Image description

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ও আশাশুনির জেলে পল্লীতে এবার ঈদের প্রস্তুতি প্রায় নেই বললেই চলে। নতুন কাপড় কেনা তো দূরের কথা, অনেক পরিবারই ঠিকমতো খাবারের সংস্থান করতে হিমশিম খাচ্ছে। দস্যুদের দৌরাত্ম্যে সুন্দরবনে যেতে না পারায় তাদের আয় কমে গেছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে ঈদের আনন্দে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যেতে হয় জেলেদের।

কিন্তু সম্প্রতি বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে যেতে হচ্ছে তাদের। সুযোগ পেলেই জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে দস্যুরা। গত এক মাসে বনদস্যুদের হাতে অপহৃত হয়ে মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে এসেছে ১৪ জন জেলে। অপহরণের পর প্রত্যেকে ৭০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পান তারা।
উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে জেলে সম্প্রদায়কে ছুঁতে পারছে না ঈদের আনন্দ।

 

শ্যামনগরের সুন্দরবনঘেঁষা গাবুরা গ্রামের আমিনুর গাজী (৫৫) বলেন, ‘সারা জীবন সুন্দরবনের খালে মাছ শিকার করে সংসার চালিয়ে আসছি। কিন্তু এবারের ঈদ আমাদের জন্য আনন্দের নয়, ভয়ের। কখন কে বন থেকে ফিরবে, আদৌ ফিরবে কিনা, এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।

’ আমজেদ হোসেন মালী (৪৮) জানান, বনদস্যুদের ভয়ে অনেক জেলে বনে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে তাদের পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়েছে।

 

সুন্দরবনের খালে কাঁকড়া শিকারী জাহাঙ্গীর হোসেন (৫১) ও ছবিরোন নেছা ((৩৯) জানান, মাছ ধরতে গিয়ে প্রায়ই বনদস্যুদের কবলে পড়ছে জেলেরা। মুক্তিপণের ভয়, হামলার আশঙ্কা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেকেই এবার বনের নদী-খালে মাছ ধরতে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। ফলে ঈদের আগে আয়-রোজগারও কমে গেছে।

বনে এখন আর মাছ ধরা নিরাপদ নয়। বনদস্যুদের অত্যাচার আর তাদের চাহিদামতো মুক্তিপণ দিতে না পারলে নির্মম নির্যাতন করা হয়। সেই ভয়ে বনে যেতে পারেননি তারা। এখন সন্তানদের কিভাবে নতুন জামা কিনে দেবেন তা নিয়েই ভাবছেন তারা।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জেলে-বাওয়ালি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা বনদস্যু নির্মূলে কোস্ট গার্ডের নামমাত্র দুই-একটি অভিযান দেখি। কিন্ত স্থায়ীভাবে কেউ কাজ করে না। আমরা গরিব মানুষ, জিম্মি হয়ে সমিতির টাকা সুদে নিয়ে দস্যুদের দিতে হয়। না দিলে মারধর করে, জাল-নৌকা নিয়ে যায়। এই অবস্থায় ঈদের আনন্দ কই?’

জেলেরা জানান, আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবার দস্যুতায় ফিরেছে। বিশেষ করে পশ্চিম সুন্দরবনে মজনু বাহিনী, শরীফ বাহিনী, দয়াল বাহিনী, রবিউল বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, আবদুল্লাহ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, মঞ্জুর বাহিনী, মাসুম বিল্লাহ ভাগনে বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।

গাবুরা ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি মাসুদুল হকসহ অনেকে জানান, দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় জনপদে পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে যেখানে আনন্দ-উৎসবের আমেজ বইছে, সেখানে জেলে পরিবারগুলোতে বিরাজ করছে অনিশ্চয়তা। ফলে দস্যু আতঙ্কে জেলে পল্লীতে এবারের ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান।

র‌্যাব-৬-এর কমান্ডার লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে মূলত কোস্টগার্ডের দায়িত্ব, তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সুন্দরবনে বনদস্যু-জলদস্যু নির্মূলে র‌্যাব যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।