দেশবিরোধী চুক্তির সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক আনিস আলমগীর। তিনি বলেন, ‘ওই চুক্তি বাংলাদেশের সার্বভৌম, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বাণিজ্যিক স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।’ বুধবার (৬ মে) ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি এ দাবি জানান।
পোস্টে আনিস আলমগীর লেখেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে পত্রিকাগুলোর কোনো পর্যালোচনা নেই বললেই চলে।
১. নীতি-নির্ধারণে সার্বভৌমত্ব হারানো (ধারা ৪.১ ও ৪.২)। চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বিধি-নিষেধ আরোপ করে, তবে বাংলাদেশকে বাধ্যতামূলকভাবে একই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে, তা এখন থেকে হোয়াইট হাউস ঠিক করে দেবে।
২. তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে বাধা (ধারা ৩.২ ও ৪.৩)। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের (যেমন- চীন বা রাশিয়া) সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
এখানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় রয়েছে আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। ধারা ৪.৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না।
৩. শুল্ক ও রাজস্ব ক্ষতি (সেকশন ১ এবং অ্যানেক্স ১)। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক (Customs Duty), সম্পূরক শুল্ক (SD) এবং রেগুলেটরি ডিউটি (RD) কমানোর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় শুল্ক থেকে বড় রাজস্ব পায়। মার্কিন পণ্যকে এই সুবিধা দিলে দেশীয় শিল্প যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধস নামবে।
৪. কৃষি খাতে অসম প্রতিযোগিতা (ধারা ২.৩ ও ২.৫)। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যকে ‘নন-ডিসক্রিমিনেটরি’ বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৃষকদের বিশাল ভর্তুকি দেয়। তাদের কম দামি কৃষিপণ্য (যেমন- ভুট্টা, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য) বিনা বাধায় বাংলাদেশে ঢুকলে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না এবং বাজার হারাবে।
৫. প্রযুক্তির গোপনীয়তা হারানো (ধারা ৩.৪)। বাংলাদেশ কোনো মার্কিন কম্পানিকে তাদের সোর্স কোড বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত দিতে পারবে না। এর ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি বা ডেটা সিকিউরিটি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি কম্পানিগুলো চাইলে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের ডেটা অবাধে দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে (ধারা ৩.২)।
৬. ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ও ওষুধের দাম (ধারা ২.৬)। মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে আমাদের ওষুধশিল্প (Pharmaceuticals) বড় ধাক্কা খাবে। বর্তমানে আমরা জেনেরিক ওষুধ তৈরি করি বলে কম দামে মানুষ ওষুধ পায়। পেটেন্ট আইন কঠোর হলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
৭. শ্রম ও পরিবেশগত অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা (ধারা ২.৯ ও ২.১০)।
শ্রম অধিকার এবং পরিবেশ রক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্র যখন-তখন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর বিধি-নিষেধ দিতে পারবে। বিশেষ করে ‘ফোর্সড লেবার’ বা শ্রম আইনের অজুহাতে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি স্থায়ী আইনি হাতিয়ার পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
৮. ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স বাতিলের চাপ (ধারা ৩.১)। বাংলাদেশ গুগল, ফেসবুক বা অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টদের ওপর কোনো ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স’ বসাতে পারবে না।
এর ফলে এই কম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে নিয়ে যাবে, কিন্তু বাংলাদেশ সেখান থেকে কোনো ট্যাক্স পাবে না। এই চুক্তি ধারাগুলো পড়ে অবুঝ মানুষ বুঝবে চুক্তিটি ‘একতরফা’। এখানে বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধার বদলে নিজের নীতি-নির্ধারণের ক্ষমতা, বাজার সুরক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বকীয়তা বন্ধক রাখছে। স্বল্প মেয়াদে কিছু সুবিধা মনে হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। ইউনূসসহ দেশবিরোধী এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের মুখোমুখি করতে হবে।