Image description

রাজধানীর মোহাম্মদপুর। এলাকাটির নাম শুনলেই অনেকে আঁতকে ওঠেন। কমবেশি সবাই জানেন, এখানে অপরাধের শেষ নেই। কিন্তু এ অঞ্চল ঘিরে অপরাধের যে সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে; এখানকার সন্ত্রাসীরা যে কী পরিমাণ বেপরোয়া ও নিষ্ঠুর, আর এর মাত্রা যে কতটা ভয়ংকর—তা প্রকাশেরও অতীত।

রীতিমতো অপরাধের ‘হটস্পট’ এই মোহাম্মদপুর। দলে দলে গ্রুপে গ্রুপে কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী-অপরাধীদের স্বঘোষিত অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে এলাকটি। একেক গ্রুপের একেক ‘গডফাদার’ আর বাহাার নাম! তারা প্রকাশ্যে জনমানুষের সামনে, সবকিছুকে তুচ্ছ করে যেকোনো ধরনের অপরাধ ঘটিয়ে চলছে বাধাহীনভাবে।

এই যেমন—এখানকার রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী এলাকায় গত রবিবার কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এলেক্স গ্রুপের হোতা ইমন ওরফে এলেক্স ইমন নিহত হয়েছেন।

নিহত ইমনের বিরুদ্ধে ছিনতাই, হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র থেকে জানা যায়, রায়েরবাজার এলাকায় এলেক্স ইমন গ্রুপ ও আরমান-শাহরুখ গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে রবিবার বিকেলে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে ইমন নিহত হন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অস্ত্র হাতে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে ধাওয়া করছে।

এই সময় ইমন পড়ে যান। তাঁর হাতেও ধারালো অস্ত্র ছিল। ৮-১০ জন মিলে ধারালো অস্ত্র দিতে কুপিয়ে ইমনকে হত্যা করে। এই নৃশংস হত্যার ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। 

জানা যায়, অপরাধ কমাতে মোহাম্মদপুর থানা ভেঙে আদাবর নামে আরেকটি থানা করা হলেও এখানে অপরাধ কমেনি, বরং বেড়েছে।

  ইতিহাস, জনবসতি, ভৌগোলিক অবস্থান, দীর্ঘদিনের মাদক কারবার, জেনেভা ক্যাম্প, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ—সব মিলিয়েই মোহাম্মদপুর অপরাধপ্রবণতার ক্ষেত্রে রাজধানীর অন্যতম আলোচিত এলাকা।

চুরি, ছিনতাই, হত্যা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, দখল, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার—সব অপকর্মের শীর্ষে মোহাম্মদপুর। সন্ত্রাসী গ্রুপের পাশাপাশি এখানে রয়েছে অসংখ্য কিশোর গ্যাং। এখানকার সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে অন্তর্কোন্দল ছাড়াও সাধারণ মানুষকে হত্যা এবং অস্ত্রের মুখে ছিনিয়ে নিচ্ছে সর্বস্ব। শুধু রাতে না, দিনেও চলে অস্ত্রের মহড়া। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে লুট হওয়া থানার তালিকায় মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানাও রয়েছে। মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদের একটা বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি, যা রয়েছে সন্ত্রাসীদের হাতে।

পুলিশ বলছে, অপরাধের বহুমাত্রিকতা ও গুরুত্বের ব্যাপকতার তুলনায় জনবল ও লজিস্টিক নেই। যে কারণে মোহাম্মদপুরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম সব থেকে বেশি। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে গড়ে ১০০টির মতো মামলা হয় মোহাম্মদপুর থানায়। সব শেষ গত মাসে হয়েছে ৯৪টি মামলা, যা আশপাশের কয়েকটি থানার মামলার যোগফলের সমান। 

পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ভৌগোলিক অবস্থার কারণে অপরাধীরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম  শেষ করে সহজে মোহাম্মদপুর থেকে পালাতে পারে। এর অন্যতম কারণ, মোহাম্মদপুর থানা এলাকার পশ্চিম পাশজুড়ে নদী ও চরের বিস্তীর্ণ অভয়ারণ্য রয়েছে। সন্ত্রাসীদের জন্য অপরাধ শেষে নদী পেরিয়ে পালানোর সহজ পথ এটি। এ ছাড়া বেড়িবাঁধের পশ্চিম পাশে গত কয়েক বছরে অনেক হাউজিং গড়ে উঠেছে। এসব এলাকায় অনেক বস্তি রয়েছে। উত্তরে আদাবর থানা এলাকাও ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কারণে মোহাম্মদপুর হিসেবে গণ্য হওয়ায় দুই এলাকায় সন্ত্রাসীরা সহজে পালাতে পারে।

পূর্ব পাশে জেনেভা ক্যাম্প সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের বাসস্থান। দক্ষিণে হাজারীবাগ এলাকার একটা বড় অংশজুড়ে নিম্ন আয়ের মানুষের বাস। রয়েছে অসংখ্য বস্তি। এখান থেকেও মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, কবরস্থানসহ আশপাশের এলাকায় এসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে পালিয়ে যায়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর লোকজন টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও প্রভাব বিস্তারের জন্য লড়াই করে। আর এ কাজে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অনেক সময় শক্তভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে না বলেও অভিযোগ আছে।

স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও র‌্যাবের দেওয়া তথ্য মতে, মোহাম্মদপুরে ১৮-২০টা গ্যাং রয়েছে। এই গ্রুপগুলোতে ১০০ থেকে এক হাজার পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। তাদের এই গ্রুপের সদস্যরা আশপাশের থানা এলাকা থেকেও আসে।

র‌্যাবের দেওয়া তথ্য বলছে, মোহাম্মদপুরে কবজি কাটা আনোয়ার গ্রুপের প্রধান আনোয়ার ওরফে শ্যুটার আনোয়ার ওরফে কবজি কাটা আনোয়ার, কিলার আকরাম গ্রুপের প্রধান আকরাম ওরফে কিলার আকরাম, টুণ্ডা বাবু গ্রুপের প্রধান মো. বাবু খান ওরফে টুণ্ডা বাবু ও মো. রুবেল ওরফে পানি রুবেল, বোমা গ্রুপের প্রধান আরমান ওরফে বোমা আরমান, গিটঠা গ্রুপের প্রধান গিটঠা মিঠু, কসাই গ্রুপের প্রধান কসাই সোহেল এবং কসাই গ্রুপের প্রধান সোহেল। এসব গ্রুপের প্রধানদের হয়ে হাজারো কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত। র‌্যাবের তালিকায় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মো. জহিরুল ইসলাম ও মো. লিয়াকত আলী লিমনের নাম রয়েছে। এসব গ্রুপের হাজারের বেশি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

এ ছাড়া নবী হোসেনের গ্রুপ, এক্সেল বাবু গ্রুপ, পাপ্পু গ্রুপ, কিলার বাদল গ্রুপ, কিলার লাল্লু গ্রুপ, জনি রনি কিশোর গ্যাং, গাংচিল বাহিনীর লম্বু মোশারফ গ্রুপের সন্ত্রাসী কার্যক্রমে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা। তাঁরা ভয়ে মুখ খোলেন না। আবার মামলা করতেও ভয় পান। অনেকেই গোপনে উপকমিশনারের (ডিসি) অফিসে অভিযোগ করেছেন। এ রকম কয়েকটি অভিযোগের কপি পাওয়া গেছে।

চলতি মাসের ৭ এপ্রিল রাত সাড়ে ১২টার দিকে মোহাম্মদপুর শেরশাহসুরী রোডে দুই ছিনতাইকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে সামুরাই ঠেকিয়ে এক ব্যক্তির মোবাইল, মানিব্যাগ ছিনতাই করে। পরে সিসিটিভিতে ধরা পড়া এই ভিডিও ভাইরাল হলে দুই ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ ও পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ২০টির মতো ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে যেগুলোর সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায় সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। না হলে তদন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। আবার এসব ছিনতাইয়ের ক্ষেত্রে বেশির ভাগই হয় সাধারণ ডায়েরি (জিডি)। ফলে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে ছিনতাইকারীরাও সুযোগ পায়। 

