রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা কাটছেই না। দফায় দফায় তপশিল ঘোষণা, প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ এবং প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই নির্বাচন এখনও ঝুলে আছে। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও সর্বশেষ আমরণ অনশনের পর কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
গত ৮ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সম্ভাব্য প্রার্থী সমন্বয়ক শামসুর রহমান সুমন, আশিকুর রহমান এবং ছাত্রশিবির নেতা আহমাদুল হক প্রশাসনকে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা। কিন্তু আল্টিমেটামে ৭২ ঘণ্টা পার হলেও টনক নড়েনি প্রশাসনের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ‘শিক্ষার্থী সংসদ’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৬তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. ফেরদৌস রহমানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে ছয় সদস্যের ব্রাকসুর প্রথম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। তবে কমিশন গঠনের এক দিন পরই তার পদত্যাগ নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
পরবর্তীতে ১১ নভেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১১৭তম জরুরি সিন্ডিকেট সভায় পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার করে কমিশন পুনর্গঠন করা হয়। তিনিও দুই দফায় পদত্যাগ করেন। প্রথমবার পদত্যাগের পর অনুরোধে দায়িত্বে ফিরলেও কিছুদিন পর আবারও পদত্যাগ করেন। বর্তমানে ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে মাসুদ রানা দায়িত্ব পালন করছেন।
সর্বশেষ তপশিল অনুযায়ী, ১৩ ডিসেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা থাকলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি বলে পাঁচ কমিশনারের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার ২৫ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের নতুন তপশিল ঘোষণা করেন। তবে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশন সব ধরনের নির্বাচন স্থগিত করলে ব্রাকসুর কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
বেরোবি শাখা ছাত্রদল সভাপতি মো. ইয়ামিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা সবাই চাই ব্রাকসু নির্বাচন হোক। তবে গঠনতন্ত্রে কিছু ত্রুটি রয়েছে। সেগুলো সংশোধন না করে নির্বাচন হলে এর মূল উদ্দেশ্যে ব্যাহত হবে। তাই সংশোধনের পরই নির্বাচন হওয়া উচিত।
বেরোবি শাখা ছাত্রশিবির সভাপতি সুমন সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ব্রাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের একটি বহুল প্রত্যাশিত প্ল্যাটফর্ম। এটি প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়েছে। আইনে সংযুক্তি সম্ভব হলেও প্রশাসনের ছলচাতুরী, বিএনপির চাপ এবং ছাত্রদলের অসহযোগিতার কারণে এখনও এর বাস্তবায়ন হয়নি। বারবার কমিশন গঠন, তপশিল ঘোষণা ও বাতিল প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার উদাহরণ।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক এস এম আশিকুর রহমান বলেন, স্থগিত তপশিল সচলের দাবিতে আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বসেছিলাম। কিন্তু একটি পক্ষ গঠনতন্ত্র সংশোধনের কথা বলে নির্বাচন পিছিয়ে দিতে চাচ্ছে। অথচ এই গঠনতন্ত্র মেনেই ১৫০ জন মনোনয়ন ফর্ম নিয়েছেন। এখন তাদের মতামত উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন গুটি কয়েকজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া আটকে রেখেছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে আবারও আলোচনায় বসব। এরপর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
ব্রাকসুর বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাসুদ রানা এশিয়া পোস্টকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আল্টিমেটামের পর তাদের সঙ্গে আমাদের একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে উপাচার্য স্যারও উপস্থিত ছিলেন। তবে বিভাগীয় পরীক্ষার কারণে আমি সভার শেষ পর্যন্ত থাকতে পারিনি। অন্য নির্বাচন কমিশনাররা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে কথা বললে সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শওকাত আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের বারবার পদত্যাগ আমাদের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ। তারপরও আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করতে চাই এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।