Image description

বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগের ভাষায় জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বলছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা দলটির নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

 

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেছেন, আজকে যারা সরকারি দলের বেঞ্চে আছেন তারা বোধয় আওয়ামী লীগ থেকে আর আমরা এদিকে যারা আছি তারা বোধহয় জামাত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ- আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায় যে ভঙ্গিতে যে স্পিরিটে জামাতের বিরুদ্ধে বলতো এবং কন্ডেম করতো, ঠিক আজকে সরকারি দলের বেঞ্চ থেকে একই ধরনের আচরণ আমরা লক্ষ্য করছি

তিনি বলেন, দীর্ঘ সংগ্রাম, আন্দোলন ও জীবন দানের কথা তো এখানে সকলেই বলছেন বারবার এবং এটাই সত্য ছিল যে অনেক জীবন রক্তের বিনিময়ে আজকের এ অবস্থায় আমরা আসতে পেরেছি। এই সংগ্রামে বিএনপি, জামাত ও অন্যান্য দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমভাবেই সংগ্রামে আমরা একত্রিত ছিলাম। যেমন বিএনপির মহাসচিব, আমাদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির, তারা সবাই অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল ঠিক করেছিলেন এবং প্রোগ্রাম ঠিক করেছিলেন। কিন্তু আজকে মনে হচ্ছে যে, আমরা বোধহয় সবসময় একপক্ষে ছিলাম এবং অপরপক্ষে আপনারা ছিলেন এবং অত্যন্ত উত্তপ্ত একটা সংসদীয় অবস্থা আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি।

ডা. তাহের বলেন,আন্দোলন-সংগ্রামের সময় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে অন্যভাবে আলোচনা হয়েছে। আমরা সকলে তখন বলছিলাম যে, এই সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতনের পর যে রাজনীতি হবে, যে সংস্কৃতি হবে, যে পার্লামেন্ট হবে, যে দেশ শাসন হবে, আমরা সকলে মিলে একটা সুশাসন দেওয়ার জন্য কাজ করব। এ পর্যন্ত কিন্তু আমরা পুরাপুরি ঐক্যমতে ছিলাম। কিন্তু নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের পরে আমরা একটি ভিন্ন চিত্র আবার দেখতে পাচ্ছি, যেটা এই জাতিকে হতাশ করবে, আমাদেরকেও রিয়েলি একটা পর্যায়ে হতাশ করবে। কারণ সবাই মিলে যেটা দেওয়ার কথা ছিল বা দিতে পারতাম, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা কিন্তু সহজ হবে না। মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজনীতি, সংসদ এবং আমাদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হলে শুধু পার্লামেন্টে বক্তব্য দিয়ে অর্জন করা যাবে না, এজন্য সত্যিকারভাবেই আমাদের মনের পরিবর্তন এবং আমাদের অ্যাটিচিউডের পরিবর্তন দরকার।

ডা. তাহের বলেন, উনারা বলেছেন টু-থার্ড মেজরিটি পেয়েছেন, নির্বাচন নিয়ে যদিও অনেক কথা আছে কিন্তু তারপরও আমাদের আমিরে জামায়াত এই রেজাল্ট গ্রহণ করে নিয়েছেন আগের ট্রাডিশন অনুযায়ী— কিছু হলেই মানি না, আসবো না, গন্ডগোল হচ্ছে— সেটা কিন্তু আমরা করিনি। আমরা করিনি এজন্যই যে, জাতির প্রতি আমাদের যে দায়বদ্ধতা আছে, যে কমিটমেন্ট আছে, তা পূরণ করতে হলে পারস্পরিক ঝগড়াঝাটিতে সময় ব্যয় করলে হবে না। বরং সেটা না হয়ে পুরা সময়টাই যদি আমরা দেশ গড়ার জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্যে, সুস্থ রাজনীতির জন্যে ব্যয় করি তাহলে সেটাই আমাদের অর্জনকে একটা ঐতিহাসিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

বিরোধীদলীয় উপনেতা বলেন, টু-থার্ড মেজরিটি কখনোই খুব সুখকর রেজাল্ট দেয়নি অনেক জায়গাতে। আজকে আলোচনায় টু-থার্ড মেজরিটির জোর মনে হয়েছে। পাক-ভারত উপমহাদেশে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে বা বেনজির ভুট্টোর সময়ে, এই বাংলাদেশে শেখ সাহেবের সময়ে, তারপর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়, ম্যাডাম বেগম জিয়ার সময় আমরা টু-থার্ড মেজরিটির অবস্থা দেখেছি এবং এটার একটা ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা দেখেছি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই যে এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশের জন্য আর কখনো না হতে পারে।

