কেরানীগঞ্জের শিকারীটোলা গ্রামের বাসিন্দা আম্বিয়া খাতুন (৫৮) প্রায় ১৫ বছর ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। স্বামী মারা যাওয়ার পরে দুই মেয়ের সংসারে ঠাঁই হয়েছে তার। গত তিন বছর ধরে কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনসিডি কর্নার থেকে চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে ওষুধ পান তিনি।
আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘আগে হাসপাতাল থেকে দুইটা ওষুধ এক মাসের জন্য দিত।
শুধু আম্বিয়া খাতুন নয়; সারা দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১০টি জেলা হাসপাতাল মিলিয়ে ৪৪৬টি এনসিডি কর্নারে নিবন্ধন করে সেবা নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোগী ওষুধ পাচ্ছেন না।
অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি সূত্রে জানা গেছে, এনসিডি কর্নারে মূলত ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য মেটফরমিন ও গ্লিক্লাজাইড, উচ্চ রক্তচাপের জন্য অ্যামলোডিপিন, লোজারটেন পটাশিয়াম, হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইড ওষুধ দেওয়া হয়। এনসিডি কর্নারের গুরুত্ব তুলে ধরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এনসিডি কর্নারের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষকে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে বাঁচানো গেছে। বিশেষ করে দরিদ্রদের। কর্নারে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের বেশির ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। ওপি না থাকার কারণে এনসিডির কাজ থেমে গেলে তা হবে চরম ব্যর্থতা।’
কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আবদুল মোকাদ্দেস বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘আমরা আগে দুই মাসের ওষুধও একসঙ্গে রোগীদের দিয়েছি। কিন্তু ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস পরে ১শ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হলে এনসিডি কর্নারের জন্য কিছু ওষুধ পায়। এ ছাড়া সিভিল সার্জন অফিস থেকে কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে, হাসপাতালের ফান্ড থেকেও কিছু কেনা হয়েছে। কিন্তু এখন রোগীদের আর এক মাসের ওষুধ দিতে পারছি না, সেখানে ১০ দিনের করে দিচ্ছি।’
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশীদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘এনসিডি কর্নার অপারেশন প্ল্যানের আওতায় চলত কিন্তু সেটা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ফান্ডের সংকট দেখা দিয়েছে। এখন এই ওষুধ কেনার জন্য অন্য কোথাও থেকে অর্থ দেওয়ারও সুযোগ নেই। আগামী বাজেটের পরে হাসপাতালের ফান্ড বাড়িয়ে দেওয়া হবে। তখন হাসপাতালগুলো তাদের প্রয়োজন মতো এসব ওষুধ কিনতে পারবে।’
ওষুধ সংকটের আভাস দিয়ে গত ১৬ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশীদ স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৮ আগস্ট এসেনসিয়াল ড্রাগ কোম্পানির মাধ্যমে অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ৪৪৬টি এনসিডি কর্নারে ৯৯ কোটি ৯৯ লাখ ৮৩ হাজার ৩৩২ টাকার ওষুধ বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই ওষুধ দিয়ে আগামী দুই মাস চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখা যাবে। নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়বে। সরকারের সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিন বলছে, দেশে সংক্রামক রোগের প্রকোপ ধীরে ধীরে কমলেও উল্টো অসংক্রামক রোগের চিত্র। মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই হচ্ছে অসংক্রামক রোগে। যার ৩৪ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। এ হৃদরোগের বড় কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস। চিকিৎসকরা বলছেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার রোগীদের নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ ও চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। এ দুটি রোগের কারণে হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসারসহ বিভিন্ন অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন