গতকাল ৫ মে চর্চা নামক একটি ডিজিটাল প্লাটফর্মের ফেসবুক পেজে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। ভিডিওটির ক্যাপশন ছিল, “শাপলা চত্বরে মৃত্যু কতজনের? যা বলেছিলেন বিবিসির সাবেক সাংবাদিক।”
২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের সেই ভিডিওতে সাবির মুস্তাফা দাবি করেন, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতের অভিযানে নির্দিষ্ট করে শাপলা চত্বরে কোনো হত্যাযজ্ঞ ঘটেনি এবং সেখানে কোনো মৃত্যু হয়নি; এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে কেউ আহতও হয়নি। তার ভাষ্যে, সে রাতে শাপলায় ছিলেন বিবিসির দুই প্রতিবেদকসহ অনেক সাংবাদিক ও টিভি ক্রু, কিন্তু তাঁদের কারও প্রতিবেদনেই সেই সময়কার কোনো হত্যাকাণ্ড বা মৃত্যুর উল্লেখ নেই।
ভিডিওতে তিনি বলেন, "ওখানে বিবিসির রিপোর্টিংয়ে কোনো দুর্বলতা ছিল না, এটা আমি বারবার বলবো। কারণ আমাদের দুইজন রিপোর্টার ছিল চাক্ষুষ। ওখানে অনেক সাংবাদিক ছিল, অনেক টিভি ক্রু ছিল। এদের কেউ কি দেখেছে কোনো হত্যাযজ্ঞ সেই রাতে শাপলা চত্বরে? আমার তো মনে হয় না। আমার তো মনে হয় প্রথম আলোর রিপোর্টার ছিল বেশ কয়েকজন, তাদের রিপোর্ট আমি পড়েছি। কোনো হত্যাযজ্ঞের, কোনো মৃত্যুর খবর নেই।”
“আচ্ছা, তারপরে আপনার 'অধিকার' একটা রিপোর্ট করলো ৬১ জন মারা যাওয়ার খবর দিলো। 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' একটা রিপোর্ট করলো যেখানে ৫৮ জন মারা যাওয়ার খবর দিলো। আমরা দুইটাই কাভার করেছি কিন্তু আমরা যখন এদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে— এই যে আপনাদের তালিকা, মৃত্যুর তালিকা, এদের মধ্যে কয়জন শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে মারা গেছে? তারা কিন্তু বলেছেন যে, এই তালিকায় কেউ নাই। অধিকারের তালিকাতেও কেউ নাই যে শাপলা চত্বরে ওই রাতের অভিযানে মারা গেছে।”
একই ভিডিও আজ ৬ মে আবারও ‘চরচা’ তাদের ফেসবুক পেইজে ভিন্ন ফটোকার্ডে আবারও শেয়ার করেছে।
এই ভিডিও চরচা প্রথম প্রকাশ করেছিল চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি তারিখে। চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসানের সাথে সাবির মুস্তাফার দীর্ঘ আলোচনার অংশ বিশেষ এই ভিডিওটি। পুরো ভিডিও দেখুন প্রতিষ্ঠানটির ইউটিউব চ্যানেলে।
আগেও সাবির মুস্তাফা একই বক্তব্য দিয়েছেন:
অবশ্য সাবির মুস্তাফা শুধু চরচার সাথে আলাপে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন তা নয়। ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর বেসরকারি টিভি চ্যানেল আই এর এক অনুষ্ঠানে ৫ মে রাতে কোন হত্যা বা রক্তপাতের ঘটনা না ঘটার দাবি করেছেন। চ্যানেল আইয়ের ইউটিউব চ্যানেলে "শাপলা গণহ/ত্যা নিয়ে যা বললেন সাবেক বিবিসি বাংলার প্রধান" শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়।
তবে অনুষ্ঠানটির সম্পূর্ণ ভিডিও খুঁজতে গেলে দেখা যায়, “দীপ্তি চৌধুরীর স্ট্রেইট কাট প্রশ্নে বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা-এর উত্তর" শিরোনামে সেই প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানটি চ্যানেল আইয়ের ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া গেলেও শাপলা চত্বর নিয়ে করা সাবির মুস্তাফার মন্তব্যের অংশটি সেখানে নেই।
