স্ত্রী-সন্তানের কাছে ফেরার কথা ছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর। বাসায় পৌঁছানোর আশ্বাস দিয়ে শেষবার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ফেরা আর হয়নি, যাত্রীবেশী ছিনতাইকারী চক্রের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে তাকে।
এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি পেশাদার ছিনতাইকারী চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১১। গ্রেপ্তাররা সবাই কুমিল্লা কোতোয়ালি থানার বাসিন্দা এবং তাদের বিরুদ্ধে আগেও রেলওয়ে ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে জড়িত, অপরজন সিএনজিচালক।
নিহত বুলেটের মা নীলিমা বৈরাগী জানান, শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রাত সোয়া ২টার দিকে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। তখন বুলেট বলেছিলেন, তিনি বাসে আছেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাসায় পৌঁছাবেন।
এরপর ফোনে আর সাড়া না পেয়ে ভোর ৪টার দিকে আবার কল করলে অপরিচিত কণ্ঠে একজন রিসিভ করে বলে, ‘আরেকটু পরে আইতেছি, এখন ঘুমাইতেছি।’ সেই কণ্ঠস্বর নিজের ছেলের নয় বুঝতে পারলেও, কাছাকাছি আছে ভেবে তখন আর সন্দেহ বাড়াননি তিনি।
র্যাব জানায়, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন বুলেট বৈরাগী। রাত প্রায় পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোতোয়ালি থানাধীন একটি হোটেলে যাত্রাবিরতির সময় তিনি বাস থেকে নামেন। পরে বাসায় ফেরার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন।
সেই অটোরিকশায় চালকসহ আগে থেকেই অবস্থান করছিল ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা। যাত্রী সেজে তারা বুলেটকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার মোবাইল ফোন, ব্যাগ, ক্যামেরা ও টাকা ছিনিয়ে নেয়। একপর্যায়ে চলন্ত সিএনজি থেকে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। মাথায় গুরুতর আঘাতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী হাড়াতলী এলাকায় একটি হোটেলের পাশ থেকে বুলেটের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথার পেছনে গুরুতর জখম এবং মুখমণ্ডল রক্তাক্ত ছিল।
এ ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন নিহতের মা। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল।
ঘটনার পরদিন রোববার (২৬ এপ্রিল) কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে বুলেটের মোবাইল ফোনসহ বেশ কিছু আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যবহৃত অটোরিকশাটিও জব্দ করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, প্রথমে কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকা থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয়।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) বিকেলে গ্রেপ্তারদের আদালতে হাজির করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর দক্ষিণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) টিটু কুমার নাথ বলেন, আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে এবং তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএসের নন-ক্যাডার হিসেবে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগ দিয়ে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় স্ত্রী, এক বছরের সন্তান ও বাবা-মাকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন। পরিবারের একমাত্র সন্তান বুলেটই ছিলেন তাদের ভরসা।