবারেই অসম্ভব।
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় এসে অন্তর্বর্তী সরকার গত জুনে তার প্রথম বাজেট দেয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন নীতিতে কাটছাঁট করে চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এডিপি নির্ধারণ করা হয়। জানুয়ারিতে এসে কাটছাঁটের পর সংশোধিত এডিপির আকার দাঁড়ায় ২ লাখ কোটি টাকা। সেখান থেকে ৯ মাসে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলে খরচ করতে পেরেছে মাত্র ৭৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। সেই হিসেবে তিন মাসে অর্থ খরচের টার্গেট ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৯ মে নতুন এডিপি উঠতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠেয় সভায় সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর পরই এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যত দ্রুত সম্ভব উপস্থাপন করা হবে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে। সেখানে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। ওই সভায় মিলবে নতুন এডিপির চূড়ান্ত অনুমোদন।
জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপির মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ রাখা হচ্ছে ‘থোক’ ও ‘বিশেষ বরাদ্দ’ হিসেবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের সুবিধার্থে ১ লাখ ৭ হাজার ২০১ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে আরও ৯ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ৬১ শতাংশ।
প্রস্তাবিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, ৩৬ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। স্থানীয় অবকাঠামো ও সেবা খাতে অগ্রাধিকার অব্যাহত রাখতেই এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরপর রয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, যার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৩১ হাজার ৬৫ কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ পেয়েছে ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা, আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারের অব্যাহত মনোযোগের ইঙ্গিত দেয়। জ্বালানি খাতে বিদ্যুৎ বিভাগ পেয়েছে ১৯ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগ পেয়েছে ১৭ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। তালিকাভুক্ত বিভাগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বরাদ্দ পেয়েছে নৌপরিবহন খাত, এই খাতে বরাদ্দ ১০ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা। সামগ্রিকভাবে বরাদ্দের ধরনে অবকাঠামো, জ্বালানি ও সামাজিক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল খাত ও প্রতিষ্ঠানগুলোতেই রাখা হচ্ছে প্রকল্পের বাইরের বিপুল থোক বরাদ্দ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রস্তাবিত বরাদ্দের প্রায় ৮০ শতাংশই থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ তাদের প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দই পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে না। ফলে থোক বরাদ্দও অব্যবহৃত থেকে যেতে পারে এবং এটি কেবল এডিপির আকার বাড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে। প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বল হিসেবে পরিচিত স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে মোট ২৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ২০ হাজার ৮০০ কোটি টাকাই রাখা হয়েছে ‘থোক’ বরাদ্দ হিসেবে, যা মোট বরাদ্দের প্রায় ৭৮ শতাংশ। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগে থোক বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীলতা সবচেয়ে বেশি। এ বিভাগের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৮ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক হিসেবে। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের ৮০ শতাংশের বেশি রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ। অথচ চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের এই দুই বিভাগ কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নেই হিমশিম খাচ্ছে, ৯ মাসে তাদের জন্য বরাদ্দের ৫ ভাগের এক ভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে।
দেশের আরেক অদক্ষ খাত শিক্ষায় শুধু থোক বরাদ্দই থাকছে সাড়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে এ খাতের অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর জন্য এডিপি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১৭ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রস্তাবিত ২১ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকার মধ্যে ১৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একইভাবে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকার মধ্যে থোক বরাদ্দ রয়েছে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ হাজার ১২২ কোটি টাকা, এর মধ্যে থোক হিসাবে রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি বরাদ্দই থোক। কৃষি খাতে তুলনামূলক কম, ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বা মোট বরাদ্দের ২৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়গুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত নতুন প্রকল্পের চাহিদা না পাওয়ায় আগামী অর্থবছরের এডিপিতে অস্বাভাবিক হারে থোক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে, যা অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। সাধারণত এ বরাদ্দ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সেই হিসাবে এবার থোক বরাদ্দ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা কাটেনি, বরং অনেক প্রতিষ্ঠান বরাদ্দকৃত অর্থই খরচ করতে পারছে না। প্রকল্পের বাস্তব চাহিদা না থাকলেও এডিপির আকার বড় দেখানোর কৌশল হিসেবেই এই অস্বাভাবিক বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী কালবেলাকে বলেন, দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বাস্তবে আরও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু শুধু এডিপির আকার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অপচয় নিয়ন্ত্রণ ও সরকারি ব্যয়ের গুণগতমান নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই শুধু এডিপি আকার না বাড়িয়ে বরং প্রকল্পে দুর্নীতি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অপচয় কমিয়ে বিদ্যমান অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।
তিনি বলেন, বিপুল থোক বরাদ্দ রেখে কাগুজে আকার বড় করা হলেও অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। বিশেষ করে এডিপিতে বড় অঙ্কের ‘থোক’ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা নির্দিষ্ট প্রকল্পের অধীনে না থাকায় অপচয়ের ঝুঁকি বাড়ায়। সঠিক তদারকির মাধ্যমে অপচয় ও দুর্নীতি রোধ করা না গেলে কেবল বরাদ্দ বাড়িয়ে উন্নয়নের সুফল পাওয়া সম্ভব হবে না। বরং প্রকল্পে দুর্নীতি, অতিরিক্ত ব্যয় ও অপচয় কমিয়ে বিদ্যমান অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।