চ্যানেল আইয়ের সেই পোগ্রামে তিনি বলেন, “শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। অনেকে একে 'গণহত্যা' বলে থাকেন। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন ছিল, আসলেও কি সেখানে গণহত্যা হয়েছিল? ওই রাতে আমাদের সংবাদদদাতা কাদির কল্লোল রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত শাপলা চত্বরেই ছিলেন। আমি লন্ডন থেকে সার্বক্ষণিকভাবে তার সাথে যোগাযোগ রাখছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন গুজব ছড়াচ্ছিল যে শত শত মানুষ মারা গেছে এবং লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে, সেখানে কোনো 'লাইভ ফায়ারিং' হয়নি এবং তিনি কোনো মৃত্যুর ঘটনা দেখেননি। এমনকি দেয়ালে গুলির চিহ্ন বা রাস্তায় রক্তের দাগও ছিল না। বিবিসি যা সরেজমিনে দেখেছে এবং যাচাই করেছে, সেটাই প্রচার করেছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক চাপে বা গুজবের ভিত্তিতে খবর প্রচার করিনি।"
সাবির মুস্তাফার দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই
চরচা এবং চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্য মিলিয়ে সাবির মুস্তাফার প্রধান দাবিগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেছে দ্য ডিসেন্ট।
উভয় ভিডিওতে সাবিরের উল্লেখযোগ্য তিনটি দাবি হলো:
১. শাপলা চত্বরে রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কেউ মারা যায়নি। (দিনে মারা যাওয়া চারজনের লাশ ছাড়া)।
২. রাতের অভিযানে পুলিশের গুলিতে কেউ আহত হননি। তার ভাষায়, “৫০ হাজার লোক যদি হুরহুর করে দৌড়াতে শুরু করে অনেকেই পড়ে যাবে, হোচট খাবে হাঁটু কনুই মাথা অনেক অনেকভাবেই আহত হতে পারেন। তার মানে না যে তার গুলিতে আহত হয়েছে।”
৩. ‘অধিকার’ ৬১ জন এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ৫৮ জন নিহতের যে তালিকা করেছে, সেই মৃত্যুর তালিকায় শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে নিহত কারো কথা উল্লেখ করা হয়নি। তার ভাষায়, ‘এই যে আপনাদের তালিকা, মৃত্যুর তালিকা, এদের মধ্যে কয়জন শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে মারা গেছে?… তারা কিন্তু বলছেন যে এই তালিকায় কেউ নাই”।
সাবিরের প্রথম দাবি অসত্য: মিডিয়ার রিপোর্টে অভিযানে মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে
চর্চা এবং তার আগে চ্যানেল আইয়ে দেয়া সাবির মুস্তাফার বক্তব্যের মূলকথা ছিল, ২০১৩ সালের ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে নির্দিষ্ট করে যৌথবাহিনীর হামলায় নতুন করে গুলিবিদ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি। তিনি বলেন, “ওই রাতে আমাদের সংবাদদদাতা কাদির কল্লোল রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত শাপলা চত্বরেই ছিলেন। আমি লন্ডন থেকে সার্বক্ষণিকভাবে তার সাথে যোগাযোগ রাখছিলাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন গুজব ছড়াচ্ছিল যে শত শত মানুষ মারা গেছে এবং লাশ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে, সেখানে কোনো 'লাইভ ফায়ারিং' হয়নি এবং তিনি কোনো মৃত্যুর ঘটনা দেখেননি। এমনকি দেয়ালে গুলির চিহ্ন বা রাস্তায় রক্তের দাগও ছিল না।”
তার দাবি মতে, দিনের বেলায় নিহত হওয়া চারটি লাশ ছাড়া রাতে শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নতুন করে কেউ মারা যায়নি।
কিন্তু সেসময়ের একাধিক সংবাদমাধ্যমে শাপলা চত্বর অভিযানের পর গুলিবিদ্ধ ব্যক্তি বা লাশের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
যেমন, সাঁড়াশি অভিযানে ফাঁকা মতিঝিল শিরোনামে বিডিনিউজ২৪ ডটকমের এক প্রতিবেদন যা ৬ মে সকাল ১১টায় আপডেট হয় সেখানে বলা হয়েছে, “মধ্যরাতে মতিঝিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর সাধারণ জনতা পাঁচজনকে এবং পুলিশ দুজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা ওই সাতজনকে মৃত ঘোষণা করেন। সর্বশেষ, সোমবার ভোরে রাজারবাগ এলাকায় একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন।"

পড়ে আছে কয়েকটি লাশ। Graphic content: Image published for journalistic documentation. Viewer discretion advised.
যদি আগের দিনের ৪ জনের লাশ বাদ দেয়া হয় তবু পুলিশ ছাড়া আরও ৩ জনের লাশ অভিযানস্থল থেকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে।
এছাড়া বিডিনিউজ২৪ ডটকম ১৫ মিনিটের দক্ষযজ্ঞ শিরোনামের আরেকটি প্রতিবেদনে আগের রাতের অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে, “এদিকে শাপলা চত্বরে পৌছার পর সোনালী ব্যাংকের সামনে শিশু ও কিশোরসহ একদল মানুষ অবস্থান করছিলো। পুলিশ সেখানে ফায়ার করতে করতে এগিয়ে যায়। সেখানে পুলিশী অভিযান শেষ হওয়ার পর সিড়িতে ৬জনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। যাদের প্রায় সবার পোশাকই রক্ত মাখা দেখা যায়। এদের মধ্যে ১৪-১৫ বছরের একটি শিশুকেও দেখা যায়। তার নিথর হাত ধরে পুলিশ জানায়, সে আর বেঁচে নেই।"
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার এর রিপোর্টে যে ৫ কেন্দ্রিক ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় নিহত হওয়া ৬১ জনের যে তালিকা করা হয়েছে সেই তালিকায় ১৫ বছরের এক কিশোরের লাশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার নাম মোহাম্মদ মুক্তার (বাড়ি নরসিংদী) এবং নিহত হওয়ার ঘটনাস্থল শাপলা চত্তর উল্লেখ করা হয়েছে।

পড়ে আছে রক্তাক্ত একজনের লাশ। Graphic content: Image published for journalistic documentation. Viewer discretion advised.
বিডিনিউজের প্রতিবেদনের পরের অংশে আগের দিন দুপুরে (সম্ভবত) নিহত হওয়া চার লাশের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। বিডিনিউজ লিখেছে, “রাত তিনটার দিকে শাপলা চত্বরে পৌছার পরই শাপলার পশ্চিম-উত্তর কোণে প্লাস্টিকে ঢাকা তিনটি লাশ দেখা যায়। লাশগুলো দেখেই মনে হচ্ছিল, এদের মৃত্যু অন্তত কয়েক ঘণ্টা পূর্বে হয়েছে। ঘণ্টা খানেক পর এখানে আরো একটি লাশ দেখা যায়।"
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনেও সোনালী ব্যাংক ভবনের বারান্দায় ১২ বছর বয়সী এক কিশোরের লাশের উল্লেখ পাওয়া যায়। ডেইলি স্টার এর প্রতিবেদনের ভাষা হচ্ছে, “The bodies of four people were found kept in a cot in front of Shapla Chattar while a 12-year-old boy was seen lying dead on the corridor of Sonali Bank building.”
অর্থাৎ, এখানে ৪টি লাশের (যেগুলো আগের দিন দুপুরের হওয়ার সম্ভাবনা আছে) পাশাপাশি সোনালী ব্যাংক ভবনের করিডোরে এক কিশোরের লাশ দেখা গেছে। এই বিবরণ বিডিনিউজের বর্ণনার সাথে মিলছে (যদিও কিশোরের বয়স অনুমান করতে কিছু পার্থক্য হয়েছে)।
"গভীর রাতের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান: পুলিশ ও বুয়েটের ছাত্রসহ নিহত ১২" শিরোনামে ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র হাসান (২২) নিহত হয়েছেন মতিঝিল শাপলা চত্বরের কাছে সোনালী ব্যাংক ভবনের সামনে। তার পিতার নাম মামুন হাসান। বাড়ি নওগাঁয়। বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের তিনি আবাসিক ছাত্র। যাত্রাবাড়ীর পূর্ব কাজলার কাপড় ব্যবসায়ী কাজী রাকিবুল হক (৪০) নিহত হয়েছেন পুলিশের গুলিতে। সোমবার সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে নিহতের লাশ শনাক্ত করেন তার স্ত্রী সালমা বেগম ও ভাই কাজী শহিদুল হক। কুমিল্লার দাউদকান্দির থোড়খোলা পূর্বপাড়া জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা ইউনুসের (৩৫) লাশ শনাক্ত করেন তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানের নতুন ভাষানচর গ্রামের দ্বীন ইসলামের (৩৫) লাশ শনাক্ত করেন তার স্বজন আলাউদ্দিন। ফরিদপুরের কানারী টেকের হাট গ্রামের আলামিনের (৩০) লাশ শনাক্ত করেন তার বাবা আবদুল জব্বার শেখ। বাকি দুই জনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।"
ইত্তেফাকের প্রতিবেদক জামিল আহসান সিপুর করা এই প্রতিবেদনে আলাদা করে আগের দিন (৫ মে) দুপুর থেকে রাত সাড়ে ৮ পর্যন্ত পল্টন, দৈনিক বাংলা ও বিজয়নগর এলাকায় সংঘর্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। “এ নিয়ে সরকারি হিসাবে রবিবার দুপুর থেকে সোমবার ভোর পর্যন্ত হামলা, সংঘর্ষ ও গুলিতে ১২ জন নিহত হয়েছেন।” বলেছে ইত্তেফাক।
"রুদ্ধশ্বাস ২০ মিনিট" শিরোনামে সমকালের খবরেও বলা হয়, “অভিযান শেষে গুরুতর আহত অবস্থায় অর্ধশতাধিক হেফাজতের কর্মীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার পর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। এ ছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন।"
এই প্রতিবেদনেও আলাদা করে চত্বরের নিকটে পরে থাকা চার লাশের কথাও এসেছে।

গুলীবিদ্ধ অবস্থায় কয়েকজন হেফাজত কর্মী. Graphic content: Image published for journalistic documentation. Viewer discretion advised.
