ঈদ যেমন আনন্দের, তেমনি ইবাদতের। ঈদ আনন্দ উদযাপনের পাশাপাশি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, ইবাদত ও মানবিকতার এক মহিমান্বিত উপলক্ষ। ঈদের দিন বেশ কিছু কাজ আছে, যার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করা যায়। হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নতের অনুসরণ হয়। আবার সমাজে প্রচলিত কিছু কাজ রয়েছে, যার সঙ্গে ঈদের কোনো সম্পর্ক নেই, সেসব করা যাবে না। ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করে এ দিনটিকে সঠিকভাবে উদযাপন করতে আমাদের কিছু করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়ের প্রতি সচেতন থাকা আবশ্যক। এখানে ঈদের দিনের করণীয়-বর্জনীয় কাজ উল্লেখ করা হলো—
ঈদের দিন যা করবেন
সদকাতুল ফিতর আদায়: ঈদের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এটি রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূর করে এবং সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটায়। ঈদের নামাজের আগেই ফিতরা আদায় করা উত্তম। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫০৩)
গোসল বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া: ঈদের দিন সকালে গোসল করা, নখ-চুল পরিপাটি রাখা এবং পরিচ্ছন্নতা অবলম্বন করা সুন্নত। সাহাবিরা ঈদের মাঠে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। নাফে (রহ.) বলেন, ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদুল ফিতরে ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করে নিতেন।’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস: ৪৮৮)
উত্তম পোশাক পরিধান ও সুগন্ধি ব্যবহার: সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দর পোশাক পরা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা উত্তম। তবে এতে অহংকার, অপচয় বা প্রদর্শনপ্রিয়তা যেন স্থান না পায়। উত্তম পোশাক পরতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।
মিষ্টি মুখ করা: ঈদুল ফিতরের দিন নামাজে যাওয়ার আগে খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু খাওয়া সুন্নত। এটি রমজানের রোজা সমাপ্তির প্রতীক এবং আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। আনাস (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদুল ফিতরে খেজুর না খেয়ে ঘর থেকে বের হতেন না। তিনি বেজোড় সংখ্যক খেজুর খেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৫৩)
বেশি বেশি তাকবির পাঠ: ঈদগাহে যাওয়ার সময় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিম্নস্বরে তাকবির বলা মুস্তাহাব। তাকবিরটি হলো—উচ্চারণ: আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, বর্ণনা: ৫৬৭৬)
ঈদগাহে ভিন্নপথে যাতায়াত: সম্ভব হলে ঈদগাহে যাওয়ার সময় এক পথে যাওয়া আর ফেরার সময় ভিন্ন পথে আসা। হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমনটি করতেন। জাবের (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) ঈদের দিন এক পথ দিয়ে ঈদগাহে যেতেন আর ভিন্ন পথ দিয়ে বাড়ি ফিরতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৮৬)
পায়ে হেঁটে ঈদগাহে গমন: যথাসম্ভব হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া মুস্তাহাব। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুল (সা.) ঈদগাহে হেঁটে যেতেন এবং হেঁটে ফিরতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১২৯৫)
ঈদের নামাজ আদায়: ঈদের দিন সকালে পুরুষদের জন্য ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। বিশেষ পদ্ধতিতে অতিরিক্ত ছয় তাকবিরসহ জামাতে দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। নামাজ শেষে ঈদের খুতবা শুনতে হয়। ঈদের নামাজ খোলা ময়দানে আদায় করা উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৯)
শুভেচ্ছা বিনিময়: ঈদের নামাজের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে মুসাফাহা ও মুয়ানাকা করতেন। ঈদের দিন শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম আমল। এটি শরিয়ত অনুমোদিত বিষয়। পাশাপাশি সবার খবর নেওয়াও নৈতিক দায়িত্ব।
ঈদের দিন যা করবেন
অপচয়-অপব্যয়: ঈদের আনন্দের নামে অতিরিক্ত খরচ, বিলাসিতা ও প্রতিযোগিতামূলক প্রদর্শন ইসলাম সমর্থন করে না। সংযম ও মিতব্যয়িতাই হওয়া উচিত ঈদের সৌন্দর্য।
শরিয়তবিরোধী কাজ: পোশাক-পরিচ্ছদ বা চলাফেরায় শালীনতা বজায় রাখা অপরিহার্য। ফ্যাশনের নামে অশ্লীলতা করা যাবে না। কোনো কিছু করার ক্ষেত্রে শরিয়তের সীমালঙ্ঘন করা যাবে না।
অশ্লীল বিনোদন: ঈদের আনন্দ যেন এমন কর্মকাণ্ডে রূপ না নেয়, যা ইসলামের নৈতিকতা ও আদর্শের পরিপন্থী। গান-বাজনা, অশ্লীলতা বা অনৈতিক বিনোদন থেকে দূরে থাকতে হবে।
জুয়া খেলা ও আতশবাজি: ঈদের দিনে কেউ কেউ জুয়া খেলায় লিপ্ত হয়ে যায়। কেউ আবার আতশবাজিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এগুলো শরিয়তবিরোধী কাজ। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ নাপাক শয়তানের কাজ। তাই তোমরা তা পরিহার করো।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯০)। মোটকথা, ঈদের খুশিতে মত্ত হয়ে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজ করা যাবে না।