আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামি আলোচক ডা. জাকির নায়েক এক বক্তব্যে ডান ও বাম হাত ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবীজির (সা.) নির্দেশনা এবং এ ব্যাপারে বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছেন। ২৩ মার্চ ২০২৬ তার ভেরিভায়েড ইউটিউব চ্যানেলে `Why is the Right Hand Preferred to the Left?' শিরোনামে ওই বক্তব্যের ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য তার বক্তব্যের সারাংশ তুলে ধরছি।
ডা. জাকির নায়েক বলেন,
“ইসলামে ডান ও বাম হাত পৃথক কাজে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যে সমস্ত কাজ সম্মানজনক, যে সমস্ত কাজ পছন্দনীয়, যেসব কাজে বরকত পাওয়া যায় এবং যে কাজগুলো ভালো, সেগুলো ডান হাত দিয়ে করতে হয়। আর অন্যান্য কাজ যেমন—পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি বাম হাত দিয়ে করতে হয়।
নবী করিমের (সা.) সুন্নত অনুযায়ী আমাদের ডান হাত দিয়ে খেতে হবে, ডান হাত দিয়ে পান করতে হবে এবং ডান হাত দিয়ে মুসাফাহা করতে হবে। কেউ যখন কাপড় পরিধান করে, তখন তার ডান দিক থেকে পরিধান করা উচিত। যদি সে শার্ট পরে, তবে ডান হাত আগে ঢোকাতে হবে। যদি পায়জামা পরে, তবে ডান পা আগে দিতে হবে। যদি জুতো পরে, তবে ডান পা আগে দিতে হবে। একইভাবে, যখন কেউ অজু করে, তখন ডান অঙ্গ আগে ধৌত করতে হবে। ডান হাত আগে, তারপর বাম হাত। ডান পা আগে, তারপর বাম পা। মসজিদে প্রবেশের সময় ডান পা আগে দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। নামাজ শেষ করার সময় এবং সালাম ফেরানোর ক্ষেত্রে ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে।
চুল আঁচড়ানোর সময় ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। গোঁফ ছোট করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। নখ কাটার সময় ডান হাতের নখ আগে কাটতে হবে। শরীর থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত লোম পরিষ্কার করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। মাথা মুণ্ডন করার সময়ও ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। যখন টয়লেট থেকে বের হবেন, তখন ডান পা আগে দিতে হবে। চোখে সুরমা দেওয়ার সময়ও ডান চোখ দিয়ে শুরু করতে হবে। মেসওয়াক বা দাঁত মাজার ক্ষেত্রেও ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। এগুলো নবীজির (সা.) সুন্নত, যা তিনি আমাদের শিখিয়েছেন।
আর যেসব কাজ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং যেগুলো সম্মানজনক নয়, সেগুলো বাম হাত দিয়ে করতে হয়। এটাও নবীজির (সা.) সুন্নত। উদাহরণস্বরূপ, কাপড় খোলার সময় বাম দিক থেকে শুরু করতে হয়; শার্ট খোলার সময় বাম হাত, পায়জামা খোলার সময় বাম পা, আর জুতো খোলার সময়ও বাম পা আগে বের করতে হয়। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা আগে দিতে হয়। টয়লেটে প্রবেশের সময় বাম পা আগে দিতে হয়। টয়লেটে যাওয়ার পর শরীর পরিষ্কার করার জন্য বাম হাত ব্যবহার করতে হয়। নাক ঝাড়ার জন্য বাম হাত ব্যবহার করতে হয়। এভাবেই বিষয়গুলোর পার্থক্য করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি হাদিস রয়েছে:
- সহিহ বুখারীর সপ্তম খণ্ডের খাবার অধ্যায়ে (হাদিস নম্বর ৫৩৭৬) বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী (সা.) এক বালককে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলো, ডান হাত দিয়ে খাও এবং তোমার কাছের খাবার খাও।
- সহিহ মুসলিমের তৃতীয় খণ্ডের পানীয় অধ্যায়ে (হাদিস নম্বর ৫০১০) বর্ণিত হয়েছে, নবী (সা.) বলেছেন, বাম হাত দিয়ে পান করো না এবং বাম হাত দিয়ে খেও না, কারণ শয়তান বাম হাত দিয়ে খায় ও পান করে।
- সুনানে আবু দাউদের খাবারের অধ্যায়ে (হাদিস নম্বর ৪১২৯) বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, অজু করার সময় এবং কাপড় পরার সময় ডান দিক আগে ব্যবহার করো। নবী (সা.) বলেছেন, কাপড় পরার সময় ডান হাত আগে ব্যবহার করো এবং অজু করার সময় ডান দিক আগে ব্যবহার করো, এরপর বাম দিক ব্যবহার করতে পারো।
- সুনানে আবু দাউদ প্রথম খণ্ডে (হাদিস নম্বর ৩৩) বর্ণিত হয়েছে, যেখানে নবী (সা.) বলেছেন, খাবার গ্রহণের জন্য এবং অজু করার জন্য ডান হাত ব্যবহার করো, ডান দিক আগে ব্যবহার করো এবং তারপর বাম দিক ব্যবহার করো। আর ধোয়ার ক্ষেত্রে বাম দিক ব্যবহার করো।
- সহিহ মুসলিমে (হাদিস নম্বর ৫০৪) বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ধোয়া-মোছার মতো কাজের জন্য ডান হাত ব্যবহার করো না, এসবের জন্য বাম হাত ব্যবহার করতে হবে।
এই হাদিসগুলোর ওপর ভিত্তি করেই এটি একটি সুন্নত যে, আমরা ভালো ও সম্মানজনক কাজের জন্য ডান হাত ব্যবহার করি এবং অন্যগুলোর জন্য বাম হাত ব্যবহার করি।
বৈজ্ঞানিকভাবেও এই পদ্ধতি উপকারী ও উত্তম। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান আজ আমাদের বলছে, মস্তিষ্কের বাম দিক শরীরের ডান দিক নিয়ন্ত্রণ করে, মস্তিষ্কের ডান দিক শরীরের বাম দিক নিয়ন্ত্রণ করে এবং ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষের মস্তিষ্কের বাম দিক বেশি শক্তিশালী। এ কারণেই ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ ডানহাতি। বেশিরভাগ মানুষ—সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম—ডান হাত বেশি ব্যবহার করে। কিন্তু ইসলাম আমাদের ভালো কাজগুলো ডান হাত দিয়ে করার জন্য উৎসাহিত করে এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো কাজের জন্য বাম হাত ব্যবহার করতে বলে।
সাধারণত মানুষ শুধুমাত্র মস্তিষ্কের বাম অংশ ব্যবহার করে কারণ তারা ডানহাতি। কিন্তু ইসলাম আমাদের ভালো কাজের জন্য শরীরের ডান অংশ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করে এবং একই সাথে যেসব কাজ সম্মানজনক নয়, সেগুলোর জন্য বাম দিক ব্যবহার করতে বলে।
ফলে একজন মানুষ ভালো কাজের জন্য ডান দিক ব্যবহারের পাশাপাশি বাম দিকও ব্যবহারে বাধ্য হয়। উদাহরণস্বরূপ, মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা দিতে হয়, টয়লেটে প্রবেশের সময় বাম পা দিতে হয়। কাপড় খোলার ক্ষেত্রে, মানুষ সাধারণত ডান হাত ব্যবহার করে, ডান হাত দিয়ে কাপড় ধরে এবং ডান দিক দিয়ে খোলে—এটি সাধারণ অভ্যাস। কিন্তু আমরা কাপড় ও জুতো খোলার সময় সচেতনভাবে বাম দিক ব্যবহার করি।
সুতরাং সুন্নত অনুসরণ করে আমরা মস্তিষ্কের অন্য অংশটিও কাজে লাগাচ্ছি, যদিও ডান দিকের তুলনায় কম। এটি মস্তিষ্কের জন্য একটি ভালো ব্যায়াম, মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।
সুতরাং এই সুন্নত অনুসরণ করলে আমরা যেমন সুন্নত অনুসরণ করার সওয়াব লাভ করবো, শারীরিক ও মানসিকভাবেও উপকৃত হবো।"