৮ মে প্রথম আলোতে মৃতের সংখ্যা নিয়ে তৎকালীন র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, “অভিযানে পুলিশের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন। আর হেফাজতের মঞ্চের পাশ থেকে চারটি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আর কোনো মৃতদেহ সেখানে পাওয়া যায়নি। তবে আহত দু-একজন পরে হাসপাতালে মারা গেলেও যেতে পারেন।”
সাবিরের দ্বিতীয় দাবিও অসত্য: মিডিয়ার রিপোর্টে অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতের খবর প্রকাশিত হয়েছে
উপরের বর্ণনাতেই বিডিনিউজ এবং সমকালের প্রতিবেদনে অভিযানে আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছে; যাদের মধ্যে একাধিকজন পরে মারা গেছেন।
যেমন, সমকালের ৬ মের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “অভিযান শেষে গুরুতর আহত অবস্থায় অর্ধশতাধিক হেফাজতের কর্মীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে হাসপাতালে নেওয়ার পর পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফাঁড়ির পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। এ ছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন।"
বিডিনিউজের প্রতিবেদনের ভাষা, “সেখানে পুলিশী অভিযান শেষ হওয়ার পর সিড়িতে ৬জনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। যাদের প্রায় সবার পোশাকই রক্ত মাখা দেখা যায়।”
৭ মে জনকণ্ঠ প্রথম পাতায় “গভীর রাতের শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান” শিরোনামের খবরে লেখা হয়েছে, “হেফাজত কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে গিয়ে পুলিশের গুিল ও রাবার বুলেটে বহু হেফাজত কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।”

৬ মে ডেইলি স্টার প্রথম পাতায় “Witness Account: How flush-out took place” শিরোনামের খবরে লেখা হয়েছে, "Some of them suffered serious injuries as rubber bullets hit their legs, faces, chests and hands."
"From FBCCI building to Dutch Bangla Bank branch and an ATM booth at Shapla Chattar intersection, The Daily Star correspondents found another seven or eight injured Hefajat-e Islam activists lying on roads and in front of an ATM booth."
"Rab and police members were seen giving water to an injured."
"Another Rab member put some plastic sheet under the head of another injured, who suffered injuries on his face, trying to comfort him."
"Some police and Rab members were also seen helping the wounded get down from roofs of different structures."
এছাড়া দ্য ডিসেন্ট ৫ মে ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক ফটো সাংবাদিকদের কাছ থেকে বেশ কিছু ছবি সংগ্রহ করেছে যেগুলোতে গুলিবিদ্ধ আহত অনেককে দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন গুলিবিদ্ধ আহত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থার ছবিও সংগ্রহ করা হয়েছে। (এ নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে দ্য ডিসেন্ট।)

Graphic content: Image published for journalistic documentation. Viewer discretion advised.
সাবিরের তৃতীয় দাবিও অসত্য: অধিকার এবং HRW এর রিপোর্টে শাপলা চত্তরে নিহতের ঘটনার বর্ণনা আছে
চরচা প্লাটফর্মে দেয়া বক্তব্যে সাবির মুস্তাফা বলেন, মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ৬১ জন এবং ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ৫৮ জন নিহতের যে তালিকা করেছে, সেই মৃত্যুর তালিকায় শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে নিহত ‘কেউ নাই’।
তার ভাষায়, ‘এই যে আপনাদের তালিকা, মৃত্যুর তালিকা, এদের মধ্যে কয়জন শাপলা চত্বরে সেই রাতের পুলিশ অভিযানে মারা গেছে?… তারা কিন্তু বলছেন যে এই তালিকায় কেউ নাই”।
কিন্তু দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা যায়, অধিকারের রিপোর্টে নিহতের ঘটনাস্থল হিসেবে ‘শাপলা চত্বর’ এর কথা উল্লেখ আছে অন্তত চারজনের ক্ষেত্রে। এদের মধ্যে একজনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ৫ মে রাতে শাপলা চত্বরে আহত হয়ে পরে ১৪ মে মারা যান।
অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী, ক্রমিক নং ৮-এ কাজী মোহাম্মদ রাকিবুল হক (Kazi Mohammad Rakibul Haq) এর নাম। তিনি ৫ মে ২০১৩ রাতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
এরপর ক্রমিক নং ১৫, তার নাম মোহাম্মদ আকবর হোসেন (Mohammad Akbar Hossain) এবং তিনি ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে যোগ দেন এবং রাত ১১টায় তার চাচাতো ভাইকে জানান যে তিনি সংঘাতের কারণে শাপলা চত্বর থেকে বের হতে পারছেন না। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন এবং মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান (পরিবার ৮ মে মৃত্যুর খবর জানতে পারে)।
এরপর ক্রমিক নং ৭০ এর মুক্তার মিয়া, তিনি ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশে যোগ দিতে গিয়েছিলেন এবং ৫ মে ২০১৩ রাতে বুকে ও ঘাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
ওইদিন আহত হয়ে পরে মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম মো. নজরুল ইসলাম, ক্রমিক নং ১০। তিনি ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে আহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।

Graphic content: Image published for journalistic documentation. Viewer discretion advised. | যুগান্তর
এর বাইরে ৫ মে শাপলা চত্বরে নিহত হয়েছে কিন্তু অধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই; ঠিক ঘটনাটি দিনে ঘটেছে না রাতে। যেমন, ক্রমিক নং ২ এর মো. এশা হক আলী (Md. Esha Huq Ali)। তিনি ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। আর রয়েছেন ক্রমিক নং ১৬, নাম মো. ইব্রাহিম খলিল, তিনি ৫ মে ২০১৩ তারিখে ঢাকার শাপলা চত্বর, মতিঝিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
একইভাবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এই রিপোর্ট বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা কেন্দ্র করে সংগঠিত বিভিন্ন বিক্ষোভে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার একটি বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রকাশ করে ১ আগষ্ট ২০১৩ সালে।
সাবির মুস্তাফার বক্তব্য অনুযায়ী এইচআরডব্লিউ এ শাপলা চত্বরের ঘটনার ৫ই ও ৬ই মে এই দুইদিনে ৫৮ জন মারা যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়, দাবিটি সত্য। কিন্তু সেখানে রাতে অভিযানে যথেষ্ট এবং অপ্রয়োজিনীয় শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছিল বলা হয়। এবং সাংবাদিকের বরাতে অভিযানে একাধিক ব্যক্তির নিহত হওয়ার ঘটনাও প্রকাশ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
যেমন, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “তবে সাংবাদিক এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভিডিও ফুটেজ ও বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বিচারে এবং অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করেছিল। অনেক প্রত্যক্ষদর্শীই মৃতদেহ দেখার কথা জানিয়েছেন। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা গুরুতর আহত বিক্ষোভকারীদের মারধর করছেন। একজন সাংবাদিক সে সময় মাটিতে পড়ে থাকা বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাড়ি (পালস) পরীক্ষা করার অভিজ্ঞতার কথা জানান:
“পুলিশ যখন গুলি শুরু করল, তখন আমরা রাস্তার এক পাশে সরে গিয়ে একটি ভবনে আশ্রয় নিলাম। আমরা কোনো সতর্কতা সংকেত শুনতে পাইনি, শুধু প্রচুর গুলির শব্দ আসছিল। রাত ৩টার দিকে আমি সোনালী ব্যাংকের ভেতর গিয়ে ১৫-২০টি নিথর দেহ দেখতে পাই। আমি তাদের মধ্যে কয়েকজনের শ্বাস-প্রশ্বাস পরীক্ষা করি এবং তারা জীবিত না মৃত তা বোঝার জন্য শরীর ধরে নাড়া দেই। অন্তত ১০ জন মারা গিয়েছিলেন। এরপর আমি সিনেমা হল এবং এলিকো অফিসের দিকে এগিয়ে যাই। সেখানে তখনও কিছু সংঘর্ষ চলছিল। একজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছিলেন, যার ফলে সেখানে আশ্রয় নেওয়া বিক্ষোভকারীদের প্রতি পুলিশ আরও মারমুখী হয়ে উঠেছিল। সেখানে আমি আরও ২-৩টি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখি।”
অর্থাৎ এখানেও অভিযানের রাতে অন্তত ১২ থেকে ১৫ জনের মৃত্যুর কথা ঘটনাস্থলে হাজির থাকা সাংবাদিকদের বরাতে উদ্ধৃত করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠানে তিনি এসব দাবির পক্ষে বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা কাদির কল্লোল এর নাম উল্লেখ করেন যিনি মূলত বিবিসি বাংলার হয়ে সেদিন শাপলা চত্বরে অবস্থান করছিলেন। তার বরাতে সাবির বলেন, “কিন্তু আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন যে, সেখানে কোনো 'লাইভ ফায়ারিং' হয়নি এবং তিনি কোনো মৃত্যুর ঘটনা দেখেননি"।
এ ব্যাপারে দ্য ডিসেন্ট কথা বলে সাংবাদিক কাদিরের সাথে। প্রশ্ন করা হয়, আপনার বরাতে ঘটনাস্থলে ‘লাইভ ফায়ারিং’ এবং কারো মৃত্যুর ঘটনা না ঘটার যে তথ্য দিয়েছেন সেটি আপনি নিশ্চিত করছেন কিনা?
কাদির কল্লোল জানান, তিনি বিবিসি বাংলায় এখনো কর্মরত আছেন, ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কারণে এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে পারবেন না। তিনি সাবির মুস্তাফার দাবির ব্যাপারে তার কাছেই জানার পরামর্শ দেন।
কাদির কল্লোল আরও বলেন, “তিনি (সাবির মুস্তাফা) এখন আর বিবিসিতে কাজ করেন না। ফলে এসব বিষয়ে তিনি এভাবে বলতে পারেন না।”
সাবির মুস্তাফার মিথ্যাচার যখন আওয়ামী লীগের ক্যাম্পেইনের হাতিয়ার
উল্লেখ্য গতকাল ৫ই মে সাবির মুস্তাফার চ্যানেল আইয়ে দেয়া সেই বক্তব্য শেয়ার করা হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অফিশিয়াল পেইজেও। পোস্টটির ক্যাপশন ছিল, “শাপলা চত্বরে মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত কোনো লাশ দেখেনি বিবিসি। — সাবির মোস্তফা"। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী এম এ আরাফাত তার অফিশিয়াল পেইজে সাবির মুস্তাফার চরচা ডটকমের দাবিতই শেয়ার করেছে। আরাফাত ক্যাপশনে বলেন, “৫ মে শাপলা চত্বর গণহত্যা—‘২৬ লক্ষ ভারতীয়’র মতো আরেকটি অপপ্রচার, যার কোনো ভিত্তি নেই। দেশি ও আন্তর্জাতিক কোনো গণমাধ্যমে শাপলা চত্বরে (৫ মে রাতে) গণহত্যা তো দূরের কথা, একটি মৃত্যুরও কোনো খবর পাওয়া যায়নি। কোনো প্রমাণ ছাড়াই শুধু গুজবের ভিত্তিতে প্রচার করা হয়েছে যে শাপলা চত্বরে গণহত্যা হয়েছে এবং এখনো এই অপপ্রচার চলছে। আওয়ামী লীগবিরোধীদের রাজনীতি দাঁড়িয়েই আছে মিথ্যাচারের ওপর। যাদের সত্য জানার ইচ্ছা আছে তারা বিবিসি বাংলার তৎকালীন প্রধান সাবির মুস্তাফার এই বক্তব্যটি শুনতে পারেন।""
এর আগে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর আরাফাত চ্যানেল আইয়ে দেয়া সাবিরের বক্তব্যটিও শেয়ার করেছিলেন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে। সেখানে তিনি লিখেন, “বহুদিন ধরে বিএনপি–জামায়াত এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ ২০১৩ সালের ৫ মে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে হেফাজতের সমাবেশে পুলিশের অভিযানকে “শাপলা গণহত্যা” বলে অপপ্রচার করে আসছে।"
এর বাইরে বাগেরহাট জেলা আওয়ামী লীগ, সাপোর্টারস অফ আওয়ামী লীগ ইত্যাদি ফেসবুক পেজেও তার দাবিটি শেয়ার করা হচ্ছে।