আদালতের সামনে কাঁদতে কাঁদতে তনুর মা বলেন, আমি চাই আমার মেয়ে হত্যার বিচার হোক। মেয়েকে নিয়ে কষ্টে ছিলাম সুখের আশায় কিন্তু সেই সুখ কপালে নাই। আমার জীবনটা কষ্টেই কেটে যাচ্ছে। আমি দশ মিনিট এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। কিন্তু বিকাল ৩ টা থেকে ৫ টা পর্যন্ত দাড়াই থাকতাম মেয়ের জন্য। ভাবছি মেয়ে কোন একদিন আমাকে সুখ দিবে। কিন্তু আমি আমার মেয়েকে তো হারাইলাম সাথে তাঁর হত্যার কোন বিচার ও পাইলাম না। আমি এখন খুব কষ্টে আছি। আমি আমার মেয়ের হত্যার সঠিক বিচার চাই।
কুমিল্লা ১০ বছর পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামি সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত।
বুধবার বিকেলে তাকে কুমিল্লা সদর কোর্ট- ১ এ হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোমিনুল হক রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে পিবিআই ঢাকার তদন্তকারী কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম তাকে তার বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা সদর আদালতে হাজির করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম দৈনিক আমার দেশ কে বলেন, আমরা আদালতের কাছে সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম । আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে । এই মামলায় অজ্ঞাত আসামী ছিল । এই প্রথম তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে ।
গত ৬ এপ্রিল চাঞ্চল্যকর তনু হত্যা মামলার সপ্তম তদন্তকারী কর্মকর্তা তিন সন্দেহভাজন সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস ম্যাচ করার আগে অনুমতি চেয়েছিলেন।
আদালত কর্মকর্তাদের মতে, এ পর্যন্ত ৮০টি শুনানির তারিখ পেরিয়ে গেছে এবং চারটি সংস্থার সাতজন তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি পরিচালনা করেছেন। বুধবার বিকেল ৫টার দিকে তনুর বাবা-মা ও ছোট ভাই রুবেল হোসেন কুমিল্লা আদালতে হাজির হয়েছেন।
কুমিল্লা কোর্টের ইন্সপেক্টর মো. মাহমুদুর রশিদ বলেন, আজ বিকেল পাঁচটার দিকে আদালতে উঠানো হয় । আদালত তাকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে ।
এর আগে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করাতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে বহু খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে একটি জঙ্গলের মধ্যে তার লাশ পাওয়া যায়। পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। শুরুতে থানা-পুলিশ, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো রহস্য বের করতে পারেনি।
প্রথমে ২০১৬ সালের ২১ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সাইফুল ইসলামকে। পরে দ্বিতীয়বার ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ মামলার তদন্ত দেওয়া হয় কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম মনজুর আলমকে। পরবর্তীতে তৃতীয়বার ২০১৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত সিআইডির কুমিল্লার পুলিশ পরিদর্শক গাজী মোহাম্মদ ইব্রাহীম তদন্ত করেন। চতুর্থবার ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট তদন্ত কর্মকর্তা বদল করে সিআইডির নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার (বর্তমানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) জালাল উদ্দিন আহম্মদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। জালাল উদ্দিন আহম্মদ চার বছরের অধিকসময় এই মামলার কিনারা করতে পারেননি।
পঞ্চমবার ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর হত্যা মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) ঢাকার সদর দপ্তরে স্থানান্তর করা হয়। তখন তনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন পিবিআইয়ের পরিদর্শক মজিবুর রহমান। মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন পিবিআই এর পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, আসামি একজন ধরা পড়েছে, আদালত তাকে তিনদিনের রিমান্ড দিয়েছে এতে আমি সন্তুষ্ট নয় আমরা সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছিলাম। আরো কয়েকজন ধরা পড়লে বুঝতে পারব কি হবে না হবে। এখন আমি কিছুই বলতে পারছি না। আসামি সবগুলাকে আইনের আওতায় আনা হোক। আমি যাদের নাম বলেছি তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। দেশবাসী অপেক্ষায় আছে বিচার দেখার জন্য। বাহিরে যেতে পারি না সবাই বলে বিচার কবে হবে।