Image description

উমামা ফাতেমা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের ভিপি প্রার্থী। তিনি ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’ নামে আলাদা প্যানেল ঘোষণা করেছেন। হাল আমলে ছাত্র রাজনীতির অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর তিনি। নির্বাচনের প্রাক্কালে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন সমকালের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইফতেখারুল ইসলাম।  

সমকাল: এবারের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আলাদা কোনো গুরুত্ব রয়েছে কি?

উমামা ফাতেমা : এবারের ডাকসু নির্বাচন আমরা একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে অর্জন করেছি। মূলত এটি আদায় করে নিয়েছি। গত বছর আগস্টে গণঅভ্যুত্থান না হলে ডাকসুর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পুনরায় একটা স্বৈরাচারী কবলেই পড়ত। সেই জায়গা থেকে আজ  দল-মত নির্বিশেষে সব ছাত্রছাত্রী ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছেন এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসছেন। আর অভ্যুত্থান-পরবর্তী এই ডাকসু নির্বাচন আমরা সবাই মিলে পুনরায় প্রশাসনের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আদায় করে নিয়েছি। এটার বিশেষত্বও সেই জায়গায়। গণঅভ্যুত্থানের কারণে আমরা এখন আশা করতে পারছি, এখানে একটা স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন হবে। 

 সমকাল: ডাকসু নির্বাচনে আপনি কেন আলাদাভাবে প্যানেল ঘোষণা করেছেন?

উমামা ফাতেমা : বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বর্তমান ছাত্র সংগঠন ও প্রশাসনিক কিছু অবস্থানের সঙ্গে আমার অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নমত রয়েছে। যেমন– হলে ছাত্র রাজনীতি থাকার ব্যাপারে, ছাত্র রাজনীতির কাঠামো কী হবে– এ নিয়ে আমার দ্বিমত রয়েছে। বিভিন্ন সভা ও পর্ষদে আমি প্রশ্নগুলো তুলেছি। আমি ছাত্র রাজনীতি নিয়ে তাদের মতামত জানতে চেয়েছিলাম। আলাপে সবার মত ছিল, তারা ছাত্র রাজনীতি চায়। ৫ আগস্ট-পরবর্তী ক্যাম্পাস আবারও দলীয় রাজনীতিতে ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি চাই না আমার ক্যাম্পাস আবারও বিভিন্ন দলাদলির মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ুক। তাই আমার মনে হয়েছিল, যদি আমি এখানে নতুন একটি ভিশন দেখাতে পারি, সেই চিন্তা থেকে আমি একটি স্বতন্ত্র প্যানেল ঘোষণা করেছি। 

সমকাল : নির্বাচনে গণঅভ্যুত্থানের বিশেষ কোনো প্রভাব পড়বে?

উমামা ফাতেমা : এটা তো অবশ্যই পড়বে। আমরা এখানে যারা প্রার্থী হয়েছি, সবাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছি। নির্বাচনে আমি ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছি। তার একটা বড় কারণ হলো, এই অভ্যুত্থান। তা না হলে আমরা হয়তো এ ধরনের বড় ও বিস্তৃত মাত্রায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগই পেতাম না। 

সমকাল : ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে আপনার অবস্থান কী?

উমামা ফাতেমা : ২০২৪ সালে ১৬ ও ১৭ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা হলের ভেতর থেকে ছাত্রলীগের মূলোৎপাটন করেন। সেই আন্দোলন থেকে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেন, হলে কোনো ধরনের ছাত্র রাজনীতি চলবে না। ৫ আগস্ট-পরবর্তী যখন শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের জন্য আন্দোলন হচ্ছিল, তখন ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথ কোনো রোডম্যাপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। সংগঠনগুলো যেমন দায় নিতে চাচ্ছিল না, তেমনি প্রশাসনও ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে কোনো দায় নিয়ে সমাধানের পথে এগোতে চায়নি। আমি মনে করি, ছাত্র রাজনীতির একটা কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। আর একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালার মধ্যে ছাত্র রাজনীতি এনে আমাদের একাডেমিক ক্ষেত্রে ফোকাস করে আগামী দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনির্মাণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

সমকাল : আমরা দীর্ঘদিন ধরে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি দেখছি। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি?

উমামা ফাতেমা: যদি এখানে ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি সামনে চলে আসে, তাহলে ছাত্র রাজনীতির কোনো ধরনের গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরং ক্যাম্পাসে দল-উপদলে বিভক্তি বাড়বে। সেই জায়গা থেকে আমি যেটা অনুভব করি তা হলো, আমরা যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছি, তাদের মধ্য থেকে যদি প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা অনেক গুণ বেশি হবে। আমরা কোনো দলের কাছে দায়বদ্ধ থাকব না, বরং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে দায়বদ্ধ থাকব। 

সমকাল: অভিযোগ রয়েছে, ক্যাম্পাসে রাজনীতি উন্মুক্ত না থাকলে বিভিন্ন কট্টর ও উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তৎপর হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে আপনার কী মত?

