ত্রয়োদশ সংসদের সংরক্ষিত ৫০ নারী আসনের ৩৬টি পাবে ক্ষমতাসীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। এ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই নিজেদের প্রার্থিতা নিশ্চিতে তৎপরতা শুরু করেছেন বিএনপির অন্তত ১২শ নারী নেত্রী। দলটির নেতারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত প্রার্থিতা বাছাইয়ে ত্যাগী ও যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে বহু নারী নির্যাতিত হয়েছেন। বিএনপির অনেক নেত্রী শুধু ফেসবুকে একটা মতামত দেওয়ার কারণে মাসের পর মাস কারাগারে ছিলেন। রাতের বেলায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দলের কাছে এগুলো বড় ধরনের বিবেচনার বিষয়। আবার প্রার্থীর আইন প্রণয়নের বিষয়ে ধারণা থাকতে হবে। সাংগঠনিক দক্ষতাও থাকতে হবে।’
জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য খুব শিগগিরই মনোনয়নপত্র বিতরণ শুরু করবে বিএনপি। তবে এর আগেই দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। আগ্রহীদের কেউ তদবির করছেন ঢাকায়, আবার কেউ মাঠ পর্যায়ে নিজের অবস্থান সংহত করতে এলাকায় জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, সংসদের সাধারণ আসনে যে দল যত আসনে জয়ী হয়, সেই অনুপাতে সংরক্ষিত ৫০ আসন তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। এবার বিএনপি এককভাবে ২১৩টি আসনে জয় পাওয়ায় ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন পাবে। অন্যদিকে, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সাত আসনে জয়ী হওয়ায় তারাও একটি সংরক্ষিত আসন পাবেন। বাকি ১৩টি পাবে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট।
বিএনপি নেতারা জানান, গত নির্বাচনে অন্তত ৫০টি আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন নারী নেত্রীরা। তখন মনোনয়নবঞ্চিতদের অনেকে এখন সংরক্ষিত নারী আসনের দৌড়ে এগিয়ে আছেন।
আলোচনায় যাদের নাম
সংরক্ষিত আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ইতোমধ্যেই বেশকিছু নাম আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে ডা. জুবাইদা রহমানের নামও রয়েছে। যদিও তার সরাসরি রাজনীতিতে নামার গুঞ্জন নতুন নয়, তবে এ বিষয়ে দলের নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন সেলিমা রহমান, আফরোজা আব্বাস, হাসিনা আহমেদ, সুলতানা আহমেদ, হেলেন জেরিন খান, রুমানা মাহমুদ, সাবিনা ইয়াসমিন ছবি ও শিরিন সুলতানার মতো নেত্রীরা। কেন্দ্রীয় নেত্রী ও সাবেক এমপিদের মধ্যে শাম্মী আক্তার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, নিলোফার চৌধুরী মনি ও রেহেনা আক্তার রানুর নামও আলোচনায় রয়েছে।

সাংস্কৃতিক অঙ্গন থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন বেবী নাজনীন, রিজিয়া পারভিন, কনক চাঁপা ও নাজমুন নাহার ন্যান্সি। আইন অঙ্গন থেকে অ্যাডভোকেট সিমকী ইমাম ও ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানার নাম সামনে আসছে। এছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অপর্ণা রায় চৌধুরী, নিপুণ রায় চৌধুরী, মাহারীন খান, ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুণি ও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি মনোনয়ন পেতে পারেন।
তৃণমূল ও ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা নেত্রীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন সেলিনা সুলতানা নিশিতা, অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, নাদিয়া পাঠান পাপন, আসমা আজিজ, ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, নাসিমা আক্তার কল্পনা, বিথীকা বিনতে হুসাইন, সানজিদা ইয়াসমিন তুলি প্রমুখ। শিক্ষাঙ্গন থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজমেরী ইসলাম এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. নাহারিন খান। এছাড়া গত নির্বাচনে পরাজিত নারী প্রার্থীদের মধ্য থেকেও কয়েকজন মনোনয়ন পেতে পারেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। তাদের মধ্যে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, সাবিরা নাজমুল, নাদিরা চৌধুরী প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।

পাঁচ যোগ্যতায় মিলবে মনোনয়ন
সংরক্ষিত আসনের প্রার্থী বাছাইয়ে চারটি মূল বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি। প্রথমত, ১৫ বছরের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং জেল-জুলুমের শিকার নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, যারা টকশোসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে সাবলীলভাবে দলীয় অবস্থান তুলে ধরতে পারেন, তাদেরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তৃতীয়ত, দল ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং এলাকায় জনপ্রিয়তার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হবে। চতুর্থত, প্রার্থীকে অবশ্যই শিক্ষিত ও যোগ্য হতে হবে। পঞ্চমত, প্রার্থীকে অবশ্যই সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি আইন সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
থাকতে পারে চমক
বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছেন, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের চমক থাকতে পারে। অনেক ত্যাগী কিন্তু কম পরিচিত নেত্রী মনোনয়ন পেতে পারেন। আবার কিছু প্রভাবশালী সিনিয়র নেত্রীর বাদ পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলে অসংখ্য যোগ্য নারী নেত্রী রয়েছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের অবদান বিবেচনা করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান। তবে এবার তরুণদের মূল্যায়ন বাড়তে পারে।’
সরকারদলীয় চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাজপথের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ও ত্যাগী নেত্রীরা অগ্রাধিকার পাবেন। যারা রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত এবং সংসদে ভূমিকা রাখতে পারবেন এমন নেত্রীদেরই সংসদ নেতা খুঁজে বের করবেন।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংরক্ষিত নারী আসনে আগ্রহী ১ হাজার ২০০ জনের জীবনবৃত্তান্ত এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা পড়েছে। চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণার আগে নিজ নিজ প্রার্থিতা নিশ্চিতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।