কার হাতে কোন মহল্লার নিয়ন্ত্রণ : মোহাম্মদপুর থানা এলাকা ২৯, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান ও পুলিশের দেওয়া তথ্য মতে, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের লিটন মাহমুদ বাবু ওরফে তেরেনাম বাবুর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পুরা মোহাম্মদপুরে। তেরেনাম বাবু নামেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে পরিচিত তিনি। এ ছাড়া এই ওয়ার্ডের মধ্যে জহুরী মহল্লা ইমন মুন্সীর নিয়ন্ত্রণে। শুক্কুর আলামীনের নিয়ন্ত্রণে বিজলি মহল্লা। টিক্কাপাড়া, আজিজ মহল্লার এক অংশ, সূচনা কমিউনিটি সেন্টার এলাকার রিং রোডের অংশের  নিয়ন্ত্রণ কাইয়ুমের হাতে। কৃষি মার্কেট ও এই মার্কেটের আশপাশে আজিজ মহল্লার অংশ এবং কৃষি মার্কেটের লাগোয়া বিহারি ক্যাম্প এনামুল হক রবিনের নিয়ন্ত্রণে।

৩১ নম্বর ওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণ রবিন ও ঢালী মিয়ার হাতে। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের পুরোটার নিয়ন্ত্রণ জাহিদ হোসেন মোড়ল ওরফে জাহিদ মোড়লের হাতে। গত বছরের ২৪ মার্চ, ২৮ এপ্রিলসহ কয়েক দফায় মোহাম্মদপুর টাউন হলের মনির নামের এক ব্যবসায়ীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গুলি চালান এই জাহিদ মোড়ল ও তাঁর সহযোগীরা। চাঁদা চেয়ে না পেয়ে ওই ব্যবসায়ীকে কয়েক দফায় হুমকি দেন জাহিদ। এই ঘটনা ব্যাপক আলোচিত হয় সে সময়।

মোহাম্মদপুরে সব থেকে আলোচিত ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড। শীর্ষ সন্ত্রাসী বাদল ওরফে কিলার বাদলের নেতৃত্বে এই এলাকায় বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং চক্র রয়েছে। তাঁর নির্দেশে এই চক্রের সদস্যরা মোহাম্মদপুরজুড়ে ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির আধিপত্য বিস্তার করেছেন। পুলিশের তথ্য মতে, কিলার বাদলের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজিসহ অন্তত শ খানেক মামলা রয়েছে। তাঁর অন্যতম সহযোগী হিসেবে লালু উদ্দিন লালু অন্যতম। বাদলের নির্দেশে লালু কিশোর গ্যাং সদস্যদের নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ছাড়া এই ওয়ার্ডে পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু বর্তমানে আলোচিত সন্ত্রাসী। বর্তমানে ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বড় একটা অংশের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে। এ ছাড়া মোহাম্মদপুরজুড়েই তাঁর সন্ত্রাসী কার্যক্রম। মোল্লা কাওসার (বর্তমানে কারাগারে), কাইল্লা বাদল, ঘাট বাবু, হাবিব, আহমেদ আলী, মান্নান, কিশোর গ্যাং লিডার মাহি ও গ্যারেজ সোহেলের নাম এসেছে। তাঁদের সবার মূলে রয়েছেন কিলার বাদল। মোহাম্মদপুর এলাকায় জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খলিলের ওপর হামলার অভিযোগে গত ১ মার্চ সোহেল ওরফে গ্যারেজ সোহেলকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। এ সময় তাঁর কাছ থেকে বিদেশি রিভলবারসহ দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়। পুলিশের তথ্যে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের নিয়ন্ত্রণে সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমন, পাপ্পু ওরফে কিলার পাপ্পু, কাইল্লা বাদল, পিন্টু, রাজেশ খান ও ওসমানের নাম এসেছে।