উমামা ফাতেমা: এখানে এই আশঙ্কা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু রাজনীতি উন্মুক্ত করা বলতে কী বুঝায়– সেটাই তো আমরা জিজ্ঞেস করছি। ছাত্র রাজনীতির নীতিমালা বা কাঠামো সংস্কারের কথাই তো আমরা এখানে বলছি। সেখানে যদি উগ্রবাদিতা বা গুপ্ত রাজনীতির ভয় দেখিয়েই শুধু ছাত্র রাজনীতিকে আগের ফরম্যাটে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে আমি মনে করি না যে এটা খুব ভালো একটা পদক্ষেপ। বরং এখানে গুপ্ত রাজনীতির ব্যাপারে যেমন একটা যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া আসা প্রয়োজন, তেমনি উন্মুক্ত রাজনীতির ফরম্যাট কেমন হবে তা নিয়েও আমাদের আলাপ করা দরকার। সবার সাংগঠনিক পরিচয় স্পষ্ট থাকতে হবে। কে কোন সংগঠন করে, ছাত্র রাজনীতির কাঠামো নিয়ে একটা সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। 

সমকাল: কাঠামো বলতে এখানে কী বুঝাচ্ছেন?

উমামা ফাতেমা: কেউ যদি হলে সিট দখল করতে চায়, কিংবা কেউ যদি শিক্ষার্থীর একাডেমিক কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে চায়, সে ক্ষেত্রে যথাযথ নীতিমালা থাকা উচিত বলে মনে করি। যাতে ছাত্র রাজনীতি কিংবা তাদের সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসকে তাদের বাপ-দাদার সম্পত্তিতে পরিণত করতে না পারে। 

সমকাল: এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ছাত্রশিবিরের প্যানেল ঘোষণা। বিষয়টা আপনি কীভাবে দেখছেন?

উমামা ফাতেমা: ৯০-পরবর্তী ছাত্রশিবির কখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্মুক্তভাবে কাজ করতে পারেনি। সেই তুলনায় এবার ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তারা এক ধরনের ফুলেফেঁপে উঠেছে। আমি মনে করি, যদি শিবির বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করতে চায়, তাহলে তাদের পুরোপুরি প্রকাশ্যে এসে রাজনীতি করা উচিত। এভাবে আধখ্যাঁচড়াভাবে আমি পাঁচজনের একটা কমিটি দিলাম, বাকি ২৫০ জনকে আড়ালে রেখে দিলাম– এভাবে আসলে রাজনীতি সম্ভব নয়। রবং ক্যাম্পাসে সব রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এক ধরনের অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। শুধু ছাত্রশিবিরের এ ধরনের গুপ্ত রাজনীতির কারণে ক্যাম্পাসে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। 

সমকাল: আগামী নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির আদৌ কি কোনো পরিবর্তন ঘটবে?

উমামা ফাতেমা: আমার মনে হয়, আমরা ভালো ভারসাম্য বজায় রাখতে পারব। কারণ ক্যাম্পাসের মধ্যে এই মুহূর্তে যেটি দরকার তা হলো যথাযথ একটি ভারসাম্য। যদি এখানে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন ক্ষমতায় থাকে, একই অবস্থায় যদি বিএনপিও ক্ষমতায় আসে, তাহলে ক্যাম্পাস রাজনীতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সংঘাতের আশঙ্কা বেড়ে যাবে। বরং আমরা যদি সাধারণ শিক্ষার্থীর প্রতিনিধি হিসেবে ডাকসু প্রার্থী হই, তাহলে অনেকখানি ভারসাম্য বজায় রেখে সব পক্ষের মধ্যে একটা সমঝোতামূলক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারব। 

সমকাল: ক্যাম্পাস রাজনীতিতে ভারসাম্য তাহলে কী করে সম্ভব?

উমামা ফাতেমা: জুলাই সনদের ব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী আন্দোলন যে মাত্রায় সোচ্চার দাবি তুলতে পারত, এনসিপি সেটা পারেনি। কারণ এনসিপি একটি রাজনৈতিক দল। একটা রাজনৈতিক দল তো সরকারকে কখনও নিজে একটা ঘোষণাপত্র দিতে পারে না। যখনই সে রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছে, তখনই তা দলীয় এজেন্ডা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক একই কথা আমি ডাকসুর ক্ষেত্রেও বলব। যখন একটা দলীয় প্যানেল থেকে কেউ বিজয়ী হয়ে আসবে এবং সে যখন ডাকসু থেকে কোনো বিষয়ে মীমাংসায় যাচ্ছে, তখন সে দলের বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। দলীয় প্যানেল থেকে নির্বাচিত হওয়া তাঁর পক্ষে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। প্রত্যেকটা জায়গায় সে দলের কাছে দায়বদ্ধ এবং দলের কাছেই জবাবদিহি করছে। তাঁর পক্ষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। যদি ডাকসু নির্বাচনে পুনরায় দলীয় সংগঠন নির্বাচিত হয়ে আসে তাহলে আমাদের একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে এবং ক্যাম্পাস সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে এগোবে। 

সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ। 

উমামা ফাতেমা: সমকালকেও ধন্যবাদ।