Image description

আবু তালহা রায়হান

বর্তমান বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় কাঠামো ‘জাতিরাষ্ট্র’ বা ন্যাশন স্টেট। এর উৎপত্তি, বিবর্তন এবং সার্বভৌমত্বের ধারণা নিয়ে রয়েছে নানা দার্শনিক ও তাত্ত্বিক বিতর্ক। বিশেষ করে ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে আধুনিক এই রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পর্কের স্বরূপ বিশ্লেষণ এখনকার সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়।

এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন পরিসরে নিয়মিত আলোকপাত করে আসছেন বিশিষ্ট ইসলামি রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ শায়খ মুসা আল হাফিজ। আধুনিক রাষ্ট্রের সংকট, এর বিবর্তনমূলক ইতিহাস এবং ইসলামি রাষ্ট্রতত্ত্বের মৌলিক দিকগুলো নিয়ে সম্প্রতি তার মুখোমুখি হয়েছে কালবেলা। দীর্ঘ আলাপচারিতায় তিনি আধুনিক জাতিরাষ্ট্র, সার্বভৌমত্ব ও ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তার সম্পর্ক নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন—

 

কালবেলা : আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা কীভাবে জন্ম নিল? এর তাত্ত্বিক বুনিয়াদ আসলে কী?

মুসা আল হাফিজ : আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা, যাকে আমরা ন্যাশন স্টেট বলি তা কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক, দার্শনিক ও রাজনৈতিক বিবর্তনের ফল। মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক বিশ্ব থেকে আধুনিক সার্বভৌম রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণ ছিল একটি গভীর মানসিক ও কাঠামোগত বিপ্লব।

প্রথমত, ঐতিহাসিকভাবে ন্যাশন স্টেটের জন্মকে বোঝার জন্য আমাদের ফিরে যেতে হয় ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির দিকে। ১৬৪৮ সালে সংঘটিত এই সন্ধি ইউরোপে ত্রিশ বছরের ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটায় এবং একটি নতুন নীতির সূচনা করে। সেটা হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব। এর আগে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ব্যাপারটা কোথাও ছিল না। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল বিভক্ত। রাজার কর্তৃত্ব ছিল, পোপের কর্তৃত্ব ছিল, সামন্তপ্রভুর কর্তৃত্ব ছিল। সবাই ক্ষমতার অংশীদার ছিল। কিন্তু ওয়েস্টফালিয়ার পর রাষ্ট্রকে দেখা হয় নতুন করে। তখন থেকে রাষ্ট্রকে কল্পনা করা হয় একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্বশালী সত্তা হিসেবে। এখানেই আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামো জন্ম নেয়।

 

এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পেছনে দার্শনিক ভিত্তি গড়ে তোলেন কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ। টমাস হবস তার বই লেভায়াথানে বলেন, প্রাকৃতিক অবস্থায় মানুষ ছিল হোমো হোমিনি লুপুস (মানুষের প্রতি মানুষ নেকড়ে)। যে যাকে পারত শিকার করত, ছিঁড়ে খেত। এই অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে মানুষ নিজেদের স্বাধীনতার একটি অংশ একটি শক্তিশালী সার্বভৌমের হাতে তুলে দেয়। এটাই সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট, সামাজিক চুক্তি। হবসের রাষ্ট্র ধারণা ছিল নিরাপত্তাকেন্দ্রিক। মানে, রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো বিশৃঙ্খলা দমন করা।

এর বিপরীতে জন লকের তত্ত্ব। টু ট্রিটিসেস অব গভর্নমেন্ট নামক বইয়ে তিনি রাষ্ট্রকে দেখেন ব্যক্তি-স্বাধীনতার রক্ষক হিসেবে। তার মতে, মানুষ জন্মগতভাবে লাইফ, লিবার্টি ও প্রপার্টির অধিকারী। রাষ্ট্রের কাজ এই অধিকারগুলো রক্ষা করা। যদি রাষ্ট্র তা করতে ব্যর্থ হয়, জনগণের বিদ্রোহের অধিকার আছে। এখানেই গণতন্ত্রের নতুন যুগ শুরু হলো, যার নাম আধুনিক গণতন্ত্র।