তিনি বলেন, অতীতকে যদি আমরা টানি তাহলে সবার অতীতের ভিতরে ভালো দিক আছে এবং কালো স্পটও আছে। যেমন খুব বেশি করে আজকে আমাদেরকে রাজাকার-আলবদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। বুধবার আমি শুনেছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি দুই রাজাকার বলেছেন পার্লামেন্টে, আমি জানি না এটাকে এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে কি না।

ডা. তাহের বলেন, সরকারি দল বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর শুরুর দিনের বক্তব্যটা আমার কাছে খুবই ভালো লেগেছে। শুধু একটি শব্দ বোধ হয় 'গুপ্ত' নাকি একটা উপমা ছিল, এগুলোর টুকটাক কার কী দুর্বলতা আছে বলে যদি আমরা প্রকাশ করতে চাই তাহলে আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আস্থার ঘাটতি হবে।

জুলাই সনদ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি বলেন, কয়েক মাস ধরে, ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে এই জুলাই চার্টারটি তৈরি করা হয়েছিল এবং সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকেও অত্যন্ত দৃঢ় এবং বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা হয়েছে এবং সেটাকে আমরা সাইন করেছি। কিন্তু যে দল মেজরিটি পাবে তারা সে অনুসারে করবে, এটা কিন্তু আমাদের আলোচনার অংশ ছিল না। এটা এক প্রকার প্রতারণা, এই প্রতারণা কার পক্ষ থেকে হয়েছে এটা জাতির কাছে আমরা প্রকাশ করব ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, গণভোট তো আমরা সকলে মিলে করেছি। প্রধানমন্ত্রী গণভোটের পক্ষে কথা বলেছেন।আপনারা এখন বলছেন যে এটা জায়েজ হয় নাই। জায়েজ তো যদি এখন না হয় আগেও নাজায়েজ ছিল, আগেও অবৈধ ছিল, আগেও অসাংবিধানিক ছিল।

ডা. তাহের বলেন, হিটলারের সময় একটা গণভোট হয়েছিল, হিটলার সেটাকে একসেপ্ট করে। আর আমাদের উপমহাদেশে একটা গণভোট হয়েছিল কাশ্মীর ইস্যুতে, সেই কাশ্মীর গণভোটও ইন্দিরা গান্ধীর পিতা জহরলাল নেহেরু একসেপ্ট করেনি এবং সে কারণে আজও কাশ্মীরের সমস্যার সমাধান হয়নি এবং হাজার হাজার মানুষ এখনো মৃত্যুবরণ করছে। আমি মনে করি যে, দেশের জন্য কল্যাণকর যেটা, মেজরিটি টু-থার্ডের ভিত্তিতে যদি আপনারা যা ইচ্ছা তাই করতে থাকেন তাহলে এদেশ আবার পিছিয়ে যাবে। এবং একটা সুস্থ রাজনীতি এবং সুষ্ঠ পার্লামেন্ট অর্জন করা সহজ হবে না।

জামায়াতের এই নায়েবে আমির বলেন, জামাতে ইসলামী পাকিস্তানের বিরোধী ছিল বলে যে তথ্য আসছে এটা একেবারেই অসত্য তথ্য। কারণ মাওলানা মওদুদী প্রথম টু-নেশন থিওরির প্রবক্তা ছিলেন এবং তার খুব স্ট্রং একটা বই লেখা ছিল সেটাকে তৎকালীন মুসলিম লীগ পলিটিক্যালি হাজার লক্ষ কপি ছাপিয়ে সারা পাক-ভারত উপমহাদেশের মুসলিমদের কাছে পেশ করেছিলেন। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পরপরই তিনি কিন্তু পাকিস্তানে মাইগ্রেট করেছেন। তিনি যে কথাটা বলেছিলেন তা না বুঝার কারণে কেউ বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তিনি বলেছিলেন যে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড দরকার। তিনি পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেছেন, তবে তিনি বলেছিলেন যে, সমস্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে আন্দোলন চলছে এই নেতৃত্বের পক্ষে একটি ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা সম্ভব হবে কি না সন্দেহ। তাই দুটো বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি সম্পূর্ণ পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন।

একজন সদস্য বলেছেন, তিনি(মুদুদী) ৪৭-এ বিশ্বাস করেন না। তিনি যদি ৪৭-এ বিশ্বাস না করেন তাইলে বাংলাদেশ কীভাবে হইতো? কারণ বাংলাদেশ এবং ইস্ট পাকিস্তান-ওয়েস্ট পাকিস্তান মিলেই তো ৪৭-এ স্বাধীন হয়েছে এবং সেখান থেকে তো আবার আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করে আমরা বাংলাদেশ অর্জন করেছি।

ওই সদস্য বলছেন যে, হাসিনার কারাগারে তিনি যেতে চান না, এজন্য ভারত পালিয়ে গেছেন। অরিজিনালি যারা ভারতপন্থি, অরিজিনালি যারা ভারতের অধীনস্থ একটি বাংলাদেশ দেখতে চায় তাদের চিন্তার ভিতরে এ সমস্ত জিনিস আসতে পারে।

ডা. তাহের বলেন, আরেকজন সদস্য বলেছেন, ম্যাডাম জেলে থাকার সময় জামাত কোনো বিবৃতি দেয়নি। এটা একেবারেই অসত্য কথা, আমরা বারবার বিবৃতি দিয়েছি সব ইস্যুতে। শুধু বিবৃতি নয়, আমরা তার মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিলও করেছি। প্রত্যেকটা ইস্যুতে যেমন অনেক সময় বিএনপিও আমাদের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন আবার অনেক সময় দেন নাই। যেমন আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির অর্ডারের রাতে আমি রাতে ম্যাডামের বাসায় গিয়েছিলাম একটা রিকোয়েস্ট করার জন্য। ম্যাডাম বলেছিলেন যে ঠিক আছে আমরা আলোচনা করে দেব, পরে দেওয়া হয়নি। সেটা এলিগেশন না কারণ, ম্যাডামের জামায়াতে ইসলামীর প্রতি অনেক সিম্প্যাথি আছে এবং আমাদের পক্ষে তিনি অনেক ডাইরেক্ট কথা বলেছেন। তিনি মাওলানা নিজামীর ফাঁসির ব্যাপারে কথা বলেছেন, আমরা এজন্য তার প্রতি গ্রেটফুল এবং রেসপেক্টফুল।

তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী বলছেন যে, কোনো দলের ব্যাংকও আছে। আসলে জামায়াতে ইসলামীর এরকম কোন ব্যাংক নাই। ইসলামী ব্যাংকে জামায়াতের এমপিদের কেউ ইসলামী ব্যাংকের কোন ডিরেক্টর নাই। তাদের কোন ঋণ এডজাস্টমেন্টও করে কন্ডিট হয় নাই এবং আমরা সেরকম ঋণ রিশিডিউল করি নাই। ইসলামী ব্যাংক কতিপয় সৎ উদ্যোগী মানুষের ফসল ছিল এবং অল্প সময় ইসলামী ব্যাংক সারা এশিয়ার বেসরকারি খাতের এক নম্বর ব্যাংক হয়েছে কয়েকবার। এটা সাকসেসের ইতিহাস। তবে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের ভূমিকা আছে এটা আমরা স্বীকার করতে পারি, কারণ জামায়াত গুড ম্যানেজমেন্ট, সততা, এফিশিয়েন্সি— রাষ্ট্র পরিচালনায় হোক বা কোন প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় হোক এটাতে বিশ্বাস করে।

ডা. তাহের বলেন, এখানে রাজাকার-আলবদরের কথা বলা হয়েছে, এখানে আমরা যারা আছি তো রাজাকার ছিলাম না, আমরা তো আলবদর ছিলাম না। আমরা জামায়াতের নেতা ছিলাম। সেভাবে মুক্তিযোদ্ধার কথা বললে আমিও একজন শিশু মুক্তিযোদ্ধা।

তিনি বলেন, ৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সহযোগিতায় বিএনপি সরকার গঠন করেছিল, আমাদেরকে মন্ত্রিত্ব দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল কিন্তু আমরা সেটা গ্রহণ করিনি। পরে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল-শিবিরের বিভিন্ন ঘটনায় দুই দলের ভিতরেই সম্পর্কের হানি ঘটলো এবং ৯৬ সালে আমরা আলাদা ইলেকশন করলাম এবং পরিণতি আমরা সকলে জানি। এবার কিছুটা লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং এইরকম ঘটনা যদি ঘটতে থাকে তাহলে এটা কোন দিকে পরিণতি নিয়ে যাবে সেটা আমরা আশঙ্কা করি। আমরা চাই এই সংসদ, এই সরকার আমরা সকলে মিলে সুস্থ ধারায় কন্টিনিউ করতে থাকি। ইউনিভার্সিটিগুলোতে যে গন্ডগোল হচ্ছে সে ব্যাপারে আমরা মনোযোগ দেব, সরকারি দলও মনোযোগ দেন, যেন একাডেমিক এনভায়রনমেন্ট বজায় থাকে।