রামু শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের পূর্ব লামারপাড়ার ঘোনারপাড়া এলাকায় ঢুকতেই দেখা যায় ১০ একরের ২০০ ফুট উঁচু একটি পাহাড় কাটা চলছে। প্রায় ৪০ শতাংশ কাটা শেষও হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়ন বিএনপির নেতা এনাম ও যুবলীগ নেতা ওবায়দুল হকের নেতৃত্বে পাহাড়টি কাটা হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত তিন-চারটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে পাহাড় কেটে মাটি বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। এ ছাড়াও ডাম্প ট্রাক দিয়ে জেলার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পেও মাটির জোগান দেওয়া হচ্ছে। পাহাড় কাটার কারণে রাস্তাগুলোও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। পরিবেশ বিধ্বংসী এ কর্মকাণ্ডে কেউ বাধা দিলে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা। জানতে চাইলে বিএনপি নেতা এনাম সমকালকে বলেন, পাহাড়ের মালিকরাই পাহাড় কাটছেন, এ কাজে আমরা জড়িত নই।
শুধু এ পাহাড়টি নয়, ঈদুল ফিতরের ছুটিতে সরকারি অফিস বন্ধ থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়ে রামু উপজেলার কাউয়ারখোপ এবং দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নে অন্তত আটটি পাহাড় কেটে সাবাড় করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বিচারে বালু উত্তোলনে ধ্বংস করা হচ্ছে প্রাকৃতিক বন। বিশেষ করে কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের লামারপাড়া ও উখিয়ারঘোনা এলাকায় ব্যাপকভাবে পাহাড় কাটা চলছে। দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নে ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের নামে সংরক্ষিত বন কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। স্থানীয় নেছার, নজির আলম, আমানের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি সিন্ডিকেট পাহাড় কাটার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতি করেন বলে জানান স্থানীয়রা।
কক্সবাজারভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক বলেন, ঈদে বন্ধের সুযোগে রামুর কাউয়ারখোপ ও দক্ষিণ মিঠাছড়িতে যেভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটা হয়েছে, তা কক্সবাজার জেলায় অতীতের সব পাহাড় কাটাকে হার মানিয়েছে। পাহাড়খেকোদের দলীয় বিবেচনায় না দেখে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রামু উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল বাশার বাবু বলেন, পাহাড় কাটায় সংগঠনের কেউ জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ঈদুল ফিতরের আগে মাসিক জেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় জেলা প্রশাসকসহ উপস্থিত সবাইকে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছিল, ঈদের ছুটিতে সরকারি অফিস বন্ধ থাকার সময়ে দুষ্কৃতকারীরা পাহাড় কাটতে পারে। তিনি আরও বলেন, রোববার (আজ) অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে কাউয়ারখোপ এলাকায় পাহাড় কাটার জায়গায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি দল পাঠানো হবে।
কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বাঁকখালী রেঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাউয়ারখোপ ইউনিয়নে পাহাড় কাটার খবর পাওয়ার পর পরিদর্শন করে দেখা গেছে, এ পাহাড়গুলোর কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন আর কিছু অংশ ১ নম্বর খাস খতিয়ানের। পরে বিষয়টি রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বানী চৌধুরী বলেন, আসলে পাহাড় কাটা নিয়ে অনেক জায়গা থেকে ফোন আসে। এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্ট করে বিষয়টি মনে করতে পারছি না। সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে সহযোগিতা করার জন্য এ প্রতিবেদককে অনুরোধ জানান তিনি।
বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলা
দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নে পাহাড় কেটে মাটি পাচারের অভিযোগে পাহাড়ের মাটিসহ একটি ডাম্প ট্রাক জব্দ করে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ। এ ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আসামিরা হলেন– দক্ষিণ মিঠাছড়ির নুরুল আবছার, মোক্তার আহমদ, জসিম উদ্দিন ও শফিকুর রহমান।
কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের পানেরছড়া রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা শরীফুল আলম বলেন, তারা পাহাড়গুলো রক্ষায় সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এর পরও কিছু কিছু জায়গায় বালু উত্তোলনের নামে সংরক্ষিত বন ধ্বংস করা হচ্ছে। বিষয়টি রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত চার মাসে পাহাড় কাটার অভিযোগে ২৬টি মামলা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দক্ষিণ মিঠাছড়ি এলাকায় পাহাড় কাটার ঘটনায় দুজনের বিরুদ্ধে রামু থানায় একটি মামলা হয়েছে। আসামিরা হলেন– মোক্তার আহমেদ মেম্বার ও মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিদর্শক মুছাইব ইবনে রহমান মামলাটি করেন।