Image description

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা ধারণে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় বিএনপির দুই নেতা দলীয় পদ-পদবিসহ বিএনপির রাজনীতি থেকে পদত্যাগ করেছেন। তারা হলেন তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন এবং তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিকদলের সভাপতি ফেরদৌস আলম। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে তারা পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

লিখিত বক্তব্যে রুহুল আমিন বলেন, ‘আমি রুহুল আমিন, তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং সাথে আছেন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা জনাব ফেরদৌস আলম, সভাপতি, তাহিরপুর উপজেলা শ্রমিকদল। আজ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সম্মুখে হাজির হয়েছি রাজনৈতিক একটি বিষয় উপস্থাপন করতে। শুরুতেই মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই যুদ্ধে নিহত সকল বীর শহীদদের কথা গভীরভাবে স্মরণ করছি। এবং শহীদদের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মাগফেরাত কামনা করছি। আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। একইসাথে গণতন্ত্রও জনগণের অধিকার আদায়ে সকল আন্দোলনে নিহত-আহত ও অংশগ্রহণকারী সকলকে শ্রদ্ধায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল হয়ে সাবেক এমপি প্রয়াত জনাব নজির হোসেনের হাত ধরে ২৫ বছর পূর্বে বিএনপির রাজনীতিতে পদার্পণ করেছিলাম। বিগত ১৭ বছর এই আদর্শে ঠিকে থাকার জন্য মামলা- হামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়ে পারিবারিক ও অর্থনেতিকভবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তারপরও মনে আশা ছিল দেশ ও জাতি একদিন স্বৈরাচার মুক্ত হবে এবং মানবিক ধর্মীয় মুল্যবোধের দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়তে পারব।’

জুলাই আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এদেশে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার প্রাণের বিনিময়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগষ্ট দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়। স্বৈরাচার পিছু ছাড়ে না। জুলাই আন্দোলনের পর দেশবাসীর আকাঙ্খা ছিল দুর্নীত ও চাঁদাবাজ মুক্ত সাম্য এবং ন্যায়পরাণতা নতুন বাংলাদেশ দেখব। আমরাও এই আশায় বুক বেঁধে ছিলাম। কিন্তু তা আজ তা গুড়ে বালি হয়েছে।’

তাহিরপুর উপজেলার পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্টের পরে তাহিরপুর উপজেলায় লুটপাট ও দুর্নীতি বেড়ে গেছে। এবং নিজ দলের শীর্ষ নেতারা এর সাথে জড়িয়ে পড়তে দেখছি। আগে যেভাবে লুটপাটকারীদের নাম বলতে ভয় পেতাম আমরা। এখনও জনগণ লুটপাটকারীদের নাম বলতে ভয় পায়। নতুন লুটপাটকারীদের সাথে আওয়ামী লীগের টাকাওয়ালা লুটপাটকারীরাও যুক্ত আছে।’

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘যদিও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নিরীহ কর্মীরা হুমকি ও হয়রানিতে আছে। আর ওই দলের এক শ্রেণির টাকাওয়ালার মিলেমিশে ব্যবসা করছে। নিষিদ্ধ দলটির পদধারী অনেক নেতা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে চলছে। তবে সাধারণ কর্মীদের হয়রানি বন্ধ নেই। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য হলো লুটপাটকারী-চাঁদাবাজরাই জনতার সামনে প্রকাশ্যে লুটপাট আর চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে গলাবাজি করছে এখন।’

পদত্যাগের পেছনে আরও কয়েকটি কারণ তুলে ধরে তারা বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের সফলতাকে ঘুরিয়ে পেছিয়ে বিএনপি অস্বীকার করছে’, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ঐক্যমতে যে সংস্কার হয়েছে, সেখানে হ্যাঁ ভোট গুরুত্ব পাচ্ছে না’ এবং ‘সুনামগঞ্জ-১ (তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর) নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির দলীয় এমপি প্রার্থী মনোনয়নে দলের একজন নিবেদিত নেতাকে প্রথমে মনোনয়ন দিয়েও পরে বিনাকারণে তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়েছে।’

লিখিত বক্তব্যে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘জুলাই আন্দোলনের পরে দলের অনেক নেতা চাঁদাবাজিসহ অনৈতিক কাজের জড়িয়ে পরেছেন। তাহিরপুর উপজেলায় পদধারী কিছু নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকার পরেও দল ব্যবস্থা নেয়নি। সারা দেশে যাদের বহিস্কৃত করা হয়েছিল; তাদের আবার স্বপদে দলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।’

তাহিরপুর উপজেলার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের অভিযোগ তুলে তারা বলেন, ‘পাঁচ আগস্টের পর উপজেলার যাদুকাটায় গ্রামের পর গ্রাম কেটে বালু লুট হচ্ছে। রক্তি, পাটলাই, বৌলাই ও যাদুকাটা নদী দিয়ে চলাচলকারী নৌযান আটকে চাঁদাবাজি আরও বেড়েছে। এমনকি নদী থেকে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী এলাকার ঘাঘটিয়া গ্রামের বিশাল বাঁশঝাড়সহ বিস্তৃর্ণ এলাকা কিনে রেখেছে দলীয় নেতারা।’ একইসঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, ‘১২ ফ্রেবুয়ারি নির্বাচনের পর বাঁশঝাড় এলাকাসহ বিস্তৃর্ণ এলাকা কেটে বালু লুট করবে তারা।’

সীমান্ত ও হাওর এলাকার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলা হয়, ‘সীমান্তের তিনটি শুল্কস্টেশন চারাগাঁও, বাগলী ও বড়ছড়া দখল করে চলছে চাঁদা আদায়’ এবং ‘হাওর অধ্যুষিত নির্বাচনী এলাকা কিন্তু দিন দিন হাওরের সকল সম্পদ উজাড় হয়ে হাওরের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে।’

বক্তব্যের শেষাংশে তারা বলেন, ‘আমরা মনে করি, বর্তমান বিএনপি দেশ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে জনগণের আকাঙ্খার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। স্থানীয়ভাবে দলীয় নেতারাই লুটপাট আর দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হলেও জনতার সামনে মিথ্যা ও প্রতারণামূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। তাই বিবেক ও দেশেপ্রেমের তাড়না থেকে দলীয় পদ-পদবিসহ দল থেকে এই মূহুর্ত থেকে অব্যাহতি হতে নিলাম। বিএনপি রাজনীতির সাথে আমাদের আর কোন সম্পর্ক রইল না।’

পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তারা আরও বলেন, ‘আমরা জানি আমাদের চলে যাওয়া বিশাল এই দলের কোন ক্ষতি হবে না; তবে আমাদের জায়গা থেকে প্রতিবাদটুকু জানালাম।’ পাশাপাশি তারা উল্লেখ করেন, ‘আমাদের দীর্ঘদিনের পথচলায় তাহিরপুর তথা সুনামগঞ্জ ১ নির্বাচনী এলাকার সহকর্মীরা ব্যথিত হতে পারেন, তাই আমরা সম্পূর্ন নিজেদের ওপর দায় নিয়েই বিদায় নিচ্ছি। তবে সকলের সাথে সামাজিক সু-সম্পর্ক বেঁচে থাকা পর্যন্ত অটুট থাকবে আশাকরি। আমাদের আচরণে কেউ আহত হয়ে থাকলে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।’