পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এই দুই ঈদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো ঈদের নামাজ। হাদিসের বর্ণনা থেকে জানা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে নিয়মিত ঈদের নামাজ আদায় করেছেন এবং মুসলমানদের এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী ঈদের নামাজ দুই রাকাত।
সাহাবি ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ঈদুল ফিতরের নামাজ দুই রাকাত এবং ঈদুল আজহার নামাজও দুই রাকাত। তিনি বলেন, 'তোমাদের নবীর বাণী অনুযায়ী এটাই পূর্ণাঙ্গ নামাজ; এটি কসর (সংক্ষিপ্ত) নয়।' (সুনানে নাসাঈ: ১৪২০; সহিহ ইবনে খুযাইমা)
ঈদগাহে নামাজ আদায়:
হাদিসে বর্ণিত আছে, ঈদের দিন নবী (সা.) সাধারণত ঈদগাহে গিয়ে নামাজ আদায় করতেন। সাহাবি আবু সাঈদ আল খুবরী (রা.) বলেন, 'রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে বের হতেন এবং সর্বপ্রথম নামাজ আদায় করতেন।' (সহিহ বুখারি: ৯৫৬)
ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবির:
ঈদের নামাজের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো অতিরিক্ত তাকবির। হাদিস অনুযায়ী প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমার পর ছয় বা সাতটি অতিরিক্ত তাকবির দেওয়া হয়। সাহাবিয়া আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার নামাজে প্রথম রাকাতে সাত তাকবির এবং দ্বিতীয় রাকাতে পাঁচ তাকবির দেওয়া হতো, রুকুর তাকবির ছাড়া। (সুনানে আবু দাউদ)
কিরাতের সুন্নাহ:
ঈদের নামাজে নির্দিষ্ট কিছু সূরা তিলাওয়াত করার কথাও হাদিসে এসেছে। বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ক্বাফ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ক্বামার তিলাওয়াত করা সুন্নাহ। তবে বিকল্প হিসেবে প্রথম রাকাতে সূরা আ’লা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা গাশিয়া পড়ার কথাও হাদিসে পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) মাঝে মাঝে এই সূরাগুলো তিলাওয়াত করতেন। ইসলামী চিন্তাবিদরা বলেন, ইমামদের উচিত এসব সুন্নাহ জীবিত রাখা, যাতে মুসলমানরা এ আমল সম্পর্কে জানতে পারে।
নামাজের পর খুতবা:
ঈদের নামাজের পর ইমাম মুসল্লিদের উদ্দেশে খুতবা দেন। এতে মুসলমানদের জন্য উপদেশ, নির্দেশনা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয় তুলে ধরা হয়। ঈদের খুতবার সময় নারীদের জন্যও বিশেষ উপদেশ দেওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। নবী (সা.) নারীদের উদ্দেশেও আলাদা করে নসিহত করতেন।
খুতবার আগে নামাজ:
হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ঈদের নামাজ আগে এবং খুতবা পরে দেওয়া সুন্নাহ। সাহাবি জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, 'নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে গিয়ে খুতবার আগে নামাজ আদায় করেন।' (সহিহ বুখারি: ৯৫৮; সহিহ মুসলিম: ৮৮৫) আরেক বর্ণনায় আবু সাঈদ আল খুদরী (রা.) বলেন, নামাজ শেষ করে নবী (সা.) মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে উপদেশ দিতেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করতেন।
পরবর্তীকালে মদিনার গভর্নর মারওয়ান একবার নামাজের আগে খুতবা দিতে চাইলে সাহাবিরা এ বিষয়ে আপত্তি জানান এবং নবীজির সুন্নাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, ইসলামে ঈদের খুতবা নামাজের পরেই দেওয়া উত্তম।
সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের আমল:
ইসলামী গবেষকদের মতে, ঈদের নামাজ ও খুতবা নবীজির দেখানো পদ্ধতিতে আদায় করা মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এতে ইসলামের মৌলিক সুন্নাহগুলো সংরক্ষিত থাকে এবং মুসলিম সমাজে ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। [সূত্র: শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালিহ আল উসাইমিন এর ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম এবং মুহাম্মদ সালিহ আল মুয়াজ্জিদ এর ফতোয়া সংকলন]