বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ক্রমেই বাড়ছে সহিংসতা, উগ্রতা ও অসহিষ্ণুতা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অশালীন, উস্কানিমূলক ও বেফাঁস বক্তব্য দেয়ার প্রবণতা। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ও অপতথ্যের দ্রুত বিস্তার পারস্পরিক বিদ্বেষকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ একটি গভীর সঙ্কটের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য দেখা গেলেও ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই ঐক্য ভেঙে গিয়ে নতুন করে মেরুকরণ তৈরি হয়। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভাজন আরো প্রকট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আগে ও পরে এই বিরোধ ও আক্রমণাত্মক আচরণ বাড়তে বাড়তে এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শুধু তৃণমূল পর্যায়েই নয়, কেন্দ্রীয় ও দায়িত্বশীল নেতারাও প্রতিপক্ষ সম্পর্কে অশালীন ও শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য করছেন। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের নিয়েও কটূক্তি করা হচ্ছে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এসব বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশ্লেষক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে চরিত্র হনন, সঙ্ঘবদ্ধ আক্রমণ এবং অশ্রাব্য ভাষার ব্যবহার ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সুস্থ ধারায় ফিরতে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলছে।
এ দিকে বাস্তব, ভুয়া কিংবা ছদ্মবেশী অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অপপ্রচার, ট্রলিং, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও কুৎসা রটনা বেড়েই চলেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে এআইনির্ভর ভুয়া ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরির মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো। সবমিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের সন্ত্রস্ত ও অসহিষ্ণু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উগ্র ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও চরিত্র হননের বিস্তার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে জনমানসে রাজনীতির প্রতি আস্থা কমছে, গণতান্ত্রিক চর্চা দুর্বল হচ্ছে এবং সমাজে বিভাজন বাড়ছে। তারা মনে করেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসনের পথ আরো কঠিন হয়ে পড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, এই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলা জরুরি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি বলা নয়; বরং দায়িত্বশীলতা, যুক্তিবোধ ও সম্মানবোধ বজায় রেখে কথা বলা প্রয়োজন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এবং বামপন্থী বিভিন্ন দল ও ছাত্রসংগঠনের মধ্যে মূলত ত্রিমুখী বিরোধ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরকে লক্ষ্য করে নেতাকর্মীরা নিয়মিত কটূক্তি ও আপত্তিকর মন্তব্য করছেন, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অপমানজনক মন্তব্য, বিকৃত উপস্থাপন ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চলছে। অনেক সময় এসব বক্তব্য পাল্টা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে এবং তা সঙ্ঘাতের দিকেও গড়াচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েকটি রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। পাল্টাপাল্টি মন্তব্য, প্রতিবাদ, এমনকি বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে। এতে করে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা আরো বেড়েছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে অনেক নেতা শালীনতার সীমা অতিক্রম করছেন, যা অনাকাক্সিক্ষত। এই ধরনের আচরণ শুধু অশালীন বাগযুদ্ধই তৈরি করছে না, অনেক ক্ষেত্রে তা সংঘর্ষের ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, আপত্তিকর কনটেন্ট ও বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার মাধ্যমে একটি বিষাক্ত প্রতিযোগিতা চলছে। এতে শুধু রাজনৈতিক নেতারাই নয়, তাদের পরিবারও আক্রান্ত হচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করে তুলছে।
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম মনে করেন, রাজনৈতিক নেতাদের অশালীন বক্তব্য ও আচরণ একটি অশনি সঙ্কেত। এতে জনমানসে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয় এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক পরিবেশ আরো অস্থির হয়ে ওঠে।
তার মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ বাধাগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবায়নে এই প্রবণতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনে ভাষা ব্যবহারের একটি স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। সংসদের মতো অপ্রাসঙ্গিক শব্দ বাদ দেয়ার নিয়মের মতো রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য ভাষার সীমা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অশালীন ভাষা ও আক্রমণাত্মক আচরণের বড় বাহক হয়ে উঠেছে। এই অবাধ প্রকাশের পেছনে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের মানসিকতা এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থ কাজ করছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোও পরোক্ষভাবে এসব আচরণকে উৎসাহ দিচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, আগে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের একটি সংস্কৃতি ছিল, যা এখন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত বক্তব্য ও আচরণ শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সাধারণ মানুষও এর শিকার হচ্ছেন।
তার মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজন হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সাথে রাজনৈতিক নেতাদের ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধিতা ও সমালোচনা অবশ্যই থাকতে পারে, তবে তা হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল। অন্যথায় এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণতন্ত্রের জন্য বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করতে পারে।