ইসলামি রাজনৈতিক তত্ত্ব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে কবুল করে না। ইউরোপে জন্ম নেওয়া ন্যাশন স্টেটের ধারণার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কোনো কোনো চিন্তাবিদ ইসলামেও সার্বভৌমত্বের একটা রূপ খাড়া করেছেন। এই নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে জটিলতা বেড়েছে, কমেনি। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা একদিকে বাঁক নিয়েছে বলে সেই অনুযায়ী ইসলামকে বিপরীত দিক থেকে ঢেলে সাজানোর আইডিয়াটা বিপজ্জনক

আরেক ধাপে জ্যাঁ জাক রুশোর চিন্তাধারা। তিনি তার দ্য সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট বইয়ে জেনারেল উইল বা সাধারণ ইচ্ছার তত্ত্ব দিলেন। তার মতে, সার্বভৌমত্ব কোনো রাজা বা শাসকের নয়, বরং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছার মধ্যে নিহিত। ন্যাশন স্টেটে জনগণই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি— এই ধারণাটি রুশোর চিন্তায় সুসংহত হয়।

কালবেলা : ন্যাশন স্টেটের উপাদানসমূহ কী?

মুসা আল হাফিজ : ন্যাশন বা জাতি ধারণার দিকে তাকালে দেখা যায়, এটি কেবল রাজনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও মানসিক ব্যাপারও। বেনেডিক্ট আন্ডারসন-এর বিখ্যাত এক বই ইম্যাজিনড কমিউনিটিজ। এতে তিনি বলেন, জাতি হলো একটি ইম্যাজিনড কমিউনিটি, মানে কল্পিত সম্প্রদায়। যেখানে মানুষ একে অপরকে না চিনলেও নিজেদের একটি বৃহত্তর ঐক্যের অংশ হিসেবে কল্পনা করে। এই কল্পনার পেছনে কাজ করে ভাষা, মুদ্রণ প্রযুক্তি, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং ঐতিহাসিক বয়ান। এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জাতীয়তাবাদ। আর্নেস্ট গেলনার মনে করেন, আধুনিক শিল্পসমাজের প্রয়োজনেই জাতির ধারণা তৈরি হয়েছে। শিল্পায়নের জন্য একটি অভিন্ন ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি দরকার, যা ন্যাশন তৈরি করে এবং রাষ্ট্র তার রাজনৈতিক কাঠামো দেয়। অর্থাৎ, ন্যাশন স্টেট হলো জাতি ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক সমন্বয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় ধর্মের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণভাবে পরিবর্তিত হয়। মধ্যযুগের ইউরোপে ধর্ম ছিল রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্র। চার্চ ছিল সর্বেসর্বা। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে ধর্মকে ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা হলো। এই কাণ্ডটার নাম দেওয়া হলো সেকুলারিজম। ফলে রাষ্ট্রকে দেওয়া হলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো, যেখানে নাগরিকত্ব ধর্মের পরিবর্তে আইনি ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

খোলাসা কথাটা হলো, ন্যাশন স্টেট গঠিত হয়েছে তিনটি প্রধান বুনিয়াদের ওপর।

  • পয়লা বুনিয়াদ, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা টেরিটরি।
  • দুসরা বুনিয়াদ, সার্বভৌম ক্ষমতা।
  • তিসরা বুনিয়াদ, একটি কল্পিত কিন্তু শক্তিশালী জাতিগত বা সাংস্কৃতিক ঐক্য বা ন্যাশনহুড।

এর দার্শনিক ভিত্তি গড়ে উঠেছে সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব, ব্যক্তি-অধিকার, জনগণের সার্বভৌমত্ব এবং আধুনিক জাতীয়তাবাদের ধারণার সমন্বয়ে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে, ন্যাশন স্টেট কোনো সর্বজনীন বা চূড়ান্ত মডেল নয়। বিশেষত ইসলামি রাজনৈতিক চিন্তায় ‘উম্মাহ’ ধারণা ভূখণ্ডের সীমাকে অতিক্রম করে।

