ঈদযাত্রায় নৌপথের যাত্রীদের জন্য সদরঘাটে এবার ‘ফ্রি’ কুলি সার্ভিস চালু করেছে সরকার। অথচ এই বিশেষ সেবা নিতে যাত্রীদের টাকার বদলে বখশিস দিতে হচ্ছে। তারা বলেন, ‘ফ্রি’ সার্ভিস বলে আমাদের লঞ্চে উঠিয়ে দিয়ে বখশিস চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে লজ্জায় পড়ে কিছু টাকা দিতে হয়।
শুক্রবার (২০ মার্চ) সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, ঈদ যাত্রার চতুর্থ দিনে ভিড় কম ছিল। পন্টুনে লঞ্চের সংখ্যাও কম।
সুন্দরবন লঞ্চে বরিশাল যাবেন মো. শাহরিয়ার ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, প্রতি বছর সদরঘাটে কুলিদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে ঝামেলা হতো। এবার একজন কুলি বললেন, ঈদ উপলক্ষে এই সেবা ফ্রি। তবে খুশি হয়ে যা দেন নেব। ‘ফ্রি’ কুলি, ট্রলি ও হুইলচেয়ারসহ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ঈদযাত্রাকে অনেক সুবিধাজনক করেছে। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পটুয়াখালী যাবেন আমেনা বেগম জানান, সাথে বয়স্ক শাশুড়ি থাকায় ব্যাগ অনেক হয়েছে। সদরঘাটে নেমে কুলি খুঁজতেই পাওয়া গেল। কুলিদের কত টাকা নেবে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলেছেন, এবার সরকার ফ্রি করে দিয়েছে। কোনো টাকা লাগবে না। তবে ঈদ সিজেনে খুশি হয়ে যা দেবেন তা নেব। এর আগে যতবার গিয়েছি ততবারই কুলিদের সঙ্গে ঝামেলা হতো। এবার হুইলচেয়ার ও ট্রলির ব্যবস্থা থাকায় অনেক সহজ হয়েছে। আমি খুশি হয়ে তাদের ১শ টাকা দিয়েছি।
বেতুয়া যাবেন নাহিয়ান বলেন, এবার সদরঘাটে এসে ভালো লাগছে। ‘ফ্রি’ কুলি সুবিধা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আগে কোনো সরকার এ রকম করেনি। সরকারের উদ্যোগে আজ কোনো টাকা নেওয়া হচ্ছে না। তবে কুলিরা বলেছেন, ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় খুশি হয়ে যা দেবেন তা নেব। এ ছাড়া সদরঘাটের পরিবেশ আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নিয়োগ করা কুলি মো. তুহিন বাংলানিউজকে বলেন, ২০১৪ সাল থেকে কাজ করছি। এবারই প্রথম ফ্রিতে যাত্রী সেবা দিচ্ছি। সরকার আমাদের প্রতিদিন ৫শ টাকা দিচ্ছে। এতে আমাদের লোকসান হচ্ছে, তারপরও খুশি আছি। যাত্রীরা খুশি হয়ে অনেকেই ৫০ বা ১শ টাকা করে দিচ্ছেন।
সদরঘাট টার্মিনালে কুলি মো. কামাল জানান, এবছর আমরা কোনো টাকা নিচ্ছি না। সরকার ‘ফ্রি’ করে দিয়েছে। যারা ঘাট ইজারা নিয়েছে তাদের ২শ কুলি আছে। অনেকেই মালামাল নেওয়ার জন্য টাকা দাবি করেছেন। আমরা যারা বিআইডব্লিউটিএর নিয়োগপ্রাপ্ত, আমরা কেউ টাকা দাবি করি না। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে ফ্রি সেবা দেওয়ায় আমাদের কিছু লোকসান হচ্ছে। সরকার বেতন বাড়ালে আর কষ্ট হতো না।
জামাল হোসেন জানান, গত ১৫ বছর ধরে টার্মিনালে কাজ করছি। আগে ঈদে প্রতিদিন কমপক্ষে এক হাজার টাকা আয় হতো। ক্ষেত্রবিশেষে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা হতো। এবার সেটা ৫শ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঈদে আয় বেশি হলে পরিবার নিয়ে আনন্দে ঈদ করতে পারতাম। তাই এবার যাত্রীদের মালামাল নেওয়ার পর কোনো নির্দিষ্ট টাকা চাইছি না, তবে খুশি হয়ে যে বখশিস দেওয়া হবে, তা নেব।
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, যাত্রীদের সুবিধার্থে ঈদের দিন ছাড়া আগে-পরে পাঁচ দিন করে মোট ১০ দিনের ফ্রি কুলি সেবা দেওয়া হচ্ছে। সরকারের উদ্যোগে যাত্রীরা যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন। এছাড়া যাত্রীদের বাড়তি আনন্দ যোগাতে টাকা ও বখশিসের বিড়ম্বনা দূর করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর ৩০ জন কুলি ও ঘাট ইজারাদারের কাছে ২শ কুলি রয়েছে। এ ছাড়া ১৫ থেকে ২০ জন কুলি তালকা ছাড়া কাজ করেন। সব মিলিয়ে সদরঘাটে ২৫০ জন কুলি কাজ করেন। এর মধ্যে ৩০ জনকে বিআইডব্লিউটিএ নিজস্বভাবে নিয়োগ দিয়েছে। বাকিদের ঘাট ইজারাদার নিয়োগ দিয়েছেন।
বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, যাত্রীদের মালামাল বহনের জন্য ১শ’টি ট্রলি ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই ট্রলিগুলো বিমানবন্দর থেকে আনা হয়েছে। ঈদযাত্রার বিশেষ ফ্রি সেবা কেন্দ্রে আনা এসব ট্রলি যাত্রী নিজেও ব্যবহার করতে পারছে।
অসুস্থ, অক্ষম ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্য হুইলচেয়ারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সদরঘাটের ২০টি গেট এলাকায় মোট ৪০টি হুইলচেয়ার থাকবে। এগুলো ব্যবহারে সহায়তা করবেন নৌ-ক্যাডেট সদস্যরা। এ ছাড়া ঈদ উপলক্ষে লঞ্চ মালিকরা ভাড়া ১০ শতাংশ কমিয়েছে। এতে যাত্রীদের আরও স্বস্তি নিশ্চিত হয়েছে।