৩০ নম্বর ওয়ার্ড আদাবর থানা এলাকায় পড়েছে। চাঁদাবাজি, মাদক, কিশোর গ্যাং আদাবর ও মোহাম্মদপুরে ত্রাসের আরেক নাম মনোয়ার হোসেন জীবন ওরফে লেদু হাসান। এ ছাড়া সজিব আহম্মেদ রানা, হাসান বসুনিয়া, কামরুজ্জামান জুয়েল, ফরিদ উদ্দিন বাবু ওরফে এক্সেল বাবু ও আলমগীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন। এই আলমগীর শীর্ষ সন্ত্রাসী নবী হোসেন গ্রুপের সদস্য। নাম প্রকাশ না করে কয়েকজন এলাকাবাসী অপরাধী ধরতে পুলিশের অনীহার কথা জানান।

মোহাম্মদপুরের বিষফোড়া জেনেভা ক্যাম্প : ভাই আমার মাল (ইয়াবা) ভালো, কয় পিস লাগবে? আরেকজন এসে বলেন, আমারটা নেন। এখানকার সবার থেকে আমার মাল ভালো। গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে বিহারি ক্যাম্পের বাইরে লাগোয়া পূর্ব পাশের রাস্তায় (হুমায়ুন রোড) যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে মাদক কারবারিরা এসে ঘিরে ধরে এভাবে মাদক বিক্রি করতে চান। এই রাস্তায় মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে রিকশার জ্যাম তৈরি হয়। কারণ একটা বড় অংশ মাদক ক্রেতা রিকশাচালক। এখানে প্রধানত ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা বিক্রি হয়। মাদক কারবারিরা প্রকাশ্যে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা এখানে মাদক বিক্রি করেন। হাতে ছোট ছোট প্যাকেটে ইয়াবা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এই রাস্তা দিয়ে যেই যান তাঁকেই মাদক কিনতে বলেন। হেরোইন বিক্রি হয় ছোট ছোট পুড়িয়ায় করে।

এদিকে ছোট ছোট গাঁজার পুড়িয়া ব্যাগভর্তি করে এনে বিক্রি করা হয়। মনে হচ্ছিল মাদকের হাট। মোট তিন দিন এই এলাকায় গিয়ে একই চিত্র দেখা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটা বিহারি ক্যাম্পের নিয়মিত চিত্র। পুলিশ নামমাত্র অভিযান করেন। এমনকি এখান থেকে মাদকের টাকা পুলিশের পকেটে যাওয়ারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। পুলিশের তথ্য মতে, সব মিলিয়ে বিহারি ক্যাম্পে ২৫টির মতো স্থানে মাদকের কারবার হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পে মাদক কারবার ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে শিশুসহ অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শ শ মানুষ। গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও রয়েছে অনেক। এ ছাড়া দেশীয় অস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার হয় এখানে। মাঝে মাঝে যৌথ বাহিনীসহ থানা পুলিশ, ডিবি পুলিশের অভিযান চললেও ক্যাম্পের মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভাষ্য, আওয়ামী লীগের আমলে ১৭ বছর ধরে জেনেভা ক্যাম্পের মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেলের হাতে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ নিতে পিচ্চি রাজা, গালকাটা মনু ওরফে পার মনু ও চুয়া সেলিমের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় বুনিয়া সোহেল গ্রুপের। সব শেষ গত ২৯ নভেম্বর শীর্ষ মাদক কারবারি বুনিয়া সোহেলকে ধরে নিয়ে গণপিটুনি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছে প্রতিপক্ষ মাদক কারবারিরা। পরে চিকিৎসা শেষে বুনিয়া সোহেল এখন কারাগারে আছেন। বুনিয়া সোহেলের সাম্রাজ্য ধংসের পর বর্তমানে পার মনু, পিচ্চি রাজা ও চুয়া সেলিম ক্যাম্পের মাদকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কারবার চালাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে পার মনু হিরোইনের কারবার নিয়ন্ত্রণ করেন। চুয়া সেলিম ও পার মনু আত্মীয়। মূলত ক্যাম্পের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন পার মনু। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মাদক মাফিয়া চাপা আরিফের কাছ থেকে বিহারি ক্যাম্পে হেরোইন যায় পার মনুর কাছে। এই চাপা আরিফের খোঁজে র‌্যাব কাজ করছে বলেও জানা গেছে। পুলিশের ভাষ্য, ৫ আগস্ট থানা লুটের সময় জেনেভা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীরা মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে বেশ কিছু অস্ত্র লুট করে, যার একটা অংশ এখনো তাদের হাতে রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেনেভা ক্যাম্পের এক বাসিন্দা কালের কণ্ঠকে বলেন, আমার দুই সন্তান স্কুলে পড়ে। খুবই মানবেতর জীবনযাপন করি আমরা। ক্যাম্পে মাদক কারবারিদের আতঙ্কে থাকতে হয় আমাদের। তাদের কেউ কিছু বলতে পারে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অভিযান হলেও যারা মূলে আছে তাদের ধরে না। মাদক কারবারিদের জন্য আমাদের হয়রানির মুখে পড়তে হয় নিয়মিত। এই মাদক কারবারিদের জন্য ক্যাম্পে শান্তি নেই।