ইসলামি রাজনৈতিক তত্ত্ব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে কবুল করে না। ইউরোপে জন্ম নেওয়া ন্যাশন স্টেটের ধারণার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে কোনো কোনো চিন্তাবিদ ইসলামেও সার্বভৌমত্বের একটা রূপ খাড়া করেছেন। এই নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে জটিলতা বেড়েছে, কমেনি। ইউরোপীয় রাষ্ট্রচিন্তা একদিকে বাঁক নিয়েছে বলে সেই অনুযায়ী ইসলামকে বিপরীত দিক থেকে ঢেলে সাজানোর আইডিয়াটা বিপজ্জনক। সেখানে ইজতিহাদের আবশ্যিকতা তৈরি হয়। ইজতিহাদের সমস্ত শর্ত রক্ষা করে তা কেবল করতে পারেন মুজতাহিদগণ। কিন্তু ব্যাপারটা সেভাবে হয়নি। বস্তুত, ন্যাশন স্টেটের মূল উপাদানগুলোর সঙ্গে ইসলামের সংঘাতের নানা দিক রয়েছে। সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ন্যাশন স্টেট একটা আপেক্ষিক বিষয়। একটা ঐতিহাসিক নির্মাণ। তার সংকট ও সীমাবদ্ধতা প্রচুর।

কালবেলা : আধুনিক ন্যাশন স্টেট সম্পর্কে আপনার সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি কী?

মুসা আল হাফিজ : দেখুন, আধুনিক ন্যাশন স্টেট কেবল একটি প্রশাসনিক কাঠামো নয়। সে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক-দার্শনিক চেতনার রাজনৈতিক রূপ। ইউরোপের মধ্যযুগীয় খ্রিস্টীয় বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর যে নতুন সভ্যতাগত মানসিকতা গড়ে ওঠে, ন্যাশন স্টেট তারই ফল। এখানে রাষ্ট্র আর কোনো ঐশী নৈতিক ব্যবস্থার অধীন সত্তা নয়। সে নিজেই একটি অটোনোমাস পলিটিক্যাল রিয়েলিটি। তার বৈধতা আসমানি বিধান থেকে আসে না, নৈতিক সত্য থেকে আসে না, মেটাফিজিক্যাল অর্ডার থেকে আসে না। তার বৈধতা আসে ন্যাশন থেকে। অর্থাৎ, কল্পিত রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী থেকে।

এই রূপান্তরটি ছিল অত্যন্ত গভীর। মধ্যযুগীয় ইউরোপে মানুষ নিজেকে প্রথমত খ্রিস্টান সভ্যতার অংশ হিসেবে ভাবত। কিন্তু আধুনিক যুগে সে নিজেকে ফরাসি, জার্মান, ইতালিয়ান বা ইংলিশ হিসেবে কল্পনা করতে শুরু করে। ফলে রিলিজিয়াস সিভিলাইজেশনের জায়গা নেয় ন্যাশনাল কমিউনিটি। এখান থেকেই ন্যাশন স্টেটের জন্ম।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চূড়ান্ত বলে মানতে আমার আপত্তি আছে। অ্যাবসুলোউট সভরেন্টি মানুষের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রকে বসিয়ে দেয়। তখন রাষ্ট্র আর মানুষের সেবক থাকে না; বরং মানুষই রাষ্ট্রের উপাদানে পরিণত হয়। মানুষের মর্যাদা, বিবেক, নৈতিকতা ও সত্য কোনো রাজনৈতিক যন্ত্রের অধীন হতে পারে না। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়, কিন্তু সর্বোচ্চ নয়

এই রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য আছে। প্রথমত, এটি ভূখণ্ডকেন্দ্রিক। নির্দিষ্ট সীমান্তই তার অস্তিত্বের শর্ত। দ্বিতীয়ত, এটি সভরেন্টিকে রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্র বানায়। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের উপরে আর কোনো উচ্চতর ক্ষমতা নেই। তৃতীয়ত, আইন এখানে নৈতিক সত্যের আবিষ্কার নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ইচ্ছার উৎপাদন। চতুর্থত, নাগরিকত্ব ধর্মীয় বা সভ্যতাগত পরিচয়ের চেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয়ে পরিণত হয়।

এই সমগ্র ধারণাটিই মূলত ইউরোপীয় আধুনিকতার সন্তান। পিস অব ওয়েস্টফালিয়ার পরে ইউরোপে যে টেরিটোরিয়াল সভরেন্টিভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে, এনলাইটেনমেন্ট সেই রাষ্ট্রকে মেটাফিজিক্যাল অথরিটি থেকে মুক্ত করে হিউম্যান রিজনের ওপর দাঁড় করায়। পরে ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলুশন জাতিকে বানায় স্যাক্রেড পলিটিক্যাল সাবজেক্ট। মানে, এমন রাজনৈতিক মানুষ বা সমষ্টি, যারা একটি উচ্চতর নৈতিক, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক সত্যের স্থলাভিষিক্ত বা বিকল্প। শিল্পায়ন ও আধুনিক প্রশাসনিক প্রযুক্তি রাষ্ট্রকে এমন ক্ষমতা দেয়, যার মাধ্যমে সে নাগরিকদের গণনা, নিয়ন্ত্রণ, শাসন ও সংগঠিত করতে আগের যেকোনো যুগের তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের জন্য স্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যবস্থা তৈরি হয়। ফলে শাসন ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে নিয়মভিত্তিক হয়। জনগণনার মাধ্যমে রাষ্ট্র জানতে পারে দেশে কত মানুষ, কোথায় থাকে, কী কাজ করে। অর্থাৎ, জনগণ ‘পরিচালনাযোগ্য ডাটা’-তে পরিণত হয়। সবসময় প্রস্তুত পেশাদার সেনাবাহিনী গড়ে ওঠে। এতে রাষ্ট্রের কোয়ারসিভ পাওয়ার বেড়ে যায়। স্থানীয় ক্ষমতাগুলো দুর্বল হয়ে রাজধানীকেন্দ্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে পুরো দেশকে একক নীতিতে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

এর মধ্য দিয়ে ন্যাশন স্টেট কোনো রাজনৈতিক ইউনিট থাকেনি; হয়ে ওঠে একটি মেটাফিজিক্যাল ক্লেইম। সে বলে, রাষ্ট্রই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক বাস্তবতা। মানুষের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয় হলো রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়া। গোত্র, ধর্ম, অঞ্চল বা সভ্যতার চেয়ে রাষ্ট্রকে বড় ধরা হয়। রাষ্ট্রের সীমানাকে প্রায় পবিত্র ও অখণ্ড হিসেবে দেখা হয়। সীমান্ত রক্ষা তখন শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়, আবেগ ও জাতীয় মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রের আইন মানা বাধ্যতামূলক। ধর্মীয় বিধান, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব নৈতিকতা বা ঐতিহ্যের ওপরও রাষ্ট্রীয় আইন প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্র দাবি করে এবসুলোট সভরেন্টি। অর্থাৎ, রাষ্ট্র নিজের ভূখণ্ডে সর্বশেষ ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব দাবি করে। তার ওপরে আর কোনো রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে স্বীকার করা হয় না। এই জায়গাতেই ইসলামি রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এর মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয়।

কালবেলা : আপনি কি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সমস্যাজনক মনে করেন?

মুসা আল হাফিজ : রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চূড়ান্ত বলে মানতে আমার আপত্তি আছে। অ্যাবসুলোউট সভরেন্টি মানুষের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রকে বসিয়ে দেয়। তখন রাষ্ট্র আর মানুষের সেবক থাকে না; বরং মানুষই রাষ্ট্রের উপাদানে পরিণত হয়। মানুষের মর্যাদা, বিবেক, নৈতিকতা ও সত্য কোনো রাজনৈতিক যন্ত্রের অধীন হতে পারে না। রাষ্ট্র প্রয়োজনীয়, কিন্তু সর্বোচ্চ নয়।

রাষ্ট্রের আইন যদি নিজেকে সর্বশেষ সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তা মানুষের ওপর একটি পার্থিব অ্যাবসুলোউট তৈরি করে। অথচ ইসলামি দৃষ্টিতে ক্ষমতা আমানত, উপাস্য নয়; শাসন ন্যায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যম, নিজেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র প্রায়ই জাতিকে স্যাক্রেড পলিটিক্যাল সাবজেক্ট বানায়। তখন মানুষকে শেখানো হয় রাষ্ট্রের জন্য মরো। শেখানো হয় সীমান্তই সর্বোচ্চ পবিত্রতা। শেখানো হয় জাতীয় স্বার্থই নৈতিকতার শেষ মানদণ্ড। ফলে নৈতিকতা ইউনিভার্সাল থাকে না। টেরিটোরিয়াল হয়ে যায়। সেখানে আমার প্রশ্ন হলো, সীমান্তের ওপারে থাকা মানুষের রক্ত কি কম মূল্যবান? রাষ্ট্র যখন নিজেকে সার্বভৌমত্বের অধিকারী ও সর্বোচ্চ নৈতিক সত্য বলে কল্পনা করে, তখন সে নিজের কাজকে নৈতিক বিচারের ঊর্ধ্বে মনে করতে শুরু করে। ফলে কলোনিয়ালিজম, ফ্যাসিবাদ, টোটাল ওয়ার, জাতিগত নিধন এবং সার্ভেইলেন্স স্টেট বা নজরদারিভিত্তিক রাষ্ট্রের মতো ভয়াবহ বাস্তবতাগুলোর বৈধতা তৈরি হয়।

আধুনিক রাষ্ট্র ডিসিপ্লিন ও সার্ভেইলেন্সের মাধ্যমে মানুষের শরীর, আচরণ ও চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণের পরিসরে নিয়ে আসে। মানুষ তখন আর কেবল মানুষ থাকে না; হয়ে ওঠে ফাইল, বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি, ট্যাক্স নাম্বার, মিলিটারি রিসোর্স কিংবা ডেমোগ্রাফিক ইউনিট। যখন রাষ্ট্র নিজেকে স্যাক্রেড মনে করে, তখন মানুষকে মাস মোবিলাইজেশনের মাধ্যমে যুদ্ধযন্ত্রে রূপ দেওয়া সহজ হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে কল্পনা করার প্রবণতা কোনো এক সমস্যা নয়, বহু সমস্যার জননী। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব যার মর্মমূলে কাজ করে।

ফ্রেঞ্চ রেভ্যুলুশনের পরে ন্যাশন বা জাতিকে স্যাক্রেড পলিটিক্যাল সাবজেক্ট হিসেবে কল্পনা করা হয়। অর্থাৎ, জাতিকেই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পবিত্রতা হিসেবে দেখা শুরু হয়। পরে ইউরোপীয় ন্যাশনালিজম রাষ্ট্র ও জাতির আবেগকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে মানুষের নৈতিকতা, মানবতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর ‘জাতীয় স্বার্থ’ প্রাধান্য পেতে থাকে। এর ফল ভয়াবহ ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোটি কোটি মানুষ রাষ্ট্র, জাতি ও ‘জাতীয় গৌরব’-এর নামে নিহত হয়। রাষ্ট্র তখন মানুষকে স্বাধীন নৈতিক সত্তা হিসেবে দেখেনি; বরং যুদ্ধ, উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। অতএব, আমার কাছে রাষ্ট্র দরকার, কিন্তু রাষ্ট্র ঈশ্বর নয়। আইন দরকার, কিন্তু আইন ন্যায়ের বিকল্প নয়। সীমান্ত বাস্তব, কিন্তু মানবতা তার চেয়ে বৃহৎ। রাজনৈতিক আনুগত্য থাকতে পারে, কিন্তু তা নৈতিক সত্যের ঊর্ধ্বে নয়।

মানে, আমি বলতে চাই রাষ্ট্র একটি হিস্টোরিক্যাল ইনস্টিটিউশন। সে চূড়ান্ত কোনো মেটাফিজিক্যাল রিয়েলিটি নয়। রাষ্ট্র হিস্টোরিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট। সে মানবিক প্রয়োজনের জন্য নির্মিত একটি প্রতিষ্ঠান। সে চূড়ান্ত রিয়েলিটি নয়।

কালবেলা : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মুসা আল হাফিজ : আপনাদের ভালোটুকুর জন্য দোয়া ও শুভকামনা।

[ নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব।  সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, দৈনিক কালবেলা কর্তৃপক্ষের নয়। ]
দৈনিক কালবেলা