দেশের বিভিন্ন জেলায় আবারও ছড়িয়ে পড়ছে ছোঁয়াচে রোগ হাম। এ রোগে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পাওয়ায় বাড়ছে জটিলতা, এমনকি মৃত্যুও। চলতি (মার্চ) মাসেই সারাদেশে হাম আক্রান্ত হয়ে ৪১ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যা অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরাসরি হামেই শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে—এমনটা সব ক্ষেত্রে বলা না গেলেও, হাম-পরবর্তী জটিলতাই মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে জ্বর, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক শিশুর অবস্থার অবনতি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন হচ্ছে, আর গুরুতর অবস্থায় নিতে হচ্ছে নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ)।
এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী—তা জানতে জাগো নিউজের এই প্রতিবেদক কথা বলেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেনের সঙ্গে।
কমিউনিটি পর্যায়ে সতর্কতা জরুরি
ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘প্রথমত, কমিউনিটি পর্যায়ে যেসব শিশুর জ্বর ও শরীরে র্যাশ (ফুসকুড়ি) রয়েছে, তাদের দ্রুত অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখতে হবে। কারণ হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ—একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে সহজেই অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুকে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শুরু করতে হবে।’
শিশুদের জন্য পৃথক অক্সিজেন সুবিধা নিশ্চিতের আহ্বান
দ্বিতীয় পরামর্শ হিসেবে তিনি গুরুত্ব দেন হাসপাতাল পর্যায়ের প্রস্তুতির ওপর। তিনি বলেন, ‘হাম আক্রান্ত অনেক শিশু নিউমোনিয়ায় ভোগে এবং তাদের অক্সিজেন সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য উপযোগী অক্সিজেন সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে।’
তার ভাষায়, ‘বয়স্কদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ কিছুটা থাকলেও শিশুদের জন্য আলাদা সরু নল ও ভিন্নমাত্রার সরবরাহ প্রয়োজন হয়, যা অনেক হাসপাতালে নেই। জরুরি ভিত্তিতে এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব।’
গুরুতর রোগীদের জন্য এনআইসিইউ সাপোর্ট
তৃতীয় পরামর্শ হিসেবে ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘যেসব শিশু মারাত্মক নিউমোনিয়া বা অন্যান্য জটিলতায় আক্রান্ত হয়, তাদের জন্য এনআইসিইউ সাপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অক্সিজেন নয়, সেখানে অন্য জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসাও প্রয়োজন হয়।’
ঝুঁকি কতটা?
হামে আক্রান্ত হলেই মৃত্যু—এমন ধারণা সঠিক নয় বলে জানান এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সাধারণত প্রতি এক হাজার আক্রান্ত শিশুর মধ্যে একজনের মৃত্যু হতে পারে। তবে যেসব শিশু তীব্র জ্বর, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় ভোগে, তাদের মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি বেশি।’
অক্সিজেন ব্যবস্থাপনার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ
ডা. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘করোনাকালে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে অক্সিজেন লাইন স্থাপন ও সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। কিন্তু পরে নানা কারণে সেগুলোর অনেকই অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে এখন আবারও অক্সিজেনের অভাবে শিশু মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে।’
উপসংহার
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং গুরুতর রোগীদের জন্য উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।