এখানে ঈদের জামাতের সূচনা হয় না মসজিদের মতো একামতের ধ্বনিতে। বরং নির্ধারিত সময় ঘনিয়ে এলে হঠাৎই ভেসে আসে বন্দুকের গুলির শব্দ। সেই শব্দই যেন আহ্বান-কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে পড়েন লাখো মুসল্লি। যুগের পর যুগ ধরে চলে আসা এই রেওয়াজ আজও শোলাকিয়াকে দিয়েছে অনন্য পরিচিতি।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে নির্দিষ্ট বিরতিতে শর্টগানের গুলি ছোড়া হয়। প্রথম গুলির শব্দেই সতর্ক হন মুসল্লিরা, আর শেষ গুলির পরপরই শুরু হয় নামাজ। এই ব্যতিক্রমী পদ্ধতির সূচনা কবে-তার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস না থাকলেও, স্থানীয়দের কাছে এটি বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শোলাকিয়ার ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। ইমামতি করবেন বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ১৭৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঈদগাহ প্রায় ২৭৬ বছরের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ঈদের নামাজ আদায় করে আসছেন মুসল্লিরা।
ইতিহাস বলছে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মানুষের অংশগ্রহণে এক বিশাল জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ‘সোয়ালাখ’ শব্দ থেকেই সময়ের ব্যবধানে ‘শোলাকিয়া’ নামটির জন্ম-এমনটাই প্রচলিত আছে স্থানীয়দের মধ্যে।
তবে শুধু ঐতিহ্য নয়, বিশাল এই সমাবেশকে ঘিরে রয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি। কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন এশিয়া পোস্টকে জানান, চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মাঠে থাকবে র্যাব, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট এবং বোম ডিসপোজাল টিম। ঈদগাহে প্রবেশের আগে মুসল্লিদের একাধিক চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হবে। কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে ছয় স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম।
এ বিষয়ে শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সকাল ১০টার জামাতকে কেন্দ্র করে নেওয়া হয়েছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ব্যাগ বহনে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ।
এদিকে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় নিরাপত্তা জোরদারে বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা, স্থাপন করা হয়েছে ৬টি ওয়াচ টাওয়ার। দায়িত্ব পালন করবে প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্যসহ র্যাব, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা। থাকবে ড্রোন নজরদারি ও মেটাল ডিটেক্টর। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে চালু করেছে ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। মাঠজুড়ে রাখা হয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, অজুখানা ও অস্থায়ী টয়লেট-যাতে লাখো মানুষের এই সমাগমে কোনো ভোগান্তি না হয়।