জেনেভা ক্যাম্পকে মোহাম্মদপুরের জন্য একটা বিষফোড়া বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, মোহাম্মদপুরে বিহারি ক্যাম্পে অপরাধীদের শক্তি অনেক গভীরে। পুলিশের গোয়েন্দা শাখাকে আরো বেশি সক্রিয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা দরকার। জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধী এবং ক্যাম্পের বাইরে থেকে যারা শক্তি জোগাচ্ছে, সবার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে হবে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে টার্গেটভিত্তিক অভিযান চালাতে হবে।

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান কালের কণ্ঠকে বলেন, মোহাম্মদপুর ফাঁড়ির টিম আমরা ডিউটিতে রেখেছি সেখানে। ফাঁড়ির টিম এক রাস্তা দিয়ে ঘুরে আরেক রাস্তায় গেলেই আবার মাদক বিক্রি শুরু হয়ে যায়। আমাদের জনবল স্বল্পতার কারণে একই সময় সব ডিউটি দিতে পারি না। বিষয়টা আমাদের নলেজে আছে। আমরা কাজ করতেছি। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্যাম্পে পুলিশের আনাগোনা কম। তা ছাড়া পুলিশ অভিযানে আসার আগেই মাদক কারবারিদের হাতে তথ্য চলে আসে এবং তাঁরা আত্মগোপনে চলে যান। 

লুট হওয়া অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে : মোহাম্মদপুর থানা সূত্রে জানা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর মোহাম্মদপুর থানায় হামলা চালিয়ে ৫৮টি সরকারি আগ্নেয়াস্ত্র লুট করা হয়। এ সময় পুলিশের দুই হাজার ৩৯৪টি গুলি ও চার হাজার ৩৪১টি শর্টগানের গুলি লুট হয়। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত দুটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি অস্ত্র ও গুলির এখনো সন্ধান মেলেনি। তবে থানায় জমা রাখা সাইসেন্স করা বেসরকারি অস্ত্রের সংখ্যাও কম ছিল না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুর থানার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন,  ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট মোহাম্মদপুর থানায় আগুন দেওয়া হয়। এ সময় সেখানে বেসরকারি পর্যায়ের ৪৬৩ জনের অস্ত্র জমা ছিল। অনেকের একের অধিক অস্ত্র জমা ছিল। সেই হিসাবে আনুমানিক ৬০০-এর বেশি বেসরকারি অস্ত্র থানা থেকে লুট হয়। এ ছাড়া হাজার হাজার গুলি খোয়া যায়। এসব অস্ত্র ও গুলির সন্ধান মেলেনি।

থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের বিষয়ে ডিসি ইবনে মিজান বলেন, লোকাল সোর্সের মাধ্যমে আমরা অস্ত্রের তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছি। তিনি আরো বলেন, মোহাম্মদপুর থানাটা অনেক বড়। এই থানা এলাকায় ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষের বাস, যেটা ছোটখাটো একটা জেলার সমান। এক-দেড় শ পুলিশ দিয়ে এটা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য।