সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিগগিরই দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে সরকার। এই অভিযানে চিহ্নিত অপরাধীদের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের একটি সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তালিকা প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এপ্রিলেই মাঠপর্যায়ে অভিযান শুরু হবে। অভিযানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী অথবা ২০০২ সালের ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ আদলেই অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখনো অভিযানের নাম চূড়ান্ত করা হয়নি। সারা দেশের জেলা পুলিশ সুপার ও গোয়েন্দা সংস্থার পৃথক তালিকা চূড়ান্ত হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা হবে। অপরাধের ধরন বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় থেকে নাম নির্ধারণ করে অভিযান শুরুর কথা রয়েছে।
এর আগে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেছেন, সরকার দুই-তিন মাসের মধ্যেই ‘অপারেশন ক্লিনহার্টের’ মতো একটি অভিযান চালাবে। গত ৮ মার্চ দুপুরে ফেনী জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে যারা অন্যায় করছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। সরকার এই ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেবে না।’
পরিবেশমন্ত্রী বলেন, ‘মাদক সমাজের প্রধান সমস্যা। মাদকাসক্ত ও মাদককারবারী কারা এটা সবার জানা। অভিযান চালিয়ে তাদের ধরা দরকার। এ ছাড়া কিশোর গ্যাং প্রশ্নেও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছে। এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদেরও ধরতে হবে।’
সূত্রমতে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, সহিংসতা, দখলবাজি, চাঁদাবাজি ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে পুলিশ, র্যাব এবং রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি নিরপেক্ষ তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই তালিকায় স্থান পাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও চক্র। এর মধ্যে রয়েছে—সহিংসতা ও নাশকতা, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা, অনলাইন প্রতারণা এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা। পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় এমন ব্যক্তিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা অতীতে সহিংস কর্মসূচি বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীর নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তালিকায় থাকা এসব ব্যক্তি যদি সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নেন বা সহিংসতা উসকে দেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কোনো ব্যক্তি পলাতক অবস্থা থেকে ফিরে এসে বা জামিনে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করলে তাকে অযথা হয়রানি বা গ্রেপ্তার করা হবে না বলেও জানানো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের আগে ও পরে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলা ও থানা পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ প্রায় শেষ হয়েছে এবং যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। ভবিষ্যতেও এই তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে বলেও জানা গেছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কর্মকর্তারা বলছেন, এই তালিকা কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হচ্ছে না। বরং যারা বাস্তবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার সক্ষমতা রাখে, শুধু তাদেরই চিহ্নিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগঠিত করার সক্ষমতা রয়েছে—এমন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি নজরদারি রাখা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ‘সরকার ঢালাও গ্রেপ্তার’ নীতি থেকে সরে এসে ‘টার্গেটেড অ্যাকশন’-এর দিকে যাচ্ছে। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হবে। কেউ আন্দোলনের নামে সহিংসতা বা নাশকতার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
অভিযানের সময় বিশেষ নজরদারিতে রাখা হবে পেশাদার অপরাধীদের। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যাকাণ্ড, মাদক ব্যবসা ও অনলাইন জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে থানা পর্যায়ে পুরনো অপরাধীদের তালিকা হালনাগাদ এবং নতুন করে তথ্য সংযোজনের কাজ চলছে।
এদিকে ঈদের পর মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা বাড়ায় হাইওয়ে পুলিশও তৎপর হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোয় বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কুমিল্লা, আশুলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সাম্প্রতিক ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তরের ডিআইজি (অপারেশন) হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি আশুলিয়া ও কুমিল্লা এলাকায় গরুভর্তি ট্রাক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আমরা ট্রাকসহ কিছু গরু উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার করতে থানা পুলিশের সঙ্গে যৌথভাবে অভিযান চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে রাত্রীকালীন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে টহল বাড়ানো হয়েছে এবং পূর্বে ডাকাতির সঙ্গে জড়িতদের তালিকা ধরে গ্রেপ্তার অভিযান চলছে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতে, এই ধরনের সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। তবে অভিযানের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে তা রাজনৈতিক বিতর্কেরও জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের দারা বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, পলাতক আওয়মী লীগ নেতাদের ফেল যাওয়া ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কিছু দখলদারদের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সার্বিকভাবে, সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে একদিকে যেমন কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে, অন্যদিকে নির্দোষ ব্যক্তিদের হয়রানি না করার বিষয়েও সতর্ক থাকার বার্তা দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট মহল।