Image description
 

Ali Ahmad Mabrur ( আলী আহমদ মাবরুর)

 
আজ ৫মে। শাপলা ট্র্যাজেডির ঐতিহাসিক দিন। ২০১৩ সালের এ দিনটি বাংলাদেশের রাজনীতির কালো অধ্যায়। ক্ষমতায় থাকার জন্য একটি সরকার জনগণের সাথে কতটা নৃশংস হতে পারে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে এ দিনটি ইতিহাসে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের মাদ্রাসায় পড়ুয়া নিরীহ ছাত্রদের ওপর এ দিনে নির্মমভাবে ক্র্যাকডাউন চালানো হয়। তাদের অপরাধ তারা ঢাকা শহরে জমায়েত হতে চেয়েছিল।
 
তবে এ দিনটি কেবল হেফাজতে ইসলামের জন্য শোকাবহ দিন নয়। ইসলামপন্থী প্রতিটি মানুষ সেদিন কেঁদেছে, তাদের বুকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। হেফাজতের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী এই দিনটায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। আমি নিজে তার সাক্ষী। বিজয় নগর পানির ট্যাংক, পল্টন মোড়, ফকিরাপুল থেকে শুরু করে পুরো এলাকায় জামায়াত ও শিবিরের নেতাকর্মীদের সরব ও সক্রিয় উপস্থিতি ছিল।
 
বিকেল থেকে হেফাজতের পাশাপাশি জামায়াতের ভাইয়েরাও নির্যাতিত হয়েছিলেন। সন্ধার পর থেকে রাত ১০টা অবধি অসংখ্য ভাই ক্ষুধার্ত পেটে বিজয়নগর আর পল্টন এলাকায় অবস্থান করেছিলেন। রাত ১২ টার দিকে সবাই চলে যান নটরডেমের সামনে। কারণ শাপলা চত্বরে মূল ভেন্যুর কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়োজন ছিল।
 
আমি নিজেও সেদিন নটরডেমের সামনেই ছিলাম। বর্তমান জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসেনসহ অনেকের সাথে একসাথে সেই রাত আমরা কাটিয়েছি। এরপর আসে সেই ভয়াবহ আক্রমণ। ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার বেনজির আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশ আর আনআইডেন্টিফাইড নানা বাহিনী সেদিন গুলি, সাউণ্ড গ্রেনেড আর অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে নিরস্ত্র মানুষের ওপর হামলা করেছিল।
শাপলা চত্বরের সভা পন্ড হয়ে যায়। পুরো মতিঝিল শুধু রক্তের ছাপ আর মানুষের জুতোয় সয়লাব ছিল। বেনজির সাহেব সেদিনের ক্র্যাকডাউন চালানোর পুরস্কার হিসেবে আইজি হয়েছিলেন, র্যাবের ডিজি হয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশে সোনালী সময় আগমনের সাধ সেদিন ভুলুন্ঠিত হয়েছিল।
 
এই ঘটনা নিয়ে আওয়ামী লীগ কোনদিন অনুশোচনা করেনি। উল্টো তারা শাপলা ট্র্যাজেডিকে বরাবরই ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেছে। বিএনপি সেদিন রাজপথে নামলে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য রকম হতো। আজ বিএনপির নেতারা নানা ইস্যুতে অনেক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন। বাস্তবতা হলো, তারা একটি দুটো নয়, অসংখ্য ট্রেন মিস করেছিলেন বলেই আওয়ামী লীগ জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মতো বসে ১৫ বছর শাসন করতে পেরেছে।
 
শাপলা চত্বরে হত্যাকান্ড চালিয়ে তা হজম করতে পারার কারণে জামায়াত নেতাদের বিচারিক হত্যাকান্ডের পথ সুগম হয়। শাপলার ঘটনা ছিল ২০১৩ সালের ৫ মে, আর সে বছরের ১২ ডিসেম্বরে শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার মাধ্যমে সেই হত্যাকান্ডের প্রক্রিয়া চালু হয়। আর এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা ভোটের নির্বাচন এবং এরপর আরো দুটো প্রহসনের নির্বাচন।
 
শাপলার কুরবানির কাছে খুবই যৎসামান্য হলেও এই প্রসঙ্গও আলাপে আনা দরকার যে, ঘটনাচক্রে সেদিনই আমি বেকার হয়েছিলাম। ২০১৩ সালের ৫মে দিগন্ত টেলিভিশন বন্ধ হয়ে যায়। আমিসহ কয়েকশ কর্মী হুট করেই কর্মহীন হয়ে যায়। আজ ২০২৬ সালের ৫ মে। সে হিসেবে আমার আনুষ্ঠানিক কর্মহীন জীবনের ১৩ বছর আজ পূর্ণ হলো।
 
শাপলা বৃথা যায়নি। ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আমাকেও সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু যারা শহীদ হলেন, আহত হলেন, তাদের প্রতি আমরা সুবিচার করতে পারলাম না। ট্রাইবুনালে মামলা হলো, কিন্তু এখনো অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত হলো না। শাপলার বিচার করা না গেলে আমাদেরকে ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে।