Image description
তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়েছে

গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। গতকাল রাজশাহীতে মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। সারা দেশে যখন তাপমাত্রা বাড়ছে তখন হঠাৎ করেই বিদ্যুতের লোডশেডিং ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বুধবার দুপুরে লোডশেডিং এই মৌসুমের সর্বোচ্চ আড়াইহাজার মেগাওয়াটে ঠেকেছে। মূলত ভারতের ঝাড়খণ্ডে বসানো আদানির ৮০০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ক্রটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুধবার দুপুর ১২টায় লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৪৯৩ মেগাওয়াট। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, যশোর, কুমিল্লাসহ দেশের কোথাও কোথাও ১০-১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, লোডশেডিং নিয়ে তারাও চিন্তিত। তাই জরুরিভিত্তিতে খুলনা, সিরাজগঞ্জসহ তিনটি ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে গ্রামে লোডশেডিং বৈষম্য কমাতে বুধবার রাত থেকে রাজধানী এবং আশপাশে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তিন বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসি, ডেসকো এবং আরইবিকে এই ব্যাপারে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম রাজধানীতে লোডশেডিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। তবে গতকাল রাত থেকে এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে তা সময়ই বলে দেবে। খুলনায় লোডশেডিংয়ের কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, তীব্র গরমে এ বছর বিদ্যুতের চাহিদা গত বছরের চেয়ে বেড়েছে। গতকাল দুপুর ১২টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল (সরকারি হিসাবে) ১৫ হাজার ৬৫০ মেগাওয়াট। আর সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ৪০ মেগাওয়াট। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) জানায়, গত বছর এই সময়ে কমপক্ষে দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা কম ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে আদানির একটি ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণে। পিডিবি জানায়, মঙ্গলবার রাতে আদানির একটি ইউনিটের বেয়ারিং নষ্ট হয়ে গেছে। সেটি মেরামতো করতে কয়েক দিন সময় লাগবে। এই কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কমাতে দিনের বেলা ডিজেলচালিত নর্থ ওয়েল পাওয়ার জেনারেশনের ডিজেলচালিত প্ল্যান্টগুলো চালানো হবে। এতে করে প্রতি ইউনিটের বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ পড়বে ৩০ টাকার বেশি। জানা গেছে, গতকাল বিদ্যুৎ বিভাগের সারা দেশের ভয়াবহ লোডশেডিং নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে গ্রামে লোডশেডিং কমাতে শহরে কিছুটা হলেও লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম থেকে যুগান্তরের ব্যুরো অফিস জানিয়েছে, চট্টগ্রাম ও এর ১৫টি উপজেলায় লোডশেডিং আগের মতোই। মফস্বলে ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। চট্টগ্রামে ২৮ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে ১০টিই বন্ধ। বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে ওয়াসার পানি পাচ্ছে না নগরবাসী। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত। ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে বিদ্যুতের চাহিদা অফ পিক আওয়ারে ১৩৮৩ দশমিক ৬০ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে ১৪৯০ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট। কাগজে কলমে ১৭৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে লোডশেডিং ২০০ মেগাওয়াটের বেশি।

খুলনা ব্যুরো জানায়, লোডশেডিংয়ে কোমলমতি এসএসসি শিক্ষার্থীরা বেশি বেকায়দায়। বুধবার দুপুরে ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞপ্তি জারি করে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। জানা যায়, ন্যাশনাল গ্রিড ও নিজস্ব পাওয়ার প্ল্যান্টে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহে খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, নার্সিং কলেজ ও ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বেশ কয়েকটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। তবে বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিংয়ে সকল কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে। তাই বৃহৎ এই চিকিৎসাসেবা সুনিশ্চিত করতে হাসপাতালের সব কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। ক্ষতি হচ্ছে স্থানীয় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও। কবে নাগাদ এ সংকট দূর হবে তাও অনিশ্চিত। নগরীর নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা আলামিন বলেন অধিকাংশ সময়ই বিদ্যুৎ থাকছে না। বানারীপাড়ার বাসিন্দা মোবারক মিয়া বলেন, সবাই অশান্তিতে আছে। গরমে রাতে ঠিকমতো ঘুম হয় না, দিনেও একই অবস্থা।

দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গা ও দামুড়হুদা সদর এবং শিল্প নগরী দর্শনা শহরের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি যেন এক অদ্ভুত সমীকরণে আটকে গেছে, বিদ্যুৎ যায় না, মাঝে মাঝে আসে। লোডশেডিং এখানে আর কোনো সাময়িক সমস্যা নয় বরং এটি প্রতিদিনের বাস্তবতা। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য দর্শনায় দুইটি কেন্দ্র রয়েছে। পরীক্ষার আগ মুহূর্তে পড়তে বসার পর বিদ্যুৎ চলে যাওয়াটা এখন নিয়মিত ঘটনা। দর্শনার আয়শা হোসেন নামে এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েরা কি মোমবাতি নিয়ে লেখাপড়া করবে? দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেউ কি ভাবছে না?

সামিউল সোয়াদ নামে এক শিক্ষার্থী জানায়, রাতে পড়তে বসি, বিদ্যুৎ থাকে না। আবার গভীর রাতে আসে, তখন ঘুম পায়। এভাবে ভালো ফল করা সম্ভব?

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষ চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে কয়েকগুণ বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। দুর্গাপুর উপজেলা সদরের ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক হোসেন আলী জানান, লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে তার আয়-রোজগারে। রাতে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। রাতে চার্জ দিয়ে দিনে রিকশা চালাই, কিন্তু লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যাটারি ঠিকমতো চার্জ হয় না। এর ফলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’ মহানগরীর সাগরপাড়া এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘রাত ২টার দিকে বিদ্যুৎ চলে যায়। বাচ্চারা ঘুমাতে পারে না। আমরাও এই গরমে কষ্ট পাচ্ছি। প্রতিদিনই এমন হচ্ছে।’

কুমিল্লা ব্যুরো জানায়, গ্রাহকদের অভিযোগ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২-১৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎহীন থাকছে। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও খারাপ। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি কলকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ১৭ উপজেলায় ৪টি সমিতির আওতায় পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ২১ লাখ গ্রাহক রয়েছে। গত ১৫ দিনের লোডশেডিংয়ে এসব গ্রাহক চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। বোরো ধানের আবাদে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেবিদ্বার উপজেলা সদরের ব্যবসায়ী রইস উদ্দিন বলেন, ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। গ্রামের চিত্র আরও ভয়াবহ।

ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) প্রতিনিধি জানান, ফরিদগঞ্জের গ্রামে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে বোরো আবাদসহ বিভিন্ন সবজি খেতে পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোও যথাযথ চিকিৎসাসেবা দিতে পারছে না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে শিক্ষা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেখা দিচ্ছে স্থবিরতা। বাসাবাড়িতে পানির সংকট। মানুষ রীতিমতো হাপিয়ে উঠছেন।

সৈয়দপুর প্রতিনিধি জানান, নীলফামারীর সৈয়দপুরে উপজেলায় দিনে গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ থাকছে না। বিদ্যুতের চাহিদা ৩০ মেগাওয়াটের বিপরীতে মিলছে মাত্র ৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, দেওয়ানগঞ্জ বিদ্যুৎ এই আছে এই নাই চলছে ভেলকিবাজি। দিনের বেলায় প্রচণ্ড রোদ ও তাপপ্রবাহ। দেওয়ানগঞ্জের চাহিদা ১২ মেগাওয়াট, সরবরাহ করা হয